দ্রোণপর্ব: ৯। অর্জ্জুনের প্রতিজ্ঞা
সেইদিন সায়াহ্নকালে দুই পক্ষের সৈন্য যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হলে অর্জুন সংশপ্তকগণকে বধ ক'রে নিজ শিবিরে যাত্রা করলেন। তিনি যেতে যেতে সাশ্রুকণ্ঠে বললেন, কেশব, আমার হৃদয় ত্রস্ত হচ্ছে কেন? আমি কথা বলতে পারছি না, শরীর অবসন্ন হচ্ছে, বহু অশুভ লক্ষণ দেখছি। আমার ভ্রাতারা কুশলে আছেন তো? কৃষ্ণ বললেন, তুমি চিন্তিত হয়ো না, তাঁরা ভালই আছেন, হয়তো সামান্য কিছু অনিষ্ট হয়ে থাকবে।
নিরানন্দ আলোকহীন শিবিরে উপস্থিত হয়ে অর্জুন দেখলেন, মাঙ্গলিক বাদ্য বাজছে না, শঙ্খধ্বনি হচ্ছে না, ভ্রাতারা যেন অচেতন হয়ে রয়েছেন। উদ্বিগ্ন হয়ে অর্জুন তাঁদের বললেন, আপনারা সকলে ম্লানমুখে রয়েছেন, অভিমন্যুকে দেখছি না। শুনেছি দ্রোণ চক্রব্যূহ রচনা করেছিলেন, অভিমন্যু ভিন্ন আপনাদের আর কেউ তা ভেদ করতে পারেন না। কিন্তু তাকে আমি প্রবেশ করতেই শিখিয়েছি, নির্গমের প্রণালী শিখাই নি। ব্যূহমধ্যে প্রবেশ ক’রে অভিমন্যু কি নিহত হয়েছে? সুভদ্রার প্রিয় পুত্র, দ্রৌপদী কৃষ্ণ ও আমার স্নেহভাজন অভিমন্যুকে কে বধ করেছে? যার কেশপ্রান্ত কুঞ্চিত, চক্ষু হরিণ- শাবকের ন্যায়, দেহ নব-শাল তরুর ন্যায়; যে সর্বদা স্মিতমুখে কথা বলে, গুরুজনের আজ্ঞা পালন করে, বালক হয়েও বয়স্কের ন্যায় কার্য করে; যে যুদ্ধে প্রথম প্রহার করে না, অধীরও হয় না, যে মহারথ বলে গণ্য, যার বিক্রম আমার চেয়ে অর্দ্ধ গুণ অধিক, যে কৃষ্ণ প্রদুম্ন ও আমার প্রিয় শিষ্য, সেই পুত্রকে যদি দেখতে না পাই তবে আমি যমসদনে যাব। হা পুত্র, আমি ভাগ্যহীন তাই তোমাকে সর্বদা দেখেও আমার তৃপ্তি হ’ত না। যম তোমাকে সবলে নিয়ে গেছেন, তুমি দেবগণের প্রিয় অতিথি হয়েছ।
তার পর অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, অভিমন্যু শত্রুণিপীড়ন করে সম্মুখ যুদ্ধে স্বর্গারোহণ করেছে তো? কর্ণ দ্রোণ প্রভৃতির বাণে কাতর হয়ে সে নিশ্চয় বার বার বিলাপ করেছে—যদি পিতা এসে আমাকে রক্ষা করতেন! সেই অবস্থার নৃশংসগণ তাকে নিপাতিত করেছে। অথবা, যে আমার পুত্র, কৃষ্ণের ভাগিনেয়, সুভদ্রার গর্ভজাত, সে এমন বিলাপ করতে পারে না। তাকে না দেখে সুভদ্রা আর দ্রৌপদী কি বলবেন, আমিই বা তাঁদের কি বলব? আমার হৃদয় নিশ্চয় বজ্রসারময়, শোকার্ত্ত বধূ উত্তরার রোদনেও তা বিদীর্ণ হবে না। আমি গর্বিত ধাতরাষ্ট্রগণের সিংহনাদ শুনেছিলাম, কৃষ্ণও যুবুৎসুকে বলতে শুনেছেন—অধর্মিষ্ঠ মহারথগণ, অর্জুনের পরিবর্তে একটি বালককে বধ ক’রে চিৎকার করছ কেন?
