ভীষ্মপর্ব: ৭। কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধারম্ভ — বিরাটপুত্র উত্তর ও শ্বেতের মৃত্যু

(প্রথম দিনের যুদ্ধ)

ভীষ্মকে অগ্রবর্তী ক’রে কৌরবসেনা এবং ভীমকে অগ্রবর্তী ক’রে পাণ্ডব-সেনা পরস্পরের প্রতি ধাবিত হ’ল। সিংহনাদ, কোলাহল, ভেরী মৃদঙ্গ প্রভৃতির বাদ্য এবং অশ্ব ও হস্তীর রবে রণস্থল ব্যাপ্ত হ’ল। মহাবাহু ভীমসেন বৃষভের ন্যায় গর্জন করতে লাগলেন, তাতে অন্য সমস্ত নিনাদ অভিভূত হয়ে গেল।

দুর্যোধন দুঃশাসন প্রভৃতি দ্বাদশ ভ্রাতা ও ভূরিশ্রবা ভীষ্মকে বেষ্টন ক’রে রইলেন। দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, অভিমন্যু, নকুল, সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বাণ বর্ষণ করতে করতে দুর্যোধনাদির অভিমূখে এলেন। তখন দুই পক্ষের রাজারা পরস্পরকে আক্রমণ করলেন। স্বয়ং ভীষ্ম যমদণ্ডতুল্য কার্মুক নিয়ে গাণ্ডীবধারী অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। সাত্যকি ও কৃতবর্মা, অভিমন্যু ও কোশলরাজ বৃহদ্বল, ভীমসেন ও দুর্যোধন, নকুল ও দুঃশাসন, সহদেব ও দুর্যোধনভ্রাতা দুর্মুখ, যুধিষ্ঠির ও মদ্ররাজ শল্য, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রোণ, বিরাটপুত্র শঙ্খ ও ভূরিশ্রবা, ধৃষ্টকেতু ও বাহ্লীক, ঘটোৎকচ ও অলম্বুষ রাক্ষস, শিখণ্ডী ও অশ্বত্থামা, বিরাট ও ভগদত্ত, কেকয়রাজ বৃহৎক্ষত্র ও কৃপাচার্য, দ্রুপদ ও সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ, ভীমের পুত্র সুতসোম ও দুর্যোধনভ্রাতা বিকর্ণ, চেকিতান ও সুশর্মা, যুধিষ্ঠিরপুত্র প্রতিবিন্ধ্য ও শকুনি, অর্জুন-সহদেব-পুত্র শ্রুতকর্মা-শ্রুতসেন ও কম্বোজরাজ সুদক্ষিণ, অর্জুনপুত্র ইরাবান (১) ও কলিঙ্গরাজ শ্রুতায়ু, কুন্তীভোজ ও বিন্দ-অনুবিন্দ, বিরাটপুত্র উত্তর ও দুর্যোধনভ্রাতা বীরবাহু, চেদিরাজ ধৃষ্টকেতু ও শকুনিপুত্র উলূক — এ’দের পরস্পরের মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্বযুদ্ধ হতে লাগল। ক্ষণকাল পরেই শৃঙ্খলা নষ্ট হ’ল, সকলে উন্মত্তের ন্যায় যুদ্ধ করতে লাগলেন। পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, মাতুল, ভাগিনেয় সখা পরস্পরকে চিনতে পারলেন না, পাণ্ডবগণ ভূতাবিষ্টের ন্যায় কৌরবগণের সঙ্গে যুদ্ধে রত হলেন।

(১) ১৪-পরিচ্ছেদের পাদটীকা দ্রষ্টব্য।

অভিমন্যুর শরাঘাতে ভীষ্মের স্বর্ণভূষিত রথধ্বজ ছিন্ন ও ভূপতিত হ’ল ভীষ্ম অভিমন্যুকে শরজালে আবৃত করলেন, বিরাট ভীমসেন সাত্যকি প্রভৃতি অভিমন্যুকে রক্ষা করতে এলেন। বিরাটপুত্র উত্তর একটি বৃহৎ হস্তীতে চ'ড়ে শল্যকে আক্রমণ করলেন, সেই হস্তীর পদাঘাতে শল্যের রথের চার অশ্ব বিনষ্ট হ'ল। শল্য ভুজঙ্গসদৃশ শক্তি-অস্ত্র নিক্ষেপ করবেন, তার আঘাতে উত্তর প্রাণশূন্য হয়ে প'ড়ে গেলেন। উত্তরকে নিহত দেখে বিরাটের অপর পুত্র ও সেনাপতি শ্বেত শল্যকে আক্রমণ করলেন। শল্য কৃতবর্মার রথে উঠলেন, শল্যপুত্র রুদ্ররথ এবং বৃহৎবল প্রভৃতি অপর ছ জন বীর শল্যকে বেষ্টন ক'রে রইলেন। শ্বেতের শরাঘাতে শত শত যোদ্ধা নিহত হচ্ছে দেখে ভীষ্ম সশর এলেন এবং ধনুর আঘাতে শ্বেতের অশ্ব ও সারথি বধ করলেন। রথ থেকে লাফিয়ে নেমে শ্বেত ভীষ্মের প্রতি শক্তি-অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। ভীষ্মের শরাঘাতে শক্তি ছিন্ন হ'লে শ্বেত গদার প্রহারে ভীষ্মের রথ অশ্ব ও সারথি বিনষ্ট করলেন। তখন ভীষ্ম এক মন্ত্রসিদ্ধ বাণ মোচন করলেন, জ্বলন্ত অশনির ন্যায় সেই বাণ শ্বেতের বর্ম ও হৃদয় ভেদ ক'রে ভূমিতে প্রবিষ্ট হ'ল। নরশাদূর্ল শ্বেতের মৃত্যুতে পাণ্ডবপক্ষীয় ক্ষত্রিগণ শোকমগ্ন হলেন, ঘোর বাদ্যধ্বনির সহিত দুঃশাসন নেচে বেড়াতে লাগলেন।

তার পর সূর্যাস্ত হ'ল। পাণ্ডবগণ সৈন্যদের নিবৃত্ত করলেন, দুই পক্ষের অবহার (যুদ্ধবিরাম) ঘোষিত হ'ল।