ভীষ্মপর্ব: ১৫। ভীমের পরাক্রম

(নবম দিনের যুদ্ধ)

কর্ণ ও শকুনিকে দুর্যোধন বললেন, ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ শল্য ও ভূরিশ্রবা পাণ্ডবগণকে কেন দমন করছেন না তার কারণ জানি না, তারা জীবিত থেকে আমার বল ক্ষয় করছে। দ্রোণের সমক্ষেই ভীম আমার ভ্রাতাদের বধ করেছে। কর্ণ বললেন, রাজা, শোক ক’রো না। ভীষ্ম যুদ্ধ থেকে স’রে যান, তিনি অস্ত্রত্যাগ করলে তাঁর সমক্ষেই আমি পাণ্ডবদের সসৈন্যে বধ করব। ভীষ্ম সর্বদা পাণ্ডবদের দয়া করেন, সেই মহারথগণকে জয় করিবার শক্তিও তাঁর নেই। অতএব তুমি শীঘ্র ভীষ্মের শিবিরে যাও, বৃদ্ধ পিতামহকে সম্মান দেখিয়ে তাঁকে অস্ত্রত্যাগে সম্মত করাও।

দুর্যোধন অশ্বারোহণে ভীষ্মের শিবিরে চললেন, তাঁর ভ্রাতারাও সঙ্গে গেলেন। ভৃত্যগণ গন্ধতৈলযুক্ত প্রদীপ নিয়ে পথ দেখাতে লাগল। উষ্ণীষকণ্ঠধারী রক্ষিগণ বেত্রহস্তে ধীরে ধীরে চারিদিকের জনতা সরিয়ে দিলে। ভীষ্মের কাছে গিয়ে দুর্যোধন কৃতাঞ্জলি হয়ে সাশ্রুনয়নে গদগদকণ্ঠে বললেন, শত্রুহন্তা পিতামহ, আমার উপর কৃপা করুন, ইন্দ্র যেমন দানবদের বধ করেছিলেন আপনি সেইরূপ পাণ্ডবগণকে বধ করুন। আপনার প্রতিজ্ঞা স্মরণ করুন, পাণ্ডব পাঞ্চাল কেকয় প্রভৃতিকে বধ ক'রে সত্যবাদী হ'ন। যদি আমার দুর্ভাগ্যক্রমে কৃপাবিষ্ট হয়ে বা আমার প্রতি বিদ্বেষের বশে আপনি পাণ্ডবদের রক্ষা করতেই চান, তবে কর্ণকে যুদ্ধ করবার অনুমতি দিন, তিনিই পাণ্ডবগণকে জয় করবেন।

দুর্যোধনের বাক্যশল্যে বিদ্ধ হয়ে মহামনা ভীষ্ম অত্যন্ত দুঃখিত ও ক্রুদ্ধ হলেন, কিন্তু কোনও অপ্রিয় বাক্য বললেন না। দীর্ঘকাল চিন্তার পর তিনি মৃদু-বাক্যে বললেন, দুর্যোধন, আমাকে বাক্যবাণে পীড়িত করছ কেন, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, তোমার প্রিয়কামনায় সমরানলে প্রাণ আহুতি দিতে প্রস্তুত হয়েছি। পাণ্ডবগণ কিরূপ পরাক্রান্ত তার প্রচুর নিদর্শন তুমি পেয়েছ। খাণ্ডবদাহকালে অর্জুন ইন্দ্রকেও পরাস্ত করেছিলেন। তোমার বীর ভ্রাতারা আর কর্ণ যখন পালিয়েছিলেন তখন অর্জুন তোমাকে গন্ধর্বদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। বিরাট-নগরে গোহরণকালে একাকী অর্জুন আমাদের সকলকে জয় করে উত্তরকে দিয়ে আমাদের বস্ত্র হরণ করিয়েছিলেন। শঙ্খচক্রগদাধর অনন্তশক্তি সর্বেশ্বর পরমাত্মা বাসুদেব যার রক্ষক সেই অর্জুনকে যুদ্ধে কে জয় করতে পারে? নারদাদি মহর্ষিগণ বহুবার তোমাকে বলেছেন কিন্তু তুমি মোহবশে বুঝতে পার না, মুমূর্ষু লোক যেমন সকল বৃক্ষই কাঞ্চনময় দেখে তুমিও সেইরূপ বিপরীত দেখছ। তুমিই এই মহাহবের সৃষ্টি করেছ, এখন নিজেই যুদ্ধ ক'রে পৌরুষ দেখাও। আমি সোমক পাঞ্চাল ও কেকয়গণকে বিনষ্ট করব, হয় তাদের হাতে মরে যমালয়ে যাব নতুবা তাদের সংহার ক'রে তোমাকে তুষ্ট করব। কিন্তু আমার প্রাণ গেলেও শিখণ্ডীকে বধ করব না, কারণ বিধাতা তাকে পূর্বে শিখণ্ডিনী রূপেই সৃষ্টি করেছিলেন। গান্ধারীপুত্র, সুখে নিদ্রা যাও, কাল আমি এমন মহাযুদ্ধ করব যে লোকে চিরকাল তার কথা বলবে। ভীষ্মের কথা শুনে দুর্যোধন নতমস্তকে প্রণাম করে নিজের শিবিরে চলে গেলেন। ভীষ্ম নিজেকে তিরস্কৃত মনে করলেন, তাঁর অতিশয় আত্মগ্লানি হল।

পরদিন ভীষ্ম সর্বতোভদ্র নামে এক মহাব্যূহ রচনা করলেন। কৃপ কৃতবর্মা জয়দ্রথ দ্রোণ ভূরিশ্রবা শল্য ভগদত্ত দুর্যোধন প্রভৃতি এই ব্যূহের বিভিন্ন স্থানে রইলেন। পাণ্ডবগণও এক মহাব্যূহ রচনা করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। অর্জুন ধৃষ্টদ্যুম্নকে বললেন, পাঞ্চালপুত্র, তুমি আজ শিখণ্ডীকে ভীষ্মের সম্মুখে রাখ, আমি তার রক্ষক হব।

যুদ্ধকালে নানাপ্রকার দুর্লক্ষণ দেখা গেল, ভূমিকম্প ও উল্কাপাত হ'ল, শৃগাল কুকুর প্রভৃতি ভয়ংকর শব্দ করতে লাগল। পিঙ্গলতুরঙ্গবাহিত রথে আরূঢ় হয়ে মহাবীর অভিমন্যু শরাঘাতে কৌরবসৈন্য মথিত করতে লাগলেন। দুর্যোধনের আদেশে রাক্ষস অলম্বুষ তাঁকে বাধা দিতে গেল। সে অরিঘাতিনী তামসী মায়া প্রয়োগ করলে, সর্ব স্থান অন্ধকারময় হ'ল, স্বপক্ষ বা পরপক্ষ কিছুই দেখা গেল না। তখন অভিমন্যু ভাস্কর অস্ত্রে সেই মায়া নষ্ট ক'রে অলম্বুষকে শরাঘাতে আচ্ছন্ন করলেন, অলম্বুষ রথ ফেলে ভয়ে পালিয়ে গেল।

যুদ্ধকালে একবার পাণ্ডবপক্ষের অনিবার্য্য কৌরবপক্ষের জয় হ'তে লাগল। অবশেষে ভীষ্মের প্রচণ্ড বাণবর্ষণে পাণ্ডবসৈন্য বিধ্বস্ত হ'ল, মহারথগণও বারণ না শুনে পালাতে লাগলেন। নিহত হস্তী ও অশ্বের মৃতদেহে এবং ভগ্ন রথ ও ধ্বজে রণস্থল ব্যাপ্ত হ'ল, সৈন্যগণ বিমূঢ় হয়ে হাহাকার করতে লাগল।

কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, বীর, তুমি বিরাটনগরে সঞ্জয়কে বলেছিলে যে যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্মদ্রোণ প্রমুখ সমস্ত কুরুসৈন্য সংহার করবে। ক্ষাত্ৰধর্ম স্মরণ ক'রে এখন সেই বাক্য সত্য কর। অর্জুন অধোমুখে অনিচ্ছুর ন্যায় বললেন, যারা অবধ্য তাঁদের বধ ক'রে নরকের পথ স্বরূপ রাজ্যলাভ ভাল, না বনবাসে কষ্টভোগ করা ভাল? কৃষ্ণ, তোমার কথাই রাখব, ভীষ্মের কাছে রথ নিয়ে চল, কুরুপিতামহকে নিপাতিত করব। ভীষ্মের বাণবর্ষণে অর্জুনের রথ আচ্ছন্ন হ'ল, কৃষ্ণ অবিচলিত হয়ে আহত অশ্বদের বেগে চালাতে লাগলেন। (১)

(১) ৯-পরিচ্ছেদে আছে, অর্জুনের মৃদু যুদ্ধ দেখে কৃষ্ণ রথ থেকে নেমে ভীষ্মকে মারবার জন্য নিজেই ধাবিত হলেন। মহাভারতে এই স্থানে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আছে।

ভীষ্ম ও পাণ্ডবগণের শরবর্ষণে দুই পক্ষেরই বহু সৈন্য বিনষ্ট হ'ল। পাণ্ডবসৈন্যগণ ভয়ার্ত হয়ে ভীষ্মের অমানুষিক বিক্রম দেখতে লাগল। এই সময়ে সূর্যাস্ত হ'ল, পাণ্ডব ও কৌরবগণ যুদ্ধে বিরত হয়ে নিজ নিজ শিবিরে চলে গেলেন। দুর্যোধন ও তাঁর ভ্রাতারা বিজয়ী ভীষ্মের প্রশংসা করতে লাগলেন।