ভীষ্মপর্ব: ৪। কুরুপাণ্ডবের ব্যূহেরচনা
পরদিন সূর্যোদয় হ’লে কৌরব ও পাণ্ডব সেনাগণ সজ্জিত হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হ’ল। বিশাল কৌরববাহিনীর অগ্রভাগে ভীষ্ম শ্বেত উষ্ণীষ ও বর্ম ধারণ ক’রে শ্বেতাশ্বযুক্ত রজতময় রথে উঠলেন, বোধ হ’ল যেন চন্দ্র উদিত হয়েছেন। কুরুপিতামহ ভীষ্ম এবং দ্রোণাচার্য প্রতিদিন প্রাতঃকালে উঠে বলতেন — পাণ্ডুপুত্রদের জয় হ’ক; কিন্তু তাঁরা ধৃতরাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন এই কারণেই কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করতে এলেন।
কুরুপক্ষীয় রাজাদের আহ্বান করে ভীষ্ম বললেন, ক্ষত্রিয়গণ, স্বর্গযাত্রার এই মহৎ দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, এই পথে তোমরা ইন্দ্রলোকে ও ব্রহ্মলোকে যেতে পারবে। গৃহে রোগভোগ ক'রে মরা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে অধর্মকর, লৌহাস্ত্রের আঘাতে যিনি মরেন তিনিই সনাতন ধর্ম লাভ করেন। এই কথা শুনে রাজারা রথারোহণে নিজ নিজ সৈন্যসহ নির্গত হলেন, কেবল কর্ণ ও তাঁর বন্ধুগণকে ভীষ্ম নিবৃত্ত করলেন। অশ্বত্থামা ভূরিশ্রবা দ্রোণাচার্য দুর্যোধন শল্য কৃপাচার্য জয়দ্রথ ভগদত্ত প্রভৃতি সসৈন্যে অগ্রসর হলেন। ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ অশ্বত্থামা দুর্যোধন ও বাহ্লীকরাজ যে ব্যূহ রচনা করলেন তার অগ্ৰে গজারোহী সৈন্য, শীর্ষদেশে নৃপতিগণ এবং পার্শ্ব-দেশে অশ্বারোহী সৈন্য স্থাপিত হ’ল। সেই সর্বতোমুখ ভয়ংকর ব্যূহ যেন হাসতে হাসতে চলতে লাগল।
কৌরববাহিনী ব্যূহবদ্ধ হয়েছে দেখে যুধিষ্ঠির অর্জুনকে বললেন, বৃহস্পতির উপদেশ এই যে সৈন্য যদি অল্প হয়, তবে সংহত ক'রে যুদ্ধ করবে, যদি বহু হয়, তবে ইচ্ছানুসারে বিস্তারিত করবে। বহু সৈন্যের সঙ্গে যদি অল্প সৈন্যের যুদ্ধ করতে হয়, তবে সূচীমুখ ব্যূহ করবে। অর্জুন, আমাদের সৈন্য বিপক্ষের তুলনায় অল্প, তুমি মহর্ষি বৃহস্পতির বচন অনুসারে ব্যূহ রচনা কর। অর্জুন বললেন, মহারাজ, বজ্রপাণি ইন্দ্র যে ব্যূহের বিধান দিয়েছেন সেই ‘অচল’ ও ‘বজ্র’ নামক ব্যূহ আমি রচনা করছি।
কৌরবসেনা অগ্রসর হচ্ছে দেখে পরিপূর্ণ গঙ্গার ন্যায় পাণ্ডববাহিনী ক্ষণকাল নিশ্চল থেকে ধীরে ধীরে চলতে লাগল। গদাহস্তে ভীম সেই বাহিনীর অগ্রে রইলেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন নকুল সহদেব এবং ভ্রাতা ও পুত্রের সহিত বিরাট রাজা ভীমের পৃষ্ঠভাগ রক্ষা করতে লাগলেন। অভিমন্যু, দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র ও শিখণ্ডী সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। সাত্যকি অর্জুনের পৃষ্ঠরক্ষক হয়ে চললেন। চলন্ত পর্বতের ন্যায় বৃহৎ হস্তীদলসহ রাজা যুধিষ্ঠির সেনার মধ্যদেশে রইলেন। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ বিরাটের অনুগমন করলেন। পাণ্ডব ও কৌরবগণের সমস্ত রথধ্বজ অভিভূত ক'রে মহাকপি হনুমান অর্জুনের রথের উপর অধিষ্ঠিত হলেন।
