দ্রোণপর্ব: ৮। সুবর্ণষ্ঠীবীর উপাখ্যান

মৃত্যুর উপাখ্যান শোনার পর যুধিষ্ঠির বললেন, ভগবান, আপনি আমাকে পুণ্যকর্মা ইন্দ্রতুল্যবিক্রমশালী নিষ্পাপ সত্যবাদী রাজর্ষিদের কথা বলুন। ব্যাসদেব এই উপাখ্যান বললেন। —

একদিন দেবর্ষি নারদ ও পর্বত তাঁদের সখা শিবতুল্য রাজা সৃঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তাঁরা সুখে উপবিষ্ট হ’লে একটি শুচিস্মিতা বরবর্ণিনী কন্যা তাঁদের কাছে এলেন। পর্বত ঋষি জিজ্ঞাসা করলেন, এই চঞ্চলনয়না সর্বলক্ষণযুক্তা কন্যাটি কার? এ কি সূর্যের দীপ্তি, না অগ্নির শিখা, না শ্রী হ্রী কীর্তি ধৃতি পুষ্টি সিদ্ধি, কিংবা চন্দ্রমার প্রভা? সৃঞ্জয় বললেন, এ আমারই কন্যা। নারদ বললেন, রাজা, যদি সমূহ শ্রেয় লাভ করতে চাও তবে এই কন্যাটিকে ভার্যারূপে আমাকে দাও। তখন পর্বত ঋষি ক্রুদ্ধ হয়ে নারদকে বললেন, আমি পূর্বে যাকে মনে মনে বরণ করেছি তাকেই তুমি চাচ্ছ! ব্রাহ্মণ, তুমি আর নিজের ইচ্ছানুসারে স্বর্গে যেতে পারবে না। নারদ বললেন, মন্ত্রপাঠাদির দ্বারা বিবাহ সম্পূর্ণ হয় না, সপ্তপদীগমনেই সম্পূর্ণ হয়। এই কন্যা আমার ভার্যা হবার পূর্বেই তুমি আমাকে শাপ দিলে, অতএব তুমিও আমার সঙ্গে ভিন্ন স্বর্গে যেতে পারবে না। পরস্পর অভিশাপের পর নারদ ও পর্বত সৃঞ্জয়ের নিকটেই বাস করতে লাগলেন।

রাজা সৃঞ্জয় তপস্যাপরায়ণ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণকে সেবা দ্বারা তুষ্ট ক’রে বর চাইলেন, যেন তাঁর গুণবান যশস্বী কীর্তিমান তেজস্বী ও শত্রুনাশন পুত্র হয়। বর পেয়ে যথাকালে তাঁর একটি পুত্র হ’ল। এই পুত্রের মূত্র পুরীষ ক্লেদ ও স্বেদ সুবর্ণময়, সেজন্য তার নাম হ’ল সুবর্ণষ্ঠীবী। রাজা ইচ্ছামত সকল বস্তু স্বর্ণে রূপান্তরিত করতে লাগলেন, কালক্রমে তাঁর গৃহ প্রাকার দুর্গ ব্রাহ্মণাবাস শয্যা আসন যান স্থালী প্রভৃতি সবই স্বর্ণময় হল। এক দল দস্যু লুব্ধ হয়ে স্বর্ণের আকরস্বরূপ রাজপুত্রকে হরণ করে বনে নিয়ে গেল। তারা সুবর্ণষ্ঠীবীকে কেটে খণ্ড খণ্ড করলে, কিন্তু তাদের কোনও অর্থলাভ হ’ল না। রাজপুত্রের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে রাজার সমস্ত ধন লুপ্ত হ’ল, মূর্খ দস্যুরাও বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পরস্পরকে বধ ক’রে নরকে গেল।

সৃঞ্জয় রাজা পুত্রশোকে মৃতপ্রায় হয়ে বিলাপ করতে লাগলেন। নারদ তাঁকে বললেন, আমরা ব্রহ্মবাদী বিপ্রগণ তোমার গৃহে বাস করছি, আর তুমি কাম্য বিষয়ের ভোগে অতৃপ্ত থেকেই মরবে! যজ্ঞ বেদাধ্যয়ন দান আর তপস্যায় যাঁরা তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ এমন বহু রাজার মৃত্যু হয়েছে, অতএব অবশ্যকারী অদাতা পুত্রের মৃত্যুর জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়। তার পর নারদ উদাহরণ স্বরূপ এই ষোল জন মহাত্মার কথা বললেন। —

রাজর্ষি মরুত্ত, যাঁর ভবনে দেবতারা পরিবেশন করতেন। রাজা সুহোত্র, যাঁর জন্য পর্জন্যদেব হিরণ্য বর্ষণ করতেন। পুরুুর পুত্র জনমেজয়, যিনি প্রতি বার যজ্ঞকালে দশ সহস্র স্বর্ণভূষিত হস্তী, বহু সহস্র সালংকারা কন্যা এবং কোটি বৃষ দক্ষিণা দিতেন। উশীনরপুত্র শিবি, যাঁর যজ্ঞে দধিদুগ্ধের মহাহ্রদ এবং শুক্ল অন্নের পর্বত থাকত। দশরথপুত্র রাম, যিনি সুরাসুরের অবধ্য দেবব্রাহ্মণের কণ্টক রাবণকে বধ এবং এগার হাজার বৎসর রাজত্ব ক’রে প্রজাদের নিয়ে স্বর্গে গিয়েছিলেন। ভগীরথ, যাঁকে সমুদ্রগামিনী গঙ্গা পিতা ব’লে স্বীকার করেছিলেন। দিলীপ, যিনি যজ্ঞে ব্রাহ্মণগণকে বসুধা দান করেছিলেন এবং যাঁর ভবনে বেদপাঠধ্বনি, জ্যানির্ঘোষ, এবং ‘পান-ভোজন কর’ এই শব্দ কখনও থামত না। যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতা, যিনি আসমুদ্র পৃথিবী ব্রাহ্মণগণকে দান করে পুণ্য- লোকে গিয়েছিলেন। নহুষের পুত্র যযাতি, যিনি বহুবিধ যজ্ঞ করেছিলেন এবং দ্বিতীয় ইন্দ্রের ন্যায় ইচ্ছানুসারে স্বর্গোদ্যানে বিহার করতেন। নাভাগের পুত্র অম্বরীষ, যিনি যজ্ঞে ব্রাহ্মণগণকে দক্ষিণাস্বরূপ কোষ ও সৈন্য সহ শত সহস্র রাজ্য দান করেছিলেন। রাজা শশ বিন্দু, যাঁর অশ্বমেধ যজ্ঞে এক ক্রোশ উচ্চ তেরটা খাড়ের পর্বত প্রস্তুত হয়েছিল। অমূর্তরয়ার পুত্র গয়, যিনি অশ্বমেধ যজ্ঞে মণিকঙ্কণে খচিত স্বর্ণময় পৃথিবী নির্মাণ ক’রে ব্রাহ্মণগণকে দান করতেন এবং অক্ষয় বট ও পবিত্র ব্রহ্মসরোবরের জন্য বিখ্যাত হয়েছেন। সংস্কৃতির পুত্র রন্তিদেব, যাঁর দুই লক্ষ পাচক ছিল, যাঁর কাছে পশুর দল স্বর্গলাভের জন্য নিজেরাই আসত, যাঁর গৃহে অতিথি এলে একুশ হাজার বৃষ হত্যা করা হ’ত, কিন্তু তাতেও পর্যাপ্ত হ’ত না, ভোজনের সময় পাচকরা বলত, আজ মাংস কম, আপনারা বেশী করে সুপ (দাল) খান। দুষ্মন্তের পুত্র ভরত, যিনি অত্যন্ত বলবান ছিলেন এবং যমুনা সরস্বতী ও গঙ্গার তীরে বহু সহস্র যজ্ঞ করেছিলেন। বেণ রাজার পুত্র পৃথু, যাঁর আজ্ঞায় পৃথিবীকে দোহন ক’রে বৃক্ষ পর্বত দেবাসুর মনুষ্য প্রভৃতি অভীষ্ট বিষয় লাভ করেছিলেন। এই মহাত্মারা সকলেই মরেছেন। জমদগ্নিপুত্র পরশুরামও মরবেন, যিনি একুশ বার পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন এবং কশ্যপকে সপ্তদ্বীপা বসুমতী দান করে মহেন্দ্র পর্বতে বাস করছেন।

নারদ সৃঞ্জয়কে বলিলেন, আমার কথা তুমি শুনলে কি? না শ্রদ্ধার ব্রাহ্মণ পতি শ্রাদ্ধ করলে যেমন নিষ্ফল হয়, আমার বাক্যও সেইরূপ নিষ্ফল হ'ল? সৃঞ্জয় করজোড়ে বললেন, সূর্য্যের কিরণে যেমন অন্ধকার দূর হয় সেইরূপ আপনার আখ্যান শুনে আমার পুত্রশোক দূর হয়েছে। নারদ বললেন, তুমি অভীষ্ট বর চাও, আমাদের কথা মিথ্যা হবে না। সৃঞ্জয় বললেন, ভগবান, আপনি প্রসন্ন হয়েছেন তাতেই আমি হৃষ্ট হয়েছি। নারদ বললেন, তোমার পুত্র দস্যুহস্তে বৃথা নিহত হয়েছে, তাকে কষ্টময় নরক থেকে উদ্ধার ক'রে তোমাকে দান করছি। তখন নারদের বরে সুবর্ণষ্ঠীবী পুনর্জীবিত হ'ল।

উপাখ্যান শেষ ক'রে ব্যাস যুধিষ্ঠিরকে বললেন, সৃঞ্জয়ের পুত্র বালক, সে ভয়ার্থ ও যুদ্ধে অক্ষম ছিল, কৃতকর্মা না হয়ে যজ্ঞ না ক'রে নিঃসন্তান অবস্থায় মরেছিল, এজন্যই সে পুনর্জীবন পেয়েছিল। কিন্তু অভিমন্যু মহাবীর ও কৃতকর্মা, তিনি বহু সহস্র শত্রুকে সন্তপ্ত ক'রে সম্মুখ সমরে নিহত হয়ে অক্ষয় স্বর্গলোকে গেছেন, সেখান থেকে কেউ মর্ত্যে আসতে চায় না। অতএব অর্জুনের পুত্রকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তিনি অমৃতকিরণে উদ্ভাসিত হয়ে চন্দ্রের ন্যায় বিরাজ করছেন, তাঁর জন্য শোক করা উচিত নয়। মহারাজ, তুমি ধৈর্য্য ধারণ ক'রে শত্রু জয় কর। এই ব'লে ব্যাস চলে গেলেন।