ভীষ্মপর্ব: ৩। সঞ্জয়ের জীববৃত্তান্ত ও
ব্যাসদেব চ’লে গেলে ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে বললেন, রাজারা ভূমি অধিকারের জন্যই যুদ্ধ করেন, অতএব ভূমির বহু গুণ আছে। আমি তা শুনতে ইচ্ছা করি।
সঞ্জয় বললেন, মহারাজ, আমার যা জানা আছে তা বলছি। জগতে দুই প্রকার ভূত (জীব) আছে, জঙ্গম ও স্থাবর। জঙ্গম ভূত ত্রিবিধ—অণ্ডজ স্বেদজ ও জরায়ুজ; এদের মধ্যে জরায়ুজই শ্রেষ্ঠ, আবার জরায়ুজের মধ্যে মানুষ ও পশু শ্রেষ্ঠ। সিংহ ব্যাঘ্র বরাহ মহিষ হস্তী ভল্লুক ও বানর — এই সপ্ত প্রকার বন্য জরায়ুজ। গো ছাগ মেষ মানুষ অশ্ব অশ্বতর ও গর্দভ — এই সপ্ত প্রকার গ্রাম্য জরায়ুজ। গ্রাম্য জীবদের মধ্যে মানুষ এবং বন্য জীবদের মধ্যে সিংহ শ্রেষ্ঠ। সমস্ত জীবই পরস্পরের উপর নির্ভর করে। উদ্ভিজ্জ সকল স্থাবর, তাদের পঞ্চ জাতি — বৃক্ষ গুল্ম লতা বল্লী ও ত্বক্সার তৃণ। চতুর্দশ জঙ্গম ভূত, পঞ্চ স্থাবর ভূত, এবং পঞ্চ মহাভূত — এই চতুর্বিংশতি পদার্থ গায়ত্রীর তুল্য। যিনি এই গায়ত্রী যথার্থরূপে জানেন তিনি বিনষ্ট হন না। সমস্তই ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভূমিতেই বিনাশ পায়, ভূমিই সর্ব ভূতের পরম আশ্রয়। যার ভূমি আছে সে স্থাবরজঙ্গমের অধিকারী, এই কারণেই রাজারা ভূমির লোভে পরস্পরকে হত্যা করেন।
তার পর সঞ্জয় ভূমি জল বায়ু অগ্নি ও আকাশ এই পঞ্চ মহাভূত এবং তাদের গুণাবলী বিবৃত ক’রে সুদর্শন দ্বীপ বা জম্বু দ্বীপের কথা বললেন। জম্বু দ্বীপে ছয় বর্ষপর্বত আছে, যথা — হিমালয় হেমকূট নিষধ নীল শ্বেত ও শৃঙ্গবান। এই সকল বর্ষপর্বত পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত এবং উভয় প্রান্তে সমুদ্রে অবগাহন ক’রে আছে। এদের মধ্যে মধ্যে বহু সহস্র যোজন বিস্তৃত পুণ্য জনপদসমূহ আছে, তাদের নাম বর্ষ। হিমালয়ের দক্ষিণে ভারতবর্ষ, উত্তরে কিম্পুরুষগণের বাসভূমি হৈমবতবর্ষ। হেমকূটের উত্তরে হরিবর্ষ। নিষধ পর্বতের উত্তরে এবং নীল পর্বতের দক্ষিণে মাল্যবান পর্বত। মাল্যবানের পর গন্ধমাদন, এবং এই দুই গিরির মধ্যে কনকময় মেরু পর্বত। মেরু পর্বতের চার পার্শ্বে চার দ্বীপ (মহাদেশ) আছে — ভদ্রাশ্ব কেতুমাল জম্বুদ্বীপ ও উত্তরকুরু। নীল পর্বতের উত্তরে শ্বেতবর্ষ, তার পর হৈরণ্যকবর্ষ, এবং তার পর ঐরাবতবর্ষ। দক্ষিণে ভারতবর্ষ এবং উত্তরে ঐরাবতবর্ষ — এই দুইয়ের মধ্যে ইলাবৃত সমেত পাঁচটি (১) বর্ষ।
অন্যান্য বর্ষের বর্ণনা ক’রে সঞ্জয় বললেন, মহারাজ, ভারতবর্ষে সাতটি কুল-পর্বত আছে, যথা—মহেন্দ্র মলয় সহ্য শক্তিমান ঋক্ষবান বিন্ধ্য ও পারিপাত্র। গঙ্গা সিন্ধু সরস্বতী গোদাবরী নর্মদা শতদ্রু বিপাশা চন্দ্রভাগা ইরাবতী বিতস্তা যমুনা প্রভৃতি অনেক নদী আছে, এই সকল নদী মাতৃতুল্যা ও মহাফলপ্রদা। ভারতে বহু দেশ আছে, যথা—কুরুপাঞ্চাল শাল্ব শূরসেন মৎস্য চেদি দশার্ণ পাঞ্চাল কোশল মদ্র কলিঙ্গ কাশী বিদেহ কাশ্মীর সিন্ধু সৌবীর গান্ধার প্রভৃতি, দক্ষিণে দ্রাবিড় কেরল কর্ণাটক প্রভৃতি এবং উত্তরে যবন চীন কাম্বোজ হূণ পারসীক প্রভৃতি ম্লেচ্ছ জাতির দেশসমূহ। কুকুর যেমন মাংসখণ্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, রাজারাও তেমনি পরস্পরের ভূমি হরণ করেন, কিন্তু এ পর্যন্ত কারও কামনার তৃপ্তি হয় নি।
তার পর সঞ্জয় চতুর্ভাগ, শাক কুশ শাল্মলি ও ক্রৌঞ্চ দ্বীপের বৃত্তান্ত, এবং রাহু ও চন্দ্রসূর্যের পরিমাণ বিবৃত ক’রে বললেন, মহারাজ, আমরা যেখানে আছি এই দেশই ভারতবর্ষ, এখান থেকেই সর্বপ্রকার পুণ্যকর্ম প্রবর্তিত হয়েছে।