দুর্যোধনের বিশাল সৈন্যদল এবং ভীষ্মরচিত ব্যূহ দেখে যুধিষ্ঠির বিষণ্ণ হয়ে বললেন, ধনঞ্জয়, পিতামহ ভীষ্ম যাদের যোদ্ধা সেই ধার্তরাষ্ট্রগণের সঙ্গে আমরা কি ক’রে যুদ্ধ করতে পারব? তিনি যে অক্ষোভ্য অভেদ্য ব্যূহ নির্মাণ করেছেন তা থেকে কোন্ উপায়ে আমরা নিস্তার পাব? অর্জুন বললেন, মহারাজ, সত্য আনৃশংস্যতা ধর্ম ও উদ্যম দ্বারা যে জয়লাভ হয়, বলবীর্য দ্বারা তেমন হয় না। আপনি সর্বপ্রকার অধৰ্ম্ম ও লোভ ত্যাগ ক'রে নিরহংকার হয়ে উদ্যমসহকারে যুদ্ধ করুন, যেখানে ধৰ্ম্ম সেখানেই জয় হবে। আপনি জানবেন আমরা নিশ্চয় জয়ী হব, কারণ নারদ বলেছেন, যেখানে কৃষ্ণ সেখানেই জয়।
যুধিষ্ঠিরের মাথার উপর গজদন্তের শলাকাযুক্ত শ্বেতবৰ্ণ ছত্র ধরা হ'ল, মহৰ্ষিরা স্তুতি ক'রে তাঁকে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন। পুরোহিত ব্ৰহ্মৰ্ষি ও সিদ্ধগণ শত্রুবধের আশীর্ব্বাদ ক'রে যথাবিধি স্বস্ত্যয়ন করলেন। যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণগণকে বস্ত্র গো ফল পুষ্প ও সুবৰ্ণ দান ক'রে ইন্দ্রের ন্যায় যুদ্ধযাত্ৰা করলেন।
কৃষ্ণ অৰ্জ্জুনকে বললেন, মহাবাহু, তুমি শুচি হয়ে যুদ্ধের অভিমুখে থেকে শত্রুর পরাজয়ের নিমিত্ত দুৰ্গাস্তোত্ৰ পাঠ কর। অৰ্জ্জুন স্তব করলে দুৰ্গা প্রীত হয়ে অন্তরীক্ষ থেকে বললেন, পাণ্ডুপুত্র, তুমি শীঘ্রই শত্রু জয় করবে, কারণ নারায়ণ তোমার সহায় এবং তুমিও নর-ঋষির অবতার। এই ব'লে দুৰ্গা অন্তৰ্হিত হলেন।
৫। ভগবদ্গীতা দুৰ্য্যোধন দ্ৰোণকে বললেন, আচার্য্য, পাণ্ডুপুত্ৰগণের বিপুল সেনা দেখুন, আপনার শিষ্য ধৃষ্টদ্যুম্ন ওদের ব্যূহবদ্ধ করেছেন। ওখানে সাত্যকি বিরাট ধৃষ্টকেতু চেকিতান কাশীরাজ প্রভৃতি এবং অভিমন্যু ও দ্ৰৌপদীর পুত্ৰগণ সকল মহারথই আছেন। আমাদের পক্ষে আপনি ভীষ্ম কৰ্ণ অশ্বত্থামা বিকৰ্ণ ভূরিশ্ৰবা প্রভৃতি যুদ্ধবিশারদ বহু বীর রয়েছেন, আপনারা সকলেই আমাদের জন্য জীবনত্যাগে প্রস্তুত। এখন আপনারা সৰ্ব্বপ্রকারে ভীষ্মকে রক্ষা করুন।
এমন সময় কুরুবৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম সিংহনাদ ক'রে শঙ্খ বাজালেন। তখন ভেরী পণব আনক প্রভৃতি রণবাদ্য সহসা তুমুল শব্দে বেজে উঠল। হৃষীকেশ কৃষ্ণ তাঁর পাঞ্চজন্য শঙ্খ এবং ধনঞ্জয় দেবদত্ত নামক শঙ্খ বাজালেন। যুধিষ্ঠির প্রভৃতিও নিজ নিজ শঙ্খ বাজালেন। সেই নিৰ্ঘোষ আকাশ ও পৃথিবী অনুনাদিত ক'রে দুৰ্য্যোধনাদির হৃদয় যেন বিদীর্ণ ক'রে দিলে। শস্ত্ৰসম্পাত আসন্ন জেনে অৰ্জ্জুন তাঁর সারথি কৃষ্ণকে বললেন, অচ্যুত, দুই সেনার মধ্যে আমার রথ রাখ, কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে আমি দেখব।
কৃষ্ণ কুরুপাণ্ডব সেনার মধ্যে রথ নিয়ে গেলেন। দুই পক্ষেই পিতা ও পিতামহ স্থানীয় গুরুজন, আচাৰ্য্য মাতুল শ্বশুর ভ্রাতা পুত্র ও সুহৃদগণ রয়েছেন দেখে অৰ্জ্জুন বললেন, কৃষ্ণ, এই যুদ্ধাৰ্থী স্বজনবর্গকে দেখে আমার সৰ্ব্বাঙ্গ অবসন্ন হচ্ছে, মুখ শুক্ছে, শরীর কাঁপছে, রোমহর্ষ হচ্ছে, হাত থেকে গাণ্ডীব পড়ে যাচ্ছে। আমি বিজয় চাই না, যাঁদের জন্য লোকে রাজ্য ও সুখ কামনা করে তাঁরাই যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিতে এসেছেন। স্বজন বধ ক’রে আমাদের কোন্ সুখ হবে? হায়, আমরা রাজ্যের লোভে মহাপাপ করতে উদ্যত হয়েছি। যদি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ আমাকে নিরস্ত্র অবস্থায় বধ করে তাও আমার পক্ষে শ্রেয় হবে। এই ব’লে অর্জুন ধনুর্বাণ ত্যাগ ক’রে রথের মধ্যে বসে পড়লেন।