দ্রোণপর্ব: ১৮। ঘটোৎকচবধ
(চতুর্দশ দিনের আরও যুদ্ধ)
ঘটোৎকচের দেহ বিশাল, চক্ষু লোহিত, শ্মশ্রু পিঙ্গল, মুখ আকর্ণ-বিস্তৃত, দন্ত করাল, অঙ্গ নীলবর্ণ, মস্তক বৃহৎ, তার উপরে বিকট কেশচূড়া। তাঁর দেহে কাংস্যনির্ম্মিত উজ্জ্বল বর্ম্ম, মস্তকে শুভ্র কিরীট, কর্ণে অগ্নিবর্ণ কুণ্ডল। তাঁর বৃহৎ রথ ভল্লূকচর্ম্মে আচ্ছাদিত এবং শত অশ্বে বাহিত। সেই রথের আকাশস্পর্শী ধ্বজের উপর এক ভীষণ মাংসাশী গৃধ্র বসে আছে।
কর্ণ ও ঘটোৎকচ শরক্ষেপণ করতে করতে পরস্পরের দিকে ধাবিত হলেন। কিছুক্ষণ পরে ঘটোৎকচ মায়াযুদ্ধ আরম্ভ করলেন। ঘোরদর্শন রাক্ষস সৈন্য আবির্ভূত হয়ে শিলা লৌহচক্র তোমর শূল শতঘ্নী পট্টিশ প্রভৃতি বর্ষণ করতে লাগল, কৌরব যোদ্ধারা ভীত হয়ে পশ্চাৎপদ হলেন, কেবল কর্ণ অবিচলিত থেকে বাণবর্ষণ করতে লাগলেন। শরাবিদ্ধ হয়ে ঘটোৎকচের দেহ শজারুর ন্যায় কণ্টকিত হল। একবার দৃশ্য হয়ে, আবার অদৃশ্য হয়ে, কখনও আকাশে উঠে, কখনও ভূমি বিদীর্ণ করে ঘটোৎকচ যুদ্ধ করতে লাগলেন। সহসা তিনি নিজেকে বহু রূপে বিভক্ত করলেন, সিংহ ব্যাঘ্র তরক্ষু সর্প, তীক্ষ্ণচঞ্চু পক্ষী, রাক্ষস পিশাচ কুকুর বৃক প্রভৃতি আবির্ভূত হয়ে কর্ণকে ভক্ষণ করতে গেল। শরাঘাতে কর্ণ তাদের একে একে বধ করলেন।
অলায়ুধ নামে এক রাক্ষস দুর্যোধনের কাছে এসে বললে, মহারাজ, হিড়িম্ব বক ও কির্ম্মীর আমার বন্ধু ছিলেন, ভীম তাঁদের বধ করেছে, কন্যা হিড়িম্বাকে ধর্ষণ করেছে। আমি আজ কৃষ্ণ ও পাণ্ডবগণকে সসৈন্যে হত্যা ক’রে ভক্ষণ করব। দুর্যোধনের অনুমতি পেয়ে অলায়ুধ ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেল। ঘটোৎকচ তার মুণ্ড কেটে দুর্যোধনের দিকে নিক্ষেপ করলেন। তাঁর মায়াসৃষ্ট রাক্ষসগণ অগণিত সৈন্য বধ করতে লাগল। কুরুবীরগণ রণে ভঙ্গ দিয়ে বললেন, কৌরবগণ, পালাও, ইন্দ্রাদি দেবতারা পাণ্ডবদের জন্য আমাদের বধ করছেন।
চক্রবৎ একটি শতঘ্নী নিক্ষেপ করে ঘটোৎকচ কর্ণের চার অশ্ব বধ করলেন। কৌরবগণ সকলে কর্ণকে বললেন, তুমি শীঘ্রই শক্তি অস্ত্রে এই রাক্ষসকে বধ কর, নতুবা আমরা সসৈন্যে বিনষ্ট হব। কর্ণ দেখলেন, ঘটোৎকচ সৈন্যসংহার করছেন, কৌরবগণ ত্রস্ত হয়ে আর্ত্তনাদ করছেন। তখন তিনি ইন্দ্রপ্রদত্ত বৈজয়ন্তী শক্তি নিলেন। অর্জুনকে বধ করবার জন্য কর্ণ বহু বৎসর এই অস্ত্র সযত্নে রেখেছিলেন। এখন তিনি কৃতান্তের জিহ্বার ন্যায় লেলিহান, উল্কার ন্যায় দীপ্যমান, মৃত্যুর ভগিনীর ন্যায় ভীষণ সেই শক্তি ঘটোৎকচের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। ঘটোৎকচ ভীত হয়ে নিজের দেহ বিন্ধ্য পর্বতের ন্যায় বৃহৎ ক'রে বেগে পিছনে স'রে গেলেন। কর্ণের হস্তনিক্ষিপ্ত শক্তি ঘটোