দ্রোণপর্ব: ১০। জয়দ্রথের ভয় — সুভদ্রার বিলাপ

পাণ্ডবগণের সেই মহানিনাদ শুনে এবং চরমুখে অর্জুনের প্রতিজ্ঞার সংবাদ জেনে জয়দ্রথ উদ্বিগ্ন হয়ে দুর্য্যোধন প্রভৃতিকে বললেন, পাণ্ডুর পত্নীর গর্ভে কামরূপী ইন্দ্রের ঔরসে যে পুত্র জন্মেছিল সেই দুর্ব্বুদ্ধি অর্জুন আমাকে যমালয়ে পাঠাতে চায়। তোমাদের মঙ্গল হ’ক, আমি প্রাণরক্ষার জন্য নিজ ভবনে চ’লে যাব। অথবা তোমরা আমাকে রক্ষা কর, অভয় দাও। পাণ্ডবদের সিংহনাদ শুনে আমার অত্যন্ত ভয় হয়েছে, মুূর্ষুর ন্যায় শরীর অবসন্ন হয়েছে। তোমরা অনুমতি দাও, আমি আত্মগোপন করি, যাতে পাণ্ডবরা আমাকে দেখতে না পায়। দুর্য্যোধন বললেন, নরব্যাঘ্র, ভয় পেয়ো না, তুমি ক্ষত্রিয় বীরগণের মধ্যে থাকলে কে তোমাকে আক্রমণ করবে? আমরা সসৈন্যে তোমাকে রক্ষা করব। তুমি স্বয়ং রথিশ্রেষ্ঠ মহাবীর, তবে পাণ্ডবদের ভয় করছ কেন?

রাত্রিকালে জয়দ্রথ দুর্য্যোধনের সঙ্গে দ্রোণের কাছে গিয়ে তাঁকে প্রণাম ক’রে বললেন, আচার্য্য, অস্ত্রশিক্ষায় অর্জুন আর আমার প্রভেদ কি তা জানতে ইচ্ছা করি। দ্রোণ বললেন, বৎস, আমি তোমাদের সমভাবেই শিক্ষা দিয়েছি, কিন্তু যোগাভ্যাস ও কষ্টভোগ ক’রে অর্জুন অধিকতর শক্তিমান হয়েছেন। তথাপি তুমি ভয় পেয়ো না, আমি তোমাকে নিশ্চয় রক্ষা করব। আমি এমন ব্যূহ রচনা করব যা অর্জুন ভেদ করতে পারবেন না। তুমি স্বধর্ম্ম অনুসারে যুদ্ধ কর। মনে রেখো, আমরা কেউ চিরকাল বাঁচব না, কালবশে সকলেই নিজ নিজ কৰ্ম্মসহ পরলোকে যাব। দ্রোণের কথা শুনে জয়দ্রথ আশ্বস্ত হলেন এবং ভয় ত্যাগ ক’রে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন।

কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে মন্ত্রণা না ক’রেই প্রতিজ্ঞা করেছ যে কাল জয়দ্রথকে বধ করবে; এই দুঃসাহসের জন্য যেন আমরা উপহাসাস্পদ না হই। আমি কৌরবশিবিরে যে চর পাঠিয়েছিলাম তাদের কাছে শুনেছি, কর্ণ ভূরিশ্রবা অশ্বত্থামা বৃষসেন কৃপ ও শল্য এই ছয় জন জয়দ্রথের সঙ্গে থাকবেন। এঁদের জয় না করলে জয়দ্রথকে পাবে না। অর্জ্জুন বললেন, আমি মনে করি, এঁদের মিলিত শক্তি আমার অর্দ্ধেকের তুল্য। মধুসূদন, তুমি দেখো, কাল আমি দ্রোণাদির সমক্ষেই জয়দ্রথের মুণ্ড ভূপাতিত করব। কাল সকলেই দেখবে, ক্রূরাচারী পাপাচারী জয়দ্রথ আমার বাণে বিদীর্ণ হয়ে রণভূমিতে পতিত হয়েছে। দিব্যাস্ত্র, গাণ্ডীব, আমি যোদ্ধা, আর তুমি সারথি থাকলে কি না জয় করা যায়? কৃষ্ণ, কাল প্রভাতেই যাতে আমার রথ সজ্জিত থাকে তা দেখো। এখন তুমি তোমার ভগিনী সুভদ্রা এবং আমার পুত্রবধূ উত্তরাকে সান্ত্বনা দাও, উত্তরার সহচরীদের শোক দূর কর।

কৃষ্ণ দুঃখিতমনে অর্জ্জুনের গৃহে গিয়ে সুভদ্রাকে বললেন, বার্ষ্ণেয়ী (১), তুমি আর বধূ উত্তরা কুমার অভিমন্যুর জন্য শোক ক'রো না, কালবশে সকল প্রাণীরই এই গতি হয়। মহৎ কুলে জাত ক্ষত্রিয় বীরের এরূপ মরণই উপযুক্ত। পিতার ন্যায় পরাক্রান্ত মহারথ অভিমন্যু বীরের অভিলষিত গতি লাভ করেছেন। তপস্যা ব্রহ্মচর্য্য বেদধারণ ও প্রজ্ঞা দ্বারা সাধুজন যেখানে যেতে চান তোমার পুত্র সেখানে গেছেন। তুমি বীরপ্রসবিনী বীরপত্নী বীরবান্ধবা, শোক ক'রো না, তোমার তনয় পরমা গতি পেয়েছেন। বালকহন্তা পাপী জয়দ্রথ তার কর্ম্মের উপযুক্ত ফল পাবে, অমরাবতীতে আশ্রয় নিলেও সে অর্জ্জুনের হাতে নিষ্কৃতি পাবে না। তুমি কালই শুবে, জয়দ্রথের মুণ্ড ছিন্ন হয়ে সমন্তপঞ্চকের বাইরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। রাজ্ঞী, তুমি পুত্রবধূকে আশ্বস্ত কর, কাল তুমি বিশেষ প্রিয় সংবাদ শুবে, তোমার পতি যে প্রতিজ্ঞা করেছেন তার অন্যথা হবে না।

(১) বৃষ্ণিবংশজাতা।

পুত্রশোকার্ত্তা সুভদ্রা বিলাপ করতে লাগলেন, হা পুত্র, তুমি এই মন্দভাগিনীর ক্রোড়ে এসে পিতৃতুল্য পরাক্রান্ত হয়েও কেন নিহত হ’লে? তুমি সুখভোগে অভ্যস্ত ছিলে, উত্তম শয্যায় শুতে, আজ কেন বাণবিদ্ধ হয়ে ভূশয়ন করেছ? বরনারিগণ যে মহাবাহুর সেবা করত, আজ শকুনিরা কেন তার কাছে রয়েছে? ভীমার্জ্জুন বৃষ্ণি পাঞ্চাল কেকয় মৎস্য প্রভৃতি বীরগণকে ধিক, তাঁরা তোমাকে রক্ষা করতে পারলেন না! হা বীর, তুমি স্বপ্নলব্ধ ধনের ন্যায় দেখা দিয়ে বিনষ্ট হ’লে! তোমার এই শোকবিহ্বলা তরুণী ভার্য্যাকে কি ক’রে বাঁচিয়ে রাখব? হা পুত্র, তুমি ফলদানের সময় আমাকে ত্যাগ ক’রে অকালে এখানে দ্রোণপর্বের ৪০০ নম্বর পৃষ্ঠার প্রতিলিপি দেওয়া হলো। আপনার নির্দেশমতো শুরুতে ট্যাগ সেকশন যোগ করা হয়েছে এবং মূল টেক্সট ইউনিকোড বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছে।

চলে গেলে! যজ্ঞকারী দানশীল ব্রহ্মচর্য্যপরায়ণ গুরুশুশ্রূষাকারী ব্রাহ্মণদের যে গতি, যুদ্ধে অপরাঙ্মুখ শত্রুহন্তা বীরগণের যে গতি, একভার্য্য পুরুষের যে গতি, সদাচার ও চতুরাশ্রমীর পুণ্য রক্ষাকারী রাজা এবং সর্বভূতের প্রতি প্রীতিযুক্ত অনিষ্ঠুর লোকের যে গতি, তুমি সেই গতি লাভ কর।

সুভদ্রা উত্তরার সঙ্গে এইরূপ বিলাপ করছিলেন এমন সময় দ্রৌপদী সেখানে এলেন এবং সকলে শোকাকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে উন্মত্তের ন্যায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। জলসেচনে তাঁদের সচেতন করে কৃষ্ণ বললেন, সুভদ্রা, শোক ত্যাগ কর; পাঞ্চালী, উত্তরাকে সান্ত্বনা দাও। অভিমন্যু ক্ষত্রিয়োচিত উত্তম গতি পেয়েছেন, আমাদের বংশের সকলেই যেন এই গতি পায়। তিনি যে মহৎ কর্ম করেছেন, আমরা ও আমাদের সুহৃদগণও যেন সেইরূপ কর্ম করতে পারি।