ভীষ্মপর্ব: ১৪। ইরাবানের মৃত্যু — ঘটোৎকচের মায়া

(অষ্টম দিনের যুদ্ধ)

পরদিন ভীষ্ম কূর্ম ব্যূহ এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন শৃঙ্গাটক ব্যূহ রচনা করলেন। যোদ্ধারা পরস্পরের নাম ধরে আহ্বান করে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। ভীষ্ম পাণ্ডব-সৈন্য মর্দন করতে লাগলেন। এই দিনের যুদ্ধে দুর্য্যোধনের ভ্রাতা সুনাভ অপরাজিত কুণ্ডধার পণ্ডিত বিশালাক্ষ মহোদর আদিত্যকেতু ও বহ্বাশী ভীমের হস্তে নিহত হলেন। ভ্রাতৃশোকে কাতর হয়ে দুর্য্যোধন ভীষ্মের কাছে বিলাপ করতে লাগলেন। ভীষ্ম বললেন, বৎস, আমি দ্রোণ বিদুর ও গান্ধারী পূর্ব্বেই তোমাকে সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুমি আমাদের কথা বোঝ নি। এ কথাও তোমাকে পূর্ব্বে বলেছি যে আমি বা আচার্য্য দ্রোণ পাণ্ডবদের হাত থেকে কাকেও রক্ষা করতে পারব না। ভীম ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের যাকে পাবে তাকেই বধ করবে। অতএব তুমি স্থিরভাবে দৃঢ়চিত্তে স্বৰ্গকামনায় যুদ্ধ কর।

অৰ্জ্জুনপুত্ৰ ইরাবান কৌরবসেনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলেন, কম্বোজ সিন্ধু প্রভৃতি বহুদেশজাত দ্রুতগামী অশ্ব সুসজ্জিত হয়ে তাঁকে বেষ্টন করে চলল। এই ইরাবান নাগরাজ ঐরাবতের দুহিতার গর্ভে অৰ্জ্জুনের ঔরসে জন্মেছিলেন। ঐরাবত-দুহিতার পূৰ্ব্বপতি গরুড় কর্তৃক নিহত হন; তার পর ঐরাবত তাঁর শোকাতুরা অনপত্যা কন্যাকে অৰ্জ্জুনের নিকট অর্পণ করেন। কৰ্ত্তব্যবোধে অৰ্জ্জুন সেই কামার্ত্তা পরপত্নীর গর্ভে ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। এই পুত্রই ইরাবান। ইনি নাগলোকে জননী কর্তৃক পালিত হন। অৰ্জ্জুনের প্রতি বিদ্বেষবশতঃ এর পিতৃব্য দুরাত্মা অশ্বসেন একে ত্যাগ করেন। অৰ্জ্জুন যখন সুরলোকে অস্ত্ৰশিক্ষা করছিলেন তখন ইরাবান তাঁর কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন। অৰ্জ্জুন তাঁকে বলেছিলেন, যুদ্ধকালে আমাদের সাহায্য ক’রো।

গজ গবাক্ষ বৃষভ চৰ্ম্মবান আৰ্জ্জব ও শুক — শকুনির এই ছয় ভ্রাতার সঙ্গে ইরাবানের যুদ্ধ হ'ল। ইরাবানের অনুগামী যোদ্ধারা গান্ধারসৈন্য ধ্বংস করতে লাগলেন, গজ গবাক্ষ প্রভৃতি ছ জনকেই ইরাবান বধ করলেন। তখন দুৰ্য্যোধন ক্রুদ্ধ হয়ে অলম্বুষ রাক্ষসকে বললেন, অৰ্জ্জুনের এই মায়াবী পুত্র আমার ঘোর ক্ষতি করছে, তুমি ওকে বধ কর। বহু যোদ্ধায় পরিবেষ্টিত হয়ে অলম্বুষ ইরাবানকে আক্রমণ করলে। দুজনে মায়াযুদ্ধ হ'তে লাগল। ইরাবান অনন্তনাগের ন্যায় বিশাল মূৰ্ত্তি ধারণ করলেন, তাঁর মাতৃবংশীয় বহু নাগ তাঁকে ঘিরে রইল। অলম্বুষ গরুড়ের রূপ ধ’রে সেই নাগদের খেয়ে ফেললে। তখন ইরাবান মোহগ্রস্ত হলেন, অলম্বুষ খড়্গঘাতে তাঁকে বধ করলে।

ইরাবানকে নিহত দেখে ঘটোৎকচ ক্রোধে গৰ্জ্জন ক’রে উঠলেন, তাতে কুরু-সৈন্যদের উরুস্তম্ভ কম্প ও ঘৰ্ম্মস্রাব হ'ল। দুৰ্য্যোধন বঙ্গরাজের দিকে ধাবিত হলেন, বঙ্গরাজ্যের অধিপতি দশ সহস্র হস্তী নিয়ে তাঁর পিছনে গেলেন। দুৰ্য্যোধনের উপর ঘটোৎকচ বৰ্ষার জলধারার ন্যায় শরবৰ্ষণ করতে লাগলেন, তাঁর শক্তির আঘাতে বঙ্গাধিপের বাহন হস্তী নিহত হ'ল। ঘটোৎকচ দ্রোণের ধনু ছেদন করলেন, বাহ্লীক চিত্রসেন ও বিকর্ণকে আহত করলেন এবং বৃহদ্বলের বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। এই লোমহৰ্ষক সংগ্রামে কৌরবসেনা প্রায় পরাস্ত হ'ল।

অশ্বত্থামা সত্বর এসে ঘটোৎকচ ও তাঁর অনুচর রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। ঘটোৎকচ এক দারুণ মায়া প্রয়োগ করলেন, তার প্রভাবে কৌরবপক্ষের সকলে দেখলে, দ্রোণ দুর্যোধন শল্য ও অশ্বত্থামা রক্তাক্ত হয়ে ছিন্নদেহে ছটফট করছেন, কৌরববীরগণ প্রায় সকলে নিপাতিত হয়েছেন, এবং বহু সহস্র অশ্ব ও আরোহী খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে। সৈন্যগণ শিবিরের দিকে ধাবিত হ’ল। তখন ভীষ্ম ও সঞ্জয় বললেন, তোমরা পালিও না, যুদ্ধ কর, যা দেখছ তা রাক্ষসী মায়া। সৈন্যরা বিশ্বাস করলে না, পালিয়ে গেল।

দুর্যোধনের মুখে এই পরাজয়সংবাদ শুনে ভীষ্ম বললেন, বৎস, তুমি সর্বদা আত্মরক্ষায় সতর্ক থেকে যুধিষ্ঠির বা তাঁর কোনও ভ্রাতার সঙ্গে যুদ্ধ করবে, কারণ রাজধর্ম অনুসারে রাজার সঙ্গেই রাজা যুদ্ধ করেন। তার পর ভীষ্ম ভগদত্তকে বললেন, মহারাজ, আপনি শীঘ্র হিড়িম্বাপুত্র ঘটোৎকচের কাছে সসৈন্যে গিয়ে তাকে বধ করুন, আপনিই তার উপযুক্ত প্রতিযোদ্ধা।

ঘটোৎকচের সঙ্গে ভীমসেন, অভিমন্যু, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, চেদিরাজ, দশার্ণরাজ প্রভৃতি ছিলেন। ভগদত্ত সুপ্রতীক নামক বৃহৎ হস্তীতে আরোহণ ক’রে এলেন এবং ভীষণ শক্তি অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। ঘটোৎকচ তা জানুতে রেখে ভেঙে ফেললেন। তখন ভগদত্ত সকলের উপর শরবর্ষণ করতে লাগলেন। এই সময়ে অর্জুন তাঁর পুত্র ইরাবানের মৃত্যুসংবাদ শুনে শোকাবিষ্ট ও ক্রুদ্ধ হয়ে ভীষ্ম কৃপ প্রভৃতিকে আক্রমণ করলেন। ভীমের শরাঘাতে দুর্যোধনের সাত ভ্রাতা অনাধৃষ্টি কুণ্ডভেদী বিরাজ দীপ্তলোচন দীর্ঘবাহু, সুবাহু ও কনকধ্বজ বিনষ্ট হলেন, তাঁদের অন্য ভ্রাতারা ভয়ে পালিয়ে গেলেন।

সন্ধ্যাকালে যুদ্ধের বিরাম হ’ল, কৌরব ও পাণ্ডবগণ নিজ নিজ শিবিরে চ’লে গেলেন।