ভীষ্মপর্ব: ৫। ভগবদ্গীতা
বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে কৃষ্ণ বললেন, এই সংকটকালে তুমি মোহগ্রস্ত হলে কেন? ক্লীব হয়ো না, ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য ত্যাগ কর। অর্জুন বললেন, মধুসূদন, পূজনীয় ভীষ্ম ও দ্রোণকে আমি কি ক’রে শরঘাত করব? মহানুভাব গুরুজনকে হত্যা করা অপেক্ষা ভিক্ষান্ন ভোজন করাও শ্রেয়। আমি বিহ্বল হয়েছি, ধর্মধর্ম বুঝতে পারছি না, আমাকে উপদেশ দাও, আমি তোমার শরণাপন্ন।
কৃষ্ণ বললেন, যারা অশোচ্য তাদের জন্য তুমি শোক করছ আবার প্রজ্ঞাবাক্যও বলছ। মৃত বা জীবিত কারও জন্য পণ্ডিতগণ শোক করেন না।—
দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি॥
অবিনাশী তু তদ্ বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততম্।
বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তুমর্হতি॥
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচি-
ন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে॥
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহাতি নরোহপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা-
ন্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী॥
— দেহধারী আত্মার যেমন এই দেহে কৌমার যৌবন জরা হয়, সেইরূপ দেহান্তর-প্রাপ্তি ঘটে; ধীর ব্যক্তি তাতে মোহগ্রস্ত হন না। যাঁর দ্বারা এই সমস্ত বিশ্ব ব্যাপ্ত তাঁকে অবিনাশী জেনো; কেউ এই অব্যয়ের বিনাশ করতে পারে না। ইনি কদাচ জন্মান না বা মরেন না, অথবা একবার জন্মগ্রহণ ক’রে আবার জন্মাবেন না — এও নয়; ইনি জন্মহীন নিত্য অক্ষয় অনাদি, শরীর হত হ’লে এই আত্মা হত হন না।
মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ ক'রে অন্য নূতন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ দেহী (আত্মা) জীর্ণ শরীর ত্যাগ ক'রে অন্য নব শরীর পান।—
জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ। তস্মাদপরিহার্য্যেহর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি॥ অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত। অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা॥ স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি। ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে॥ যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্। সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্॥ অথ চেৎ ত্বমিমং ধর্ম্যং সংগ্রামং ন করিষ্যসি। ততঃ স্বধর্মং কীর্তিঞ্চ হিত্বা পাপমবাপ্স্যসি॥ হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্। তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ॥ সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ। ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি॥
—যে জন্মেছে তার মৃত্যু নিশ্চয় হবে এবং মৃতব্যক্তি নিশ্চয় পুনর্ব্বার জন্মাবে; অতএব এই অপরিহার্য্য বিষয়ে তুমি শোক করতে পার না। হে ভারত, জীবসকল আদিতে (জন্মের পূর্ব্বে) অব্যক্ত, মধ্যে (জীবিতকালে) ব্যক্ত, নিধনে (মরণের পর) অব্যক্ত; তবে কিসের খেদ? আর, তোমার স্বধর্ম্ম বিচার ক'রেও তুমি বিকম্পিত হ'তে পার না, কারণ ধর্ম্মযুদ্ধের চেয়ে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে শ্রেয়স্কর কিছু নেই। উন্মুক্ত স্বর্গদ্বার আপনা থেকেই উপস্থিত হয়েছে, সুখী ক্ষত্রিয়েরাই এমন যুদ্ধ লাভ করেন। যদি তুমি এই ধর্ম্মযুদ্ধ না কর তবে স্বধর্ম্ম ও কীর্তি হারিয়ে পাপগ্রস্ত হবে। যদি হত হও তবে স্বর্গ পাবে, যদি জয়ী হও তবে পৃথিবীর রাজ্য ভোগ করবে। অতএব হে কৌন্তেয়, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হয়ে গাত্রোত্থান কর। সুখদুঃখ লাভ-অলাভ জয়-পরাজয় সমান জ্ঞান ক'রে যুদ্ধে নিযুক্ত হও, এরূপ করলে তুমি পাপগ্রস্ত হবে না।