পুত্রশোকার্ত অর্জুনকে ধরে কৃষ্ণ বললেন, অর্জুন, শান্ত হও, সকল ক্ষত্রিয় বীরেরই এই পন্থা, অভিমন্যু পুণ্যার্জিতলোকে গেছেন তাতে সংশয় নেই। সকল বীরেরই এই আকাঙ্ক্ষা—যেন সম্মুখ যুদ্ধে আমার মৃত্যু হয়। ভরতশ্রেষ্ঠ, তোমাকে শোকাবিষ্ট দেখে তোমার ভ্রাতারা, এই রাজারা, এবং সুহৃদ্গণ সকলেই কাতর হয়েছেন। তুমি সান্ত্বনা দিয়ে এদের আশ্বস্ত কর। যা জ্ঞাতব্য তা তুমি জান, অতএব শোক ক’রো না।
গদ্গদকণ্ঠে অর্জুন ভ্রাতাদের বললেন, অভিমন্যুর মৃত্যু কি ক’রে হ’ল শুনতে ইচ্ছা করি। আপনারা রথারোহী হয়ে শরবর্ষণ করছিলেন, শত্রুরা অন্যায় যুদ্ধে কি ক'রে তাকে বধ করলে? হা, আপনাদের পৌরুষ নেই, পরাক্রমও নেই। আমারই দোষ, তাই দুর্ব্বল বীর, অদৃঢ়প্রতিজ্ঞ আপনাদের উপর ভার দিয়ে অন্যত্র গিয়েছিলাম। আপনাদের বর্ম্ম আর অস্ত্রশস্ত্র অলঙ্কারমাত্র, সভায় যে বীরত্ব প্রকাশ করতেন তাও কেবল মুখের কথা, তাই আমার পুত্রকে রক্ষা করতে পারলেন না। এই বলে অর্জুন অশ্রুপূর্ণমুখে অসিচর্ম্মহস্তে ক্রুদ্ধ কৃতান্তের ন্যায় দাঁড়িয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, মহাবাহু, তুমি সংশপ্তকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে দ্রোণ তাঁর সৈন্য ব্যূহবদ্ধ ক'রে আমাদের নিপীড়িত করতে লাগলেন। নিরুপায় হয়ে আমরা অভিমন্যুকে বললাম, বৎস, তুমি দ্রোণের সৈন্য ভেদ কর। যে পথে সে ব্যূহমধ্যে প্রবেশ করবে সেই পথে আমরাও যাব এই ইচ্ছায় আমরা তার অনুসরণ করলাম, কিন্তু জয়দ্রথ মহাদেবের বরপ্রভাবে আমাদের সকলকেই নিবারিত করলেন। তার পর দ্রোণ কৃপ কর্ণ অশ্বত্থামা বৃহদ্বল ও কৃতবর্মা এই ছয় রথী অভিমন্যুকে বেষ্টন করলেন। বালক অভিমন্যু যথাশক্তি যুদ্ধ করতে লাগলেন, কিন্তু অবশেষে তাঁর রথ নষ্ট হ'ল, তখন দুঃশাসনের পুত্র তাঁকে হত্যা করলে। অভিমন্যু বহু সহস্র হস্তী অশ্ব রথ ধ্বংস ক'রে এবং বহু বীর ও রাজা বৃহদ্বলকে স্বর্গে পাঠিয়ে স্বয়ং স্বর্গে গেছেন।
অর্জুন 'হা পুত্র' ব'লে ভূপতিত হলেন, তার পর সংজ্ঞা লাভ ক'রে জ্বররোগীর ন্যায় কাঁপতে কাঁপতে হাতে হাত ঘষে বললেন, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, জয়দ্রথ যদি ভয় পেয়ে দুর্য্যোধনাদিকে ত্যাগ করে না পালায় তবে কালই তাকে বধ করব। সে যদি আমার বা কৃষ্ণের বা মহারাজ যুধিষ্ঠিরের শরণাপন্ন না হয় তবে কালই তাকে বধ করব। যদি কাল তাকে নিহত করতে না পারি তবে যে নরকে মাতৃহন্তা ও পিতৃহন্তা যায়, গুরুপত্নীগামী, বিশ্বাসঘাতক, ভুক্তপূর্ব্বা স্ত্রীর নিন্দাকারী, গোহন্তা, এবং ব্রহ্মহন্তা যায়, সেই নরকে আমি যাব। যে লোক পা দিয়ে ব্রাহ্মণ গো বা অগ্নি স্পর্শ করে, জলে মল মূত্র শ্লেষ্মা ত্যাগ করে, নগ্ন হয়ে স্নান করে, অতিথিকে আহার দেয় না, উৎকোচ নেয়, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, স্ত্রী পুত্র ভৃত্য ও অতিথিকে ভাগ না দিয়ে মিষ্টান্ন খায়; যে ব্রাহ্মণ শীতভীত, যে ক্ষত্রিয় রণভীত, যে কৃতঘ্ন, এবং ধর্ম্মচ্যুত অন্যান্য লোক যে নরকে যায় সেই নরকে আমি যাব। আরও প্রতিজ্ঞা করছি শুনুন— পাপী জয়দ্রথ জীবিত থাকতে যদি কাল সূর্যাস্ত হয় তবে আমি জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করব। সুরাসুর গন্ধর্ব্ব মহর্ষি দেবর্ষি স্থাবর জঙ্গম কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না, সে রসাতলে আকাশে দেবপুরে বা দানবপুরে যেখানেই থাক, আমি শরাঘাতে তার শিরচ্ছেদন করব।
অর্জুন বামে ও দক্ষিণে গাণ্ডীব ধনুর জ্যাঘর্ষণ করলেন, সেই নির্ঘোষ তাঁর কণ্ঠধ্বনি অতিক্রম ক’রে আকাশ স্পর্শ করলে। তার পর কৃষ্ণ পাঞ্চজন্য এবং অর্জুন দেবদত্ত শঙ্খ বাজালেন, আকাশ পাতাল ও পৃথিবী কেঁপে উঠল, নানাবিধ বাদ্যধ্বনি হ’ল, পাণ্ডবগণ সিংহনাদ করলেন।