ভীষ্মপর্ব: ৬। যুধিষ্ঠিরের শিষ্টাচার — কর্ণ — ব্যূহভেদ

যুধিষ্ঠির দেখলেন, সাগরতুল্য দুই সেনা যুদ্ধের জন্য সমুদ্যত ও চঞ্চল হয়েছে। তিনি তাঁর বর্ম খুলে ফেলে অস্ত্র ত্যাগ ক'রে সত্বর রথ থেকে নামলেন এবং শত্রুসেনার ভিতর দিয়ে পদব্রজে কৃতাঞ্জলিপুটে ভীষ্মের অভিমুখে চললেন। তাঁকে এইরূপে যেতে দেখে তাঁর ভ্রাতারা, কৃষ্ণ, এবং প্রধান প্রধান রাজারা উৎকণ্ঠিত হয়ে তাঁর অনুসরণ করলেন। ভীমার্জুনাদি জিজ্ঞাসা করলেন, মহারাজ, আপনার অভিপ্রায় কি? আমাদের ত্যাগ ক'রে নিরস্ত্র হয়ে একাকী শত্রুসেনার অভিমুখে কেন যাচ্ছেন? যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন না, যেতে লাগলেন। কৃষ্ণ সহাস্যে বললেন, আমি এঁর অভিপ্রায় বুঝেছি, ইনি ভীষ্মদ্রোণাদি গুরুজনকে সম্মান দেখিয়ে তার পর শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। শাস্ত্রে আছে, গুরুজনকে সম্মানিত ক'রে যুদ্ধ করলে নিশ্চয় জয়লাভ হয়, আমিও তাই মনে করি।

যুধিষ্ঠিরকে আসতে দেখে দুর্যোধনের সৈন্যরা বলাবলি করতে লাগল, এই কুলাঙ্গার ভয় পেয়ে ভ্রাতাদের সঙ্গে ভীষ্মের শরণ নিতে আসছে; ভীমার্জুনাদি থাকতে যুধিষ্ঠির যুদ্ধে ভীত হ’ল কেন? প্রখ্যাত ক্ষত্রিয় বংশে নিশ্চয় এর জন্ম হয় নি। সৈন্যরা এই ব’লে আনন্দিতমনে তাদের উত্তরীয় নাড়তে লাগল।

ভীষ্মের কাছে এসে দুই হাতে তাঁর পা ধরে যুধিষ্ঠির বললেন, দুর্ধর্ষ পিতামহ, আপনাকে আমন্ত্রণ করছি, আপনার সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করব, আপনি অনুমতি দিন, আশীর্বাদ করুন। ভীষ্ম বললেন, মহারাজ, যদি এই ভাবে আমার কাছে না আসতে তবে তোমাকে আমি পরাজয়ের জন্য অভিশাপ দিতাম। পাণ্ডুপুত্র, আমি প্রীত হয়েছি, তুমি যুদ্ধ কর, জয়ী হও, তোমার আর যা অভীষ্ট তাও লাভ কর। মানুষ অর্থের দাস, কিন্তু অর্থ কারও দাস নয়, এ সত্য। কৌরবগণ অর্থ দিয়ে আমাকে বেঁধে রেখেছে, তাই ক্লীবের ন্যায় তোমাকে বলছি—আমি পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে পারি না; এ ভিন্ন আমার কাছে তুমি আর কি চাও বল। যুধিষ্ঠির বললেন, মহারাজ, আমার হিতের জন্য আপনি মন্ত্রণা দিন এবং কৌরবদের জন্য যুদ্ধ করুন, এই আমার প্রার্থনা। ভীষ্ম বললেন, আমি তোমার শত্রুদের পক্ষে যুদ্ধ করব, তুমি আমার কাছে কি সাহায্য চাও? যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি অপরাজেয়, যদি আমাদের শুভকামনা করেন তবে বলুন আপনাকে কোন্ উপায়ে জয় করব? ভীষ্ম বললেন, কৌন্তের, আমাকে যুদ্ধে জয় করতে পারে এমন পুরুষ দেখি না, এখন আমার মৃত্যুকালও উপস্থিত হয় নি; তুমি আবার আমার কাছে এসো।