তার পর কৃষ্ণ বললেন, এখন আমি কর্মযোগ অনুসারে ধর্মতত্ত্ব বলছি শোন, এই ধর্মের স্বল্পও মহাভয় হতে ত্রাণ করে। বেদসকল ত্রিগুণাত্মক পার্থিব বিষয়ের বর্ণনায় পূর্ণ, তুমি ত্রিগুণ অতিক্রম করে রাগদ্বেষাদির অতীত, সঞ্চয় ও রক্ষণে নিস্পৃহ এবং আত্মনির্ভরশীল হও।—
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন। মা কর্মফলহেতুর্ভুর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি॥ যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয়। সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে॥ —কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মের ফলে কদাচ নয়; কর্মের ফল কামনা ক’রো না, নিষ্কর্মাও হয়ো না। ধনঞ্জয়, যোগস্থ হয়ে আসক্তি ত্যাগ ক’রে সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে সমান হয়ে কর্ম কর; সমত্বকেই যোগ বলা হয়।—
যদ্ যদাচরতি শ্রেষ্ঠস্তত্তদেবেতরো জনঃ। স যৎ প্রমাণং কুরুতে লোকস্তদনুবর্ততে॥ ন মে পার্থাস্তি কর্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন। নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত এব চ কর্মণি॥ শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ। স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ॥ —শ্রেষ্ঠ পুরুষ যে যে আচরণ করেন ইতর (সাধারণ) জনও সেইরূপ করে; তিনি যা প্রমাণ বা পালনীয় গণ্য করেন লোকে তারই অনুবর্তী হয়। পার্থ, ত্রিলোকে আমার কিছুই কর্তব্য নেই, অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্যও নেই, তথাপি আমি কর্মে নিযুক্ত আছি। স্বধর্ম যদি গুণহীনও হয় তথাপি তা উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্মের চেয়ে শ্রেয়; স্বধর্মে নিধনও ভাল, কিন্তু পরধর্ম ভয়াবহ।—
অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্। প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া॥ যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥ পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥ —জন্মহীন অবিকারী এবং সর্বভূতের ঈশ্বর হয়েও আমি স্বীয় প্রকৃতিতে অধিষ্ঠান ক’রে আপনার মায়াবলে জন্মগ্রহণ করি। হে ভারত, যখন যখন ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুত্থান হয় তখন আমি নিজেকে সৃষ্টি করি। সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতগণের বিনাশ এবং ধর্মসংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
কৃষ্ণ পরমার্থবিষয়ক বহু উপদেশ দিলেন এবং অর্জুনের অনুরোধে নিজের বিশ্বরূপ প্রকাশ করলেন। বিস্ময়ে অভিভূত ও রোমাঞ্চিত হয়ে অর্জুন কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, পশ্যামি দেবাংস্তব দেব দেহে সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙ্ঘান্। ব্রহ্মাণমীশং কমলাসনস্থ- মৃষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্।। অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রং পশ্যামি ত্বাং সর্বতোঽনন্তরূপম্। নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ।।
—হে দেব, তোমার দেহে সর্ব দেবগণ, বিভিন্ন প্রাণিসঙ্ঘ, কমলাসনস্থ প্রভু ব্রহ্মা, সর্ব ঋষিগণ এবং দিব্য উরগগণ দেখছি। হে বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ, অনেক-বাহু-উদর-মুখ-নেত্র-শালী অনন্তরূপ তোমাকে সর্বত্র দেখছি, কিন্তু তোমার অন্ত মধ্য বা আদি দেখতে পাচ্ছি না। —
দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি
দৃষ্টৈব কালানলসন্নিভানি।
দিশো ন জানে ন লভে চ শৰ্ম
প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।
অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ
সর্বে সহৈবাবনিপালসঙ্ঘৈঃ।
ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাসৌ
সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ।।
বক্ত্রাণি তে ত্বরমাণা বিশন্তি
দংষ্ট্রাকরালানি ভয়ানকানি।
কেচিদ্ বিলগ্না দশনান্তরেষু
সংদৃশ্যন্তে চূর্ণিতৈরুত্তমাঙ্গৈঃ।।
—দংষ্ট্রাকরাল কালানলসম্নিভ তোমার মুখসকল দেখে দিক জানতে পারছি না, সুখও পাচ্ছি না; হে দেবেশ জগন্নিবাস, প্রসন্ন হও। ওই ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ, রাজাদের সঙ্গে ভীষ্ম দ্রোণ ও সূতপুত্র, এবং তাঁদের সঙ্গে আমাদের মুখ্য যোদ্ধারাও তোমার অভিমুখে ত্বরান্বিত হয়ে তোমার দংষ্ট্রাকরাল ভয়ানক মুখসমূহে প্রবেশ করছে; কেউ বা চূর্ণিতমস্তকে তোমার দশনের অন্তরালে বিলগ্ন হয়ে দৃষ্ট হচ্ছে। —
যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা
বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ।
তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকা-
স্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ।।
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমস্তা-
ল্লোকান্ সমগ্রান্ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ।
তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং
ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।।
আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো
নমোঽস্তুতে দেববর প্রসীদ।
বিজ্ঞাতুমিচ্ছামি ভবন্তমাদ্যং
ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্।।
—পতঙ্গগণ যেমন নাশের জন্য সমৃদ্ধবেগে প্রদীপ্ত অনলে প্রবেশ করে সেইরূপ সর্বলোকও নাশের জন্য সমৃদ্ধবেগে তোমার মুখসমূহে প্রবেশ করছে। তুমি জ্বলন্ত বদনে সর্বদিক থেকে সমগ্র লোক গ্রাস করতে করতে লেহন করছ; বিষ্ণু, তোমার উগ্র প্রভা সমস্ত জগৎ তেজে পূরিত ক'রে সন্তপ্ত করছে। বল, কে তুমি উগ্ররূপ? তোমাকে নমস্কার; হে দেবেশ, প্রসন্ন হও, আদিস্বরূপ তোমাকে জানতে ইচ্ছা করি; তোমার প্রবৃত্তি বুঝতে পারছি না।
তখন ভগবান বললেন, আমি লোকক্ষয়কারী কাল। এখানে যে যোদ্ধারা সমবেত হয়েছে, তুমি না মারলেও তারা মরবে। আমি পূর্বেই তাদের মেরেছি; সব্যসাচী, তুমি নিমিত্তমাত্র হও। ওঠ, যশোলাভ কর, শত্রু জয় করে সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ কর।
অর্জুন বললেন, হে সর্ব, তোমাকে সহস্রবার সর্বদিকে নমস্কার করি। তোমার মহিমা না জেনে প্রমাদবশে বা প্রণয়বশে তোমাকে কৃষ্ণ যাদব ও সখা ব'লে সম্বোধন করেছি, বিহার ভোজন ও শয়ন কালে উপহাস করেছি, সে সমস্ত ক্ষমা কর। তোমার অদৃষ্টপূর্ব রূপ দেখে আমি রোমাঞ্চিত হয়েছি, ভয়ে আমার মন ব্যথিত হয়েছে, তুমি প্রসন্ন হও, পূর্বরূপ ধারণ কর।
কৃষ্ণ তাঁর স্বাভাবিক রূপ গ্রহণ করলেন এবং আরও বহু উপদেশ দিয়ে পরিশেষে বললেন, অর্জুন, যদি অহঙ্কারবশে মনে কর যে যুদ্ধ করব না, তবে সে সংকল্প মিথ্যা হবে, তোমার প্রকৃতিই তোমাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করবে। আমি করছি— এই ভাব যাঁর নেই তাঁর বুদ্ধি কর্মে আসক্ত হয় না, তিনি সর্বলোক হত্যা করেও হত্যা করেন না। ঈশ্বর হৃদয়ে অধিষ্ঠান ক'রে সর্বভূতকে যন্ত্রারূঢ়ের ন্যায় চালিত করেন, তুমি সর্বভাবে তাঁর শরণ নাও।—
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে॥
সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥
—আমাতে চিত্ত অর্পণ কর, আমার ভক্ত ও উপাসক হও, আমাকে নমস্কার কর; তুমি আমার প্রিয়, তোমার কাছে সত্য প্রতিজ্ঞা করছি — তুমি আমাকেই পাবে। সর্ব ধর্ম ত্যাগ ক'রে একমাত্র আমাকে শরণ ক'রে চল, আমি তোমাকে সর্ব পাপ থেকে মুক্ত করব, শোক ক'রো না।
অর্জুন বললেন, অচ্যুত, আমার মোহ বিনষ্ট হয়েছে, তোমার প্রসাদে আমি ধর্মজ্ঞান লাভ করেছি, আমার সন্দেহ দূর হয়েছে, তোমার আদেশ আমি পালন করব।