উদ্যোগপর্ব: ১৮। কৃষ্ণ ও কুন্তী — বিদুলার উপাখ্যান
কুন্তীকে প্রণাম ক’রে কৃষ্ণ তাঁকে কৌরবসভার সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন। কুন্তী বললেন, কেশব, তুমি যুধিষ্ঠিরকে আমার এই কথা ব’লো।— পুত্র, তুমি মন্দমতি, শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণের ন্যায় কেবল শাস্ত্র আলোচনা ক’রে তোমার বুদ্ধি বিকৃত হয়েছে, তুমি কেবল ধর্মেরই চিন্তা করছ। ক্ষত্রিয়ের যে ধর্ম স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা নির্দিষ্ট করেছেন তুমি তার দিকে মন দাও। তিনি তাঁর বাহু থেকে ক্ষত্রিয় সৃষ্টি করেছেন সেজন্য বাহুবলই ক্ষত্রিয়গণের উপজীব্য, সর্বদা নির্দয় কর্মে নিযুক্ত থেকে তাদের প্রজাপালন করতে হয়। রাজা যদি উপযুক্ত রূপে দণ্ডনীতি প্রয়োগ করেন তবেই চার বর্ণের লোক স্বধর্ম পালন করেন। এমন মনে ক’রো না যে কালপ্রভাবেই রাজার দোষগুণ হয়; রাজার সদসৎ কর্ম অনুসারেই সত্য ত্রেতা দ্বাপর বা কলি যুগ উৎপন্ন হয়। তুমি পিতৃপিতামহের আচরিত রাজধর্ম পালন কর, তুমি যে ধর্ম আশ্রয় করতে চাও তা রাজর্ষিদের ধর্ম নয়। দুর্বল বা অহিংসাপরায়ণ রাজা প্রজাপালন করতে পারেন না। আমি সর্বদা এই আশীর্বাদ করছি যে তুমি যজ্ঞ দান ও তপস্যা কর, শৌর্য প্রজ্ঞা বংশ বল ও তেজ লাভ কর। মহাবাহু, সাম দান ভেদ বা দণ্ডনীতির দ্বারা তোমার পৈতৃক রাজ্যাংশ উদ্ধার কর। তোমার জননী হয়েও আমাকে পরদত্ত অন্নপিণ্ডের প্রত্যাশায় থাকতে হয় এর চেয়ে দুঃখ আর কি আছে? কৃষ্ণ, আমি বিদূলা ও তাঁর পুত্রের কথা বলছি, তুমি যুধিষ্ঠিরকে শুনিও।—
বিদূলা নামে এক যশস্বিনী তেজস্বিনী ক্ষত্রিয়নারী ছিলেন। তাঁর পুত্র সঞ্জয় সিন্ধুরাজ কর্তৃক পরাজিত হয়ে দুঃখিতমনে শুয়ে আছেন দেখে বিদূলা বললেন, তুমি আমার পুত্র নও, তুমি কোথা থেকে এসেছ? তুমি ক্রোধহীন ক্লীবতুল্য, তুমি যাবজ্জীবন নিরাল হয়ে থাকতে চাও। নিজেকে অবজ্ঞা করো না, অল্পে তুষ্ট হয়ো না, নির্ভীক ও উৎসাহী হও। রে ক্লীব, তোমার সকল কীর্তি নষ্ট হয়েছে, রাজ্য পরহস্তগত হয়েছে, তবে বেঁচে আছ কেন? লোকে যার মহৎ চরিত্রের আলোচনা করে না সে পুরুষ নয়, স্ত্রীও নয়, সে কেবল মানুষের সংখ্যা বাড়ায়। যার দান তপস্যা শৌর্য বিদ্যা বা অর্থের খ্যাতি নেই সে তার মাতার বিষ্ঠা মাত্র। পুত্র, নির্বাপিত অগ্নির ন্যায় কেবল ধূমায়িত হয়ো না, মুহূর্তকালের জন্যও জ্বলে ওঠ, শত্রুকে আক্রমণ কর।