ভীষ্মের কাছে বিদায় নিয়ে যুধিষ্ঠির দ্রোণাচার্যের কাছে গেলেন এবং প্রণাম ও প্রদক্ষিণ ক’রে বললেন, ভগবান, আপনাকে আমন্ত্রণ করছি, আমি নিষ্পাপ হয়ে যুদ্ধ করব, কোন্ উপায়ে সকল শত্রু জয় করতে পারব তা বলুন। ভীষ্মের ন্যায় দ্রোণাচার্যও বললেন, যুদ্ধের পূর্বে যদি আমার কাছে না আসতে তবে আমি অভিশাপ দিতাম। মানুষ অর্থের দাস, অর্থ কারও দাস নয়। কৌরবগণ অর্থ দিয়ে আমাকে বেঁধে রেখেছে, সেজন্য ক্লীবের ন্যায় তোমাকে বলছি—আমি কৌরবদের জন্যই যুদ্ধ করব, কিন্তু তোমার বিজয়কামনায় আশীর্বাদ করছি। যেখানে ধর্ম সেখানেই কৃষ্ণ, যেখানে কৃষ্ণ সেখানেই জয়। তুমি যাও, যুদ্ধ কর। আর যদি কিছু জিজ্ঞাসা থাকে তো বল। যুধিষ্ঠির বললেন, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আপনি অপরাজেয়, যুদ্ধে কি ক’রে আপনাকে জয় করব? দ্রোণ বললেন, বৎস, আমি যখন রথারূঢ় হয়ে শরবর্ষণ করি তখন আমাকে বধ করতে পারে এমন লোক দেখি না। আমি যদি অস্ত্র ত্যাগ ক’রে অচেতনপ্রায় হয়ে মরণের প্রতীক্ষা করি তবেই আমাকে বধ করা যেতে পারে। যদি কোনও বিশ্বস্ত পুরুষ আমাকে অত্যন্ত অপ্রিয় সংবাদ দেয় তবে আমি যুদ্ধকালে অস্ত্র ত্যাগ করি—তোমাকে এই কথা সত্য বলছি।

তার পর যুধিষ্ঠির কৃপাচার্যের কাছে গেলেন। তিনিও ভীষ্ম-দ্রোণের ন্যায় নিজের পরাধীনতা জানিয়ে বললেন, মহারাজ, আমি অবধ্য, তথাপি তুমি যুদ্ধ কর, জয়ী হও। তোমার আগমনে আমি প্রীত হয়েছি; সত্য বলছি, আমি প্রত্যহ নিদ্রা থেকে উঠে তোমার জয়কামনা করব।

তার পর যুধিষ্ঠির শল্যের কাছে গিয়ে তাঁকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করলেন। শল্যও বললেন, তোমার সম্মান প্রদর্শনে আমি প্রীত হয়েছি, তুমি না এলে আমি শাপ দিতাম। আমি কৌরবগণের বশীভূত, তোমার কি সাহায্য করব বল। যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি পূর্বে (১) বর দিয়েছিলেন যে যুদ্ধকালে সূতপুত্রের তেজ নষ্ট করবেন, সেই বরই আমার কাম্য। শল্য বললেন, কুন্তীনন্দন, তোমার কামনা পূর্ণ হবে, তুমি যাও, যুদ্ধ কর, তুমি নিশ্চয় জয়ী হবে।

(১) উদ্যোগপর্ব ৩-পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

কৌরবগণের মহাসৈন্য থেকে নির্গত হয়ে যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের সঙ্গে চলে গেলেন। তখন কৃষ্ণ কর্ণের কাছে গিয়ে বললেন, শুনেছি তুমি ভীষ্মের প্রতি বিদ্বেষের জন্য এখন যুদ্ধ করবে না; যত দিন ভীষ্ম না মরেন তত দিন তুমি আমাদের পক্ষে থাক। ভীষ্মের মৃত্যুর পর যদি দুর্যোধনকে সাহায্য করা উচিত মনে কর তবে পুনর্বার কৌরবপক্ষে যেয়ো। কর্ণ বললেন, কেশব, আমি দুর্যোধনের অপ্রিয় কার্য করব না; জেনে রাখ, আমি তাঁর হিতৈষী, তাঁর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয়েছি।

কৃষ্ণ পাণ্ডবদের কাছে ফিরে গেলেন। অনন্তর যুধিষ্ঠির কুরুসৈন্যের উদ্দেশে উচ্চকণ্ঠে বললেন, যিনি আমাদের সাহায্য করতে চান তাঁকে আমি বরণ করে নেব। এই কথা শুনে যুযুৎসু বললেন, যদি আমাকে নেন তবে আমি ধার্তরাষ্ট্রদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। যুধিষ্ঠির বললেন, যুযুৎসু, এস এস, আমরা সকলে মিলে তোমার নির্বোধ ভ্রাতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব, বাসুদেব ও আমরা একযোগে তোমাকে বরণ করছি। দেখছি তুমিই ধৃতরাষ্ট্রের পিণ্ড ও বংশ রক্ষা করবে।

ভ্রাতাদের ত্যাগ করে যুযুৎসু দুন্দুভি বাজিয়ে পাণ্ডবসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করলেন। যুধিষ্ঠিরাদি পুনর্বার বর্ম ধারণ করে রথে উঠলেন, রণবাদ্য বেজে উঠল, বীরগণ সিংহনাদ করলেন। পাণ্ডবগণ মান্যজনকে সম্মানিত করেছেন দেখে আর্য ও ম্লেচ্ছ সকলেই গদ্গদ কণ্ঠে প্রশংসা করতে লাগলেন।