ভীষ্মপর্ব: ১৬। ভীষ্ম-সকাশে যুধিষ্ঠিরাদি
শিবিরে এসে যুধিষ্ঠির তাঁর মিত্রদের সঙ্গে মন্ত্রণা করতে লাগলেন। তিনি কৃষ্ণকে বললেন, হস্তী যেমন নলবন মর্দন করে সেইরূপ ভীষ্ম আমাদের সৈন্য মর্দন করছেন। আমি বুদ্ধির দোষে ভীষ্মের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে শোকসাগরে নিমগ্ন হয়েছি। কৃষ্ণ, আমার বনে যাওয়াই ভাল, যুদ্ধে আর রুচি নেই, ভীষ্ম প্রতিদিনই আমাদের হনন করছেন। যে জীবনকে অতি প্রিয় মনে করি তা আজ দুর্লভ হয়েছে, এখন অবশিষ্ট জীবন ধর্ম্মাচরণে যাপন করব। মাধব, যদি আমাদের প্রতি তোমার অনুগ্রহ থাকে তবে এমন উপদেশ দাও যাতে আমার স্বধর্ম্মের বিরোধ না হয়।
কৃষ্ণ বললেন, ধর্ম্মপুত্র, বিষণ্ণ হবেন না, আপনার ভ্রাতারা শত্রুহন্তা দুর্জ্জয় বীর। অর্জ্জুন যদি ভীষ্মবধে অনিচ্ছুক হন তবে আপনি আমাকে নিযুক্ত করুন, আমি ভীষ্মকে যুদ্ধে আহ্বান ক’রে দুর্য্যোধনাদির সমক্ষেই তাঁকে বধ করব। যে পাণ্ডবদের শত্রু, সে আমারও শত্রু, আপনার ও আমার একই ইষ্ট। আপনার ভ্রাতা অর্জ্জুন আমার সখা সম্বন্ধী ও শিষ্য, তাঁর জন্য আমি নিজ দেহের মাংসও কেটে দিতে পারি। অর্জ্জুন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে ভীষ্মকে নিপাতিত করবেন। এখন তিনি সেই কথা রাখুন, অথবা আমাকেই ভার দিন। ভীষ্ম বিপরীত পক্ষে যোগ দিয়েছেন, নিজের কর্ত্তব্য বুঝছেন না, তাঁর বল ও জীবন শেষ হয়ে এসেছে।
যুধিষ্ঠির বললেন, গোবিন্দ, তুমি আমাদের রক্ষক থাকলে আমরা ভীষ্মকে কেন, ইন্দ্রকেও জয় করতে পারি। কিন্তু স্বার্থের জন্য তোমাকে মিথ্যাবাদী করতে পারি না, তুমি যুদ্ধ না ক’রেই আমাদের সাহায্য কর। ভীষ্ম আমাকে বলেছিলেন যে দুর্য্যোধনের পক্ষে যুদ্ধ করলেও তিনি আমার হিতের জন্য মন্ত্রণা দেবেন। অতএব আমরা সকলে মিলে তাঁর কাছে যাব এবং তাঁর বধের উপায় জেনে নেব। তিনি নিশ্চয় আমাদের হিতকর সত্য বাক্য বলবেন, আমাদের যাতে জয় হয় এমন মন্ত্রণা দেবেন। বালক ও পিতৃহীন অবস্থায় তিনিই আমাদের বর্দ্ধিত করেছিলেন মাধব, সেই বৃদ্ধ প্রিয় পিতামহকে আমি হত্যা করতে চাচ্ছি—ক্ষত্রজীবিকায় ধিক্!
পাণ্ডবগণ ও কৃষ্ণ কবচ ও অস্ত্র ত্যাগ ক’রে ভীষ্মের কাছে গিয়ে নতমস্তকে প্রণাম করলেন। সাদরে স্বাগত জানিয়ে ভীষ্ম বললেন, বৎসগণ, তোমাদের কি প্রিয়কার্য্য করব? নিঃশঙ্ক হয়ে বল, যদি অতি দুষ্কর কর্ম্ম হয় তাও আমি করব। ভীষ্ম প্রীতিপূৰ্ব্বক বার বার এইরূপ বললে যুধিষ্ঠির ভীষ্মকে বললেন, সৰ্ব্বজ্ঞ, কোন্ উপায়ে আমরা জয়ী হব, রাজ্যলাভ করব? প্রজারা কিসে রক্ষা পাবে? আপনার বধের উপায় বলুন। যুদ্ধে আপনার বিক্রম আমরা কি করে সইব? আপনার সূক্ষ্ম ছিদ্রও দেখা যায় না, কেবল মণ্ডলাকার ধনুই দেখতে পাই। আপনি রথে সূর্যের ন্যায় বিরাজ করেন; কখন বাণ নেন, কখন সন্ধান করেন, কখন জ্যাকার্ষণ করেন, কিছুই দেখতে পাই না। আপনার শরবর্ষণে আমাদের বিপুলা সেনা ক্ষয় পাচ্ছে। পিতামহ, বলুন কিরূপে আমরা জয়ী হব।
ভীষ্ম বললেন, পাণ্ডবগণ, আমি জীবিত থাকতে তোমাদের জয়লাভ হবে না। যদি জয়ী হতে চাও তবে অনুমতি দিচ্ছি তোমরা শীঘ্র যথাসুখে আমাকে প্রহার কর। এই কার্যই তোমাদের কর্তব্য মনে করি, আমি হত হলে সকলেই হত হবে। যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি উদ্ধত ক্রুদ্ধ কৃতান্তের ন্যায় যুদ্ধ করেন, বজ্রধর ইন্দ্র এবং সমস্ত সুরাসুরও আপনাকে জয় করতে পারেন না, আমরা কি করে জয়ী হব তার উপায় বলুন। ভীষ্ম বললেন, পাণ্ডুপুত্র, তোমার কথা সত্য, সশস্ত্র হয়ে যুদ্ধ করলে আমি সুরাসুরদেরও অজেয়। কিন্তু আমি যদি অস্ত্র ত্যাগ করি তবে তোমরা আমাকে বধ করতে পারবে। নিরস্ত্র, ভূপতিত, বর্ম ও ধনু বিহীন, পলায়মান, ভীত, শরণাপন্ন, স্ত্রী, স্ত্রী নামধারী, বিকলিন্দ্রিয়, একপুত্রের পিতা, এবং নীচজাতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। যার ধ্বজ অমঙ্গলসূচক তার সঙ্গেও যুদ্ধ করি না। তোমার সেনাদলে দ্রুপদগৃহে মহারথ শিখণ্ডী আছেন, তিনি পূর্বে স্ত্রী ছিলেন তা তোমরা জান। শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে অর্জুন আমার প্রতি তীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপ করুন। এই উপায়ে তোমরা ধার্তরাষ্ট্রগণকে জয় করতে পারবে।
কুরুপিতামহ মহাত্মা ভীষ্মকে অভিবাদন করে পাণ্ডবগণ নিজেদের শিবিরে ফিরে গেলেন। ভীষ্মকে প্রাণবিসর্জনে প্রস্তুত দেখে অর্জুন দুঃখিত ও লজ্জিত হয়ে বললেন, মাধব, কুরুবংশ পিতামহের সঙ্গে কি করে যুদ্ধ করব? আমি বাল্যকালে গায়ে ধূলি মেখে তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকেও ধূলিলিপ্ত করেছি, তাঁর কোলে উঠে পিতা বলে ডেকেছি(১)। তিনি বলতেন, বৎস, আমি তোমার পিতা নই, পিতার পিতা। সেই ভীষ্মকে কি করে বধ করব? তিনি যেমন ইচ্ছা আমাদের সৈন্য ধ্বংস করুন, আমি তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করব না, তত্ত্বে আমার জয় বা মৃত্যু যাই হোক। কৃষ্ণ, তুমি কি বল?
কৃষ্ণ বললেন, তুমি ক্ষত্রধৰ্মানুসারে ভীষ্মবধের প্রতিজ্ঞা করেছ, এখন পশ্চাৎপদ হচ্ছ কেন? তুমি ওই দুৰ্ধর্ষ ক্ষত্রিয় বীরকে রথ থেকে নিপাতিত কর, নতুবা তোমার জয়লাভ হবে না। দেবতারা পূৰ্বেই জেনেছেন যে ভীষ্ম যমালয়ে যাবেন, এর অন্যথা হবে না। মহাবুদ্ধি বৃহস্পতি ইন্দ্রকে কি বলেছিলেন শোন — বয়োজ্যেষ্ঠ বৃদ্ধ গুণবান্ গুরুও যদি আততায়ী হয়ে আসেন তবে তাঁকে বধ কর।