বিদূলার পুত্র সঞ্জয় বললেন, আমি যদি যুদ্ধে মরি তবে সমস্ত পৃথিবী পেয়েও আপনার কি লাভ হবে? অলঙ্কার সুখভোগ বা জীবনেই বা কি হবে? বিদূলা বললেন, যিনি নিজের বাহুবল আশ্রয় করে জীবনধারণ করেন তিনিই কীর্তি ও পরলোকে সদ্গতি লাভ করেন। সিন্ধুরাজের প্রজারা সন্তুষ্ট নয়, কিন্তু তারা মূঢ় ও দুর্বল, তাই রাজার বিপদের প্রতীক্ষায় নিশ্চেষ্ট হয়ে আছে। তুমি যদি নিজের পৌরুষ দেখাও তবে অন্য রাজারা সিন্ধুরাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। তাঁদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তুমি গিরিদুর্গে থেকে সুযোগের প্রতীক্ষা কর, সিন্ধুরাজ অজর অমর নন। যুদ্ধের ফলে তোমার সমৃদ্ধিলাভ হবে কিম্বা ক্ষতি হবে তার বিচার না করেই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। আমি মহাকুলে জন্মগ্রহণ করে তোমাদের মহাকুলে এসেছি, আমি রাজ্যের অধিশ্বরী মঙ্গলময়ী ও পতির আদরণী ছিলাম। সঞ্জয়, আমাকে আর তোমার পত্নীকে যদি দীনদশাগ্রস্ত দেখ তবে তোমার জীবনে প্রয়োজন কি? শত্রুদের বশে আনতে পারলে ক্ষত্রিয় যে সুখ লাভ করেন সে সুখ ইন্দ্রভুবনেও নেই। যুদ্ধে প্রাণবিসর্জন অথবা শত্রুর বিনাশ—এ ছাড়া ক্ষত্রিয়ের শান্তিলাভ হতে পারে না।
সঞ্জয় বললেন, আপনি আমার প্রতি নিষ্ঠুর, আপনার হৃদয় কৃষ্ণলোহে নির্মিত। আমার ধন নেই, সহায়ও নেই, কি করে জয়লাভ করব? এই দারুণ অবস্থা জেনেই আমার রাজ্যোদ্ধারের ইচ্ছা নিবৃত্ত হয়েছে। আপনি পরিণতবুদ্ধি, যদি কোনও উপায় জানেন তো বলুন, আমি সর্বতোভাবে আপনার আদেশ পালন করব।
বিদূলা বললেন, তুমি পূর্বে যে বীরত্ব দেখিয়েছ তা আবার দেখাও, তা হ’লেই রাজ্য উদ্ধার করতে পারবে। যারা সিন্ধুরাজের উপর ক্রুদ্ধ, যাদের তিনি শক্তিহীন ও অপমানিত করেছেন, যারা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায়, তাদের সঙ্গে তুমি মিত্রতা কর। তুমি জান না, আমাদের রাজকোষে বহু ধন আছে। তোমার অনেক সুহৃৎও আছেন যাঁরা সুখদুঃখ সইতে পারেন এবং যুদ্ধ থেকে পালান না।
বিদুলার কথার সঞ্জয়ের মোহ দূর হ’ল, তিনি বাক্যবাণে তাড়িত হয়ে জননীর উপদেশে যুদ্ধের উদ্যোগ করলেন এবং জয়ী হলেন। কোনও রাজা শত্রুর পীড়নে অবসন্ন হ’লে তাঁকে তাঁর মন্ত্রী এই উৎসাহজনক তেজোবর্দ্ধক উপাখ্যান শুনাবেন। বিজয়েচ্ছু রাজা ‘জয়’ নামক এই ইতিহাস শুনবেন। গর্ভিণী এই উপাখ্যান বার বার শুনলে বীরপ্রসবিনী হন।
কুন্তীকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করে কৃষ্ণ ভীষ্মাদির নিকট বিদায় নিলেন, তার পর কর্ণকে নিজের রথে তুলে নিয়ে সাত্যকির সঙ্গে যাত্রা করলেন।