দ্রোণপর্ব: ১২। জয়দ্রথের অভিমুখে কৃষ্ণার্জ্জুন

(চতুৰ্দশ দিনের যুদ্ধ)

প্রভাতকালে দ্রোণ জয়দ্রথকে বললেন, তুমি আমার পশ্চাতে দু ক্রোশ দূরে সসৈন্যে থাকবে, ভূরিশ্রবা কর্ণ অশ্বত্থামা শল্য বৃষসেন ও কৃপ তোমাদের রক্ষা করবেন। দ্রোণ চক্রশকট ব্যূহ রচনা করলেন। এই ব্যূহের পশ্চাতে পদ্ম নামক এক গর্ভব্যূহ এবং তার মধ্যে এক সূচীব্যূহ নির্মিত হ'ল। কৃতবর্মা সূচীব্যূহের সম্মুখে এবং বিশাল সৈন্যে পরিবেষ্টিত জয়দ্রথ এক পার্শ্বে রইলেন। দ্রোণাচার্য চক্রশকট ব্যূহের মুখে রইলেন।

পাণ্ডবসৈন্য ব্যূহবদ্ধ হলে অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, দুর্যোধন-ভ্রাতা দুর্মর্ষণ যেখানে রয়েছে সেখানে রথ নিয়ে চল, আমি এই গজসৈন্য ভেদ ক'রে শত্রু-বাহিনীতে প্রবেশ করব। অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে দুর্মর্ষণ পরাজিত হচ্ছেন দেখে দুঃশাসন সসৈন্যে অর্জুনকে বেষ্টন করলেন, কিন্তু তাঁর শরবর্ষণে নিপীড়িত ও ত্রস্ত হয়ে শকটব্যূহের মধ্যে দ্রোণের নিকট আশ্রয় নিলেন। অর্জুন দুঃশাসনের সৈন্য ধ্বংস ক'রে দ্রোণের কাছে এলেন এবং কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, ভগবান, আমাকে আশীর্বাদ করুন, আপনার অনুগ্রহে আমি এই দুর্ভেদ্য বাহিনীতে প্রবেশ করতে ইচ্ছা করি। আপনি আমার পিতৃতুল্য, ধর্মরাজ ও কৃষ্ণের ন্যায় মাননীয়, অশ্বত্থামার তুল্যই আমি আপনার রক্ষণীয়। আপনি আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করুন। ঈষৎ হাস্য করে দ্রোণ বললেন, অর্জুন, আমাকে জয় না ক'রে জয়দ্রথকে জয় করতে পারবে না।

দ্রোণের সঙ্গে অর্জুনের তুমুল যুদ্ধ হল। কিছু কাল পরে কৃষ্ণ বললেন, অর্জুন, বৃথা কালক্ষেপ করো না, এখন দ্রোণকে ছাড়। অর্জুন চলে যাচ্ছেন দেখে দ্রোণ সহাস্যে বললেন, পাণ্ডুপুত্র, কোথায় যাচ্ছ? শত্রুজয় না ক'রে তুমি তো যুদ্ধে বিরত হও না। অর্জুন বললেন, আপনি আমার গুরু, শত্রু নন; আপনাকে পরাজিত করতে পারে এমন ধনুর্দ্ধর কেউ নেই।

অর্জুন রথের দিকে সত্বর চললেন, পাঞ্চালবীর যুধামন্যু ও উত্তমৌজা তাঁর রক্ষক হয়ে সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। কৃতবর্মা ও কাম্বোজদেশীয় শ্রুতায়ু অর্জুনকে বাধা দিতে লাগলেন। বরুণদত্ত রাজা শ্রুতায়ুধ কৃষ্ণকে গদাঘাত করলেন, কিন্তু সেই গদা ফিরে এসে শ্রুতায়ুধকেই বধ করলে। অর্জুনের শরাঘাতে কাম্বোজরাজপুত্র সুদক্ষিণ, শ্রুতায়ু ও অচ্যুতায়ু নিহত হলেন। তার পর বহু সহস্র যবন পারদ শক দরদ পহ্লব প্রভৃতি সৈন্য অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এল। এইসকল মুণ্ডিতমস্তক, অর্দ্ধমুণ্ডিতমস্তক, শ্মশ্রুধারী, অপবিত্র, কুটিলানন ম্লেচ্ছ সৈন্য অর্জুনের বাণে নিপীড়িত হয়ে পালিয়ে গেল।

কৌরবসৈন্য ভঙ্গ হচ্ছে দেখে দুর্যোধন দ্রোণকে বললেন, আচার্য্য, অর্জুন আপনার সৈন্য ভেদ করায় জয়দ্রথের রক্ষকগণ সংশয়াপন্ন হয়েছেন, তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে জীবিত অবস্থায় অর্জুন আপনাকে অতিক্রম করতে পারবেন না। আমি জানি আপনি পাণ্ডবদের হিতেই রত আছেন। আমি আপনাকে উত্তম বৃত্তি দিয়ে থাকি, যথাশক্তি তুষ্ট রাখি, কিন্তু আপনি তা মনে রাখেন না। আমাদের আশ্রয়ে থেকেই আপনি আমাদের অপ্রিয় কর্ম করছেন, আপনি যে মধুলিপ্ত ক্ষুরের তুল্য তা আমি বুঝতে পারি নি। আমি বুদ্ধিহীন, তাই জয়দ্রথ যখন চলে যেতে চেয়েছিলেন তখন আপনার ভরসায় তাঁকে বারণ করেছিলাম। আমি আর্ত হয়ে প্রলাপ বকছি, ক্রুদ্ধ হবেন না, জয়দ্রথকে রক্ষা করুন।

দ্রোণ বললেন, রাজা, তুমি আমার কাছে অশ্বত্থামার সমান। আমি সত্য বলছি শোন। কৃষ্ণ সারথিশ্রেষ্ঠ, তাঁর অশ্বসকল শীঘ্রগামী, অল্প ফাঁক পেলেও তা দিয়ে অর্জুন লঙঘি যেতে পারেন। তুমি কি দেখতে পাও না অর্জুনের বাণ অর্জুনের রথের এক ক্রোশ পিছনে পড়ে? আমার বয়স হয়েছে, শীঘ্র যেতে পারি না। আমি বলেছি যে যুধিষ্ঠিরকে ধরব, এখন তাঁকে ছেড়ে আমি অর্জুনের কাছে যেতে পারি না। অর্জুন আর তুমি একই বংশে জন্মেছ, তুমি বীর কৃতী ও দক্ষ, তুমিই শত্রুতার সৃষ্টি করেছ। ভয় পেয়ো না, তুমি নিজেই অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ কর।

দুর্যোধন বললেন, আচার্য্য, আপনাকে যে অতিক্রম করেছে সেই অর্জুনের সঙ্গে আমি কি করে যুদ্ধ করব? দ্রোণ বললেন, তোমার দেহে আমি এই কাঞ্চনময় কবচ বেঁধে দিচ্ছি, কৃষ্ণ অর্জুন বা অন্য কোনও যোদ্ধা এই কবচ ভেদ করতে পারবেন না। বৃত্রবধের পূর্বে মহাদেব এই কবচ ইন্দ্রকে দিয়েছিলেন। ইন্দ্রের কাছ থেকে যথাক্রমে অঙ্গিরা, তৎপর বৃহস্পতি, অগ্নিবেশ্য ঋষি এবং পরিশেষে আমি এই কবচ পেয়েছি। কবচ ধারণ ক’রে দুর্যোধন অর্জুনের অভিমুখে গেলেন। পাণ্ডবগণ তিন ভাগে বিভক্ত কৌরবসৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন।

সূর্য যখন অস্তাচলের অভিমুখী হলেন কৃষ্ণার্জুন তখনও জয়দ্রথের দিকে যাচ্ছিলেন। অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ অর্জুনকে বাধা দিতে এসে নিহত হলেন। অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, আমার অশ্বসকল বাণে আহত ও ক্লান্ত হয়েছে, জয়দ্রথও দূরে রয়েছে। তুমি অশ্বদের শুশ্রূষা কর, আমি শত্রুসৈন্য নিবারণ করব। এই বলে অর্জুন রথ থেকে নামলেন এবং অস্ত্রাঘাতে ভূমি ভেদ ক’রে জলাশয় সৃষ্টি করলেন। সহাস্যে সাধু সাধু ব’লে কৃষ্ণ অশ্বদের পরিচর্যা ক’রে এবং জল খাইয়ে সচ্ছন্দ করলেন, তার পর পুনর্বার বেগে রথ চালালেন। অর্জুন কৌরবসৈন্য আলোড়ন করতে করতে অগ্রসর হলেন এবং কিছু দূর গিয়ে জয়দ্রথকে দেখতে পেলেন।

দ্রোণের সৈন্য অতিক্রম ক’রে অর্জুন জয়দ্রথের অভিমুখী যাচ্ছেন দেখে দুর্যোধন সবেগে এসে অর্জুনের রথের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণ বললেন, ধনঞ্জয়, ভাগ্যক্রমে দুর্যোধন তোমার বাণের পথে এসে পড়েছেন, এখন ওঁকে বধ কর। অর্জুন ও দুর্যোধন পরস্পরের প্রতি শরাঘাত করতে লাগলেন। অর্জুনের বাণ নিষ্ফল হচ্ছে দেখে কৃষ্ণ বললেন, জলে পাথর ভাসার ন্যায় অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার দেখছি, তোমার বাণে দুর্যোধনের কিছুই হচ্ছে না। তোমার গাণ্ডীবের শক্তি ও বাহুবল ঠিক আছে তো? অর্জুন বললেন, আমার মনে হয় দুর্যোধনের দেহে দ্রোণ অভেদ্য কবচ বেঁধে দিয়েছেন, এর বন্ধনরীতি আমিও ইন্দ্রের কাছ থেকে শিখেছি। কিন্তু দুর্যোধন স্ত্রীলোকের ন্যায় এই কবচ বৃথা ধারণ ক’রে আছে, কবচ থাকলেও ওকে আমি পরাজিত করব। অর্জুন শরাঘাতে দুর্যোধনের ধনু ও হস্তাবরণ ছিন্ন করলেন এবং অশ্ব ও সারথি বিনষ্ট করলেন। দুর্যোধনকে মহাবিপদে পতিত দেখে ভূরিশ্রবা কর্ণ কৃপ শল্য প্রভৃতি সসৈন্যে এসে অর্জুনকে বেষ্টন করলেন। পাণ্ডবগণকে ডাকবার জন্য অর্জুন বার বার তাঁর ধনুতে টংকার দিলেন, কৃষ্ণও পাঞ্চজন্য বাজালেন।

এই সময়ে দ্রোণের নিকটস্থ কৌরবযোদ্ধাদের সঙ্গে পাণ্ডবপক্ষীয় যোদ্ধাদের ঘোর যুদ্ধ হচ্ছিল। ঘটোৎকচ অলম্বুষ রাক্ষসকে বধ করলেন। পাণ্ডব ও পাণ্ডবগণ ড্রোণের শরাঘাতে নিপীড়িত হ’তে লাগলেন। সহসা পাঞ্চজন্যের ধ্বনি ও কৌরবগণের সিংহনাদ শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, নিশ্চয় অর্জুন বিপদে পড়েছেন। সাত্যকি, তোমার চেয়ে সুহৃত্তম কেউ নেই, তুমি সত্বর গিয়ে অর্জুনকে রক্ষা কর, শত্রুসৈন্য তাঁকে বেষ্টন করেছে।

সাত্যকি বললেন, মহারাজ, আপনার আদেশ পালনে আমি সর্বদা প্রস্তুত, কিন্তু অর্জুন আমার উপরে আপনার রক্ষার ভার দিয়ে গেছেন, আমি চ’লে গেলে ড্রোণ আপনাকে অনায়াসে বন্দী করবেন। যদি কৃষ্ণনন্দন প্রদ্যুম্ন এখানে থাকতেন তবে তাঁকে আপনার রক্ষার ভার দিয়ে আমি যেতে পারতাম। অর্জুনের জন্য আপনি ভয় পাবেন না, কর্ণ প্রভৃতি মহারথের বিক্রম অর্জুনের ষোল ভাগের এক ভাগও নয়। যুধিষ্ঠির বললেন, অর্জুনের কাছে তোমার যাওয়াই আমি উচিত মনে করি। ভীমসেন আমাকে রক্ষা করবেন, তা ছাড়া ঘটোৎকচ বিরাট দ্রুপদ শিখণ্ডী নকুল সহদেব এবং ধৃষ্টদ্যুম্নও এখানে আছেন।

যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে সাত্যকি ভীমকে বললেন, রাজা যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা ক’রো, এই তোমার প্রধান কর্তব্য। পাপী জয়দ্রথ নিহত হ’লে আমি ফিরে এসে ধর্মরাজকে আলিঙ্গন করব। সাত্যকি কুরুসৈন্য বিদারণ ক’রে অগ্রসর হলেন। দ্রোণ তাঁকে নিবারণ করবার চেষ্টা ক’রে বললেন, তোমার গুরু অর্জুন কাপুরুষের ন্যায় যুদ্ধে বিরত হয়ে আমাকে প্রদক্ষিণ ক’রে চ’লে গেছেন। তুমিও যদি সত্বর চ’লে না যাও তবে আমার কাছে নিস্তার পাবে না। সাত্যকি বললেন, ভগবান, আমি ধর্মরাজের আদেশে আমার গুরু অর্জুনের কাছে যাচ্ছি, আপনার মঙ্গল হ’ক, আমি আর বিলম্ব করব না। এই বলে সাত্যকি দ্রোণকে প্রদক্ষিণ ক’রে বেগে অগ্রসর হলেন। তাঁকে বাধা দেবার জন্য দ্রোণ ও কৌরবপক্ষীয় অন্যান্য বীরগণ ঘোর যুদ্ধ করতে লাগলেন। সাত্যকির শরাঘাতে রাজা জলসন্ধ ও সুদর্শন নিহত হলেন। দ্রোণের সারথি নিপাতিত হ’ল, তাঁর অশ্বসকল উদভ্রান্ত হয়ে রথ নিয়ে ঘুরতে লাগল। তখন কৌরববীরগণ সাত্যকিকে ত্যাগ ক’রে দ্রোণকে রক্ষা করলেন, দ্রোণ বিকৃতদেহে তাঁর ব্যূহদ্বারে ফিরে গেলেন।

দুর্যোধনের যবন সৈন্য সাত্যকির সঙ্গে যুদ্ধ করতে এল। তাদের লৌহ ও কাংস্য-নির্মিত বর্ম এবং দেহ ভেদ ক’রে সাত্যকির বাণসকল ভূমিতে প্রবেশ করতে লাগল। যবন কাম্বোজ কিরাত ও বর্বর সৈন্যের মৃতদেহে রণভূমি আচ্ছন্ন হ’ল। পর্বতবাসী পাষাণযোদ্ধারা সাত্যকির উপর শিলাবর্ষণ করতে এল, কিন্তু শরাঘাতে ছিন্নবাহু হয়ে ভূমিতে পড়ে গেল।

সাতাকির পরাক্রমে ভীত হয়ে অন্যান্য যোদ্ধাদের সঙ্গে দুঃশাসন দ্রোণের কাছে চ’লে এলেন। দ্রোণ বললেন, দুঃশাসন, তোমাদের রথসকল দ্রুতবেগে চ’লে আসছে কেন? জয়দ্রথ জীবিত আছেন তো? রাজপুত্র ও মহাবীর হয়ে তুমি রণস্থল ত্যাগ করলে কেন? তুমি দ্যুতসভায় দ্রৌপদীকে বলেছিলে যে পাণ্ডবগণ ষণ্ডতিল(১) তুল্য, তবে এখন পালিয়ে এলে কেন? তোমার অভিমান দর্প আর বীরগর্জন কোথায় গেল? দ্রোণের ভর্ৎসনা শুনে দুঃশাসন আবার সাত্যকির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলেন কিন্তু পরাজিত হয়ে প্রস্থান করলেন।

(১) যে তিলের অঙ্কুর হয় না, অর্থাৎ নপুংসক।

অপরাহ্ণকালে পক্ককেশ শ্যামবর্ণ দ্রোণ আবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। তিনি পঁচাশি বৎসরের বৃদ্ধ হ’লেও ষোল বৎসরের যুবকের ন্যায় বিচরণ করতে লাগলেন। তাঁর শরাঘাতে কেকয়রাজগণের জ্যেষ্ঠ বৃহৎক্ষত্র, শিশুপালপুত্র ধৃষ্টকেতু, এবং ধৃষ্টদ্যুম্নের পুত্র ক্ষত্রধর্মা নিহত হলেন।