দ্রোণপর্ব: ১১। অর্জ্জুনের স্বপ্ন

সুভদ্রা প্রভৃতির নিকট বিদায় নিয়ে কৃষ্ণ অর্জ্জুনের জন্য কুশ দিয়ে একটি শয্যা রচনা করলেন এবং তার চতুর্দিকে মাল্য গন্ধদ্রব্য লাজ ও অস্ত্রশস্ত্রে সাজিয়ে দিলেন। পরিচারকগণ সেই শয্যার নিকটে মহাদেবের নৈশপূজার উপকরণ রেখে দিলে। কৃষ্ণের উপদেশ অনুসারে অর্জ্জুন পূজা করলেন, তার পর কৃষ্ণ নিজের শিবিরে ফিরে গেলেন।

সেই রাত্রিতে পাণ্ডবশিবিরে কারও নিদ্রা হ’ল না, সকলেই উদ্বিগ্ন হয়ে অর্জ্জুনের দুরূহ প্রতিজ্ঞার বিষয় ভাবতে লাগলেন। মধ্যরাত্রে কৃষ্ণ তাঁর সারথি দারুককে বললেন, আমি কাল এমন কার্য্য করব যাতে সূর্য্যাস্তের পূর্বেই অর্জ্জুন জয়দ্রথকে বধ করতে পারবেন। অর্জ্জুনের চেয়ে প্রিয়তর আমার কেউ নেই, তাঁর জন্য আমি কৌরবগণকে সংহার করব। রাত্রি প্রভাত হ’লেই তুমি আমার রথ প্রস্তুত করবে এবং তাতে আমার কৌমোদকী গদা, দিব্য শক্তি, চক্র, ধনুর্বাণ, ছত্র প্রভৃতি রাখবে এবং চার অশ্ব যোজিত করবে। পাঞ্চজন্যের নির্ঘোষ শুনলেই তুমি সত্বর আমার কাছে আসবে। দারুক বললেন, পুরুষব্যাঘ্র, আপনি যাঁর সারথ্য স্বীকার করেছেন সেই অর্জ্জুন নিশ্চয় জয়ী হবেন। আপনি যে আদেশ করলেন আমি তা পালন করব।

অর্জুন শিবমন্ত্র জপ করতে করতে নিদ্রিত হলেন। তিনি স্বপ্ন দেখলেন, কৃষ্ণ তাঁর কাছে এসে বলছেন, তোমার বিষাদের কারণ কি তা বল। অর্জুন উত্তর দিলেন, আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যে কাল সূর্যাস্তের পূর্বে জয়দ্রথকে বধ করব, কিন্তু কৌরবপক্ষের মহারথগণ এবং বিশাল সেনা তাঁকে বেষ্টন ক'রে থাকবে। কি ক'রে তাঁকে আমি দেখতে পাব? এখন সূর্যাস্তও শীঘ্র হয়। কেশব, আমার প্রতিজ্ঞারক্ষা হবে না, আমি জীবিত থাকতেও পারব না।

কৃষ্ণ বললেন, যদি পাশুপত অস্ত্র তোমার জানা থাকে তবে তুমি কাল জয়দ্রথকে বধ করতে পারবে। যদি জানা না থাকে তবে মনে মনে ভগবান বৃষধ্বজের ধ্যান ও মন্ত্রজপ কর। অর্জুন আচমন ক'রে ভূমিতে ব'সে একাগ্রমনে ধ্যান করতে লাগলেন। ব্রাহ্মমুহূর্তে তিনি দেখলেন, কৃষ্ণ তাঁর দক্ষিণ হস্ত ধ'রে আছেন, তাঁরা আকাশমার্গে বায়ুবেগে গিয়ে হিমালয় অতিক্রম ক'রে মহামন্দর পর্বতে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে শূলপাণি জটাধারী গৌরবর্ণ মহাদেব, পার্বতী ও প্রমথগণ রয়েছেন, গীত বাদ্য নৃত্য হচ্ছে, ব্রহ্মবাদী মুনিগণ স্তব করছেন। কৃষ্ণ ও অর্জুন ভূমিতে মস্তক স্পর্শ ক'রে সনাতন ব্রহ্ম স্বরূপ মহাদেবকে প্রণাম করলেন, মহাদেব সহাস্যে স্বাগত জানালে কৃষ্ণার্জুন কৃতাঞ্জলি হয়ে স্তব করলেন। অর্জুন দেখলেন, তিনি যে পূজা করেছিলেন তার উপহার মহাদেবের নিকট এসেছে। মহাদেবের কৃপায় অর্জুন পাশুপত অস্ত্রের প্রয়োগ শিক্ষা করলেন। তার পর কৃষ্ণার্জুন মহাদেবকে বন্দনা ক'রে শিবিরে ফিরে এলেন।

রাত্রি প্রভাত হ'লে বৈতালিকদের স্তব ও গীতবাদ্যের ধ্বনিতে যুধিষ্ঠিরের নিদ্রাভঙ্গ হ'ল। সুশিক্ষিত পরিচারকগণ কষায় দ্রব্যে গাত্রমার্জন ক'রে মন্ত্রপূত চন্দনাদিযুক্ত জলে তাঁকে স্নান করিয়ে দিলে। জলশোষণের জন্য যুধিষ্ঠির একটি শিথিল উষ্ণীষ পরলেন এবং মাল্য ও কোমল বস্ত্র ধারণ ক'রে যথাবিধি হোম করলেন। তার পর মহার্ঘ অলঙ্কারে ভূষিত হয়ে কৃষ্ণ বিরাট দ্রুপদ সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্ন ভীম প্রভৃতির সঙ্গে মিলিত হলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, জনার্দন, তুমি সকল আপদ থেকে আমাদের রক্ষা কর, পাণ্ডবগণ অগাধ কুরুসাগরে নিমগ্ন হচ্ছে, তুমি তাদের ত্রাণ কর। শঙ্খচক্রগদাধর দেবেশ পুরুষোত্তম, অর্জুনের প্রতিজ্ঞা সত্য কর। কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, অর্জুনের তুল্য ধনুর্ধর ত্রিলোকে নেই, সমস্ত দেবতা যদি জয়দ্রথের রক্ষক হন তথাপি অর্জুন আজ তাঁকে বধ করবেন।

এমন সময়ে অর্জুন এসে বললেন, মহারাজ, কেশবের অনুগ্রহে আমি এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি। অর্জুনের মহাদেবদর্শনের বৃত্তান্ত শুনে সকলে ভূতলে মস্তক রেখে প্রণত হয়ে সাধু সাধু বলতে লাগলেন। তার পর অর্জুন বললেন, সাত্যকি, শুভলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি, আজ আমি নিশ্চয় জয়ী হব। আজ কৃষ্ণ আর আমি তোমাদের কাছে থাকব না, তুমি সর্বপ্রযত্নে রাজা যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা কর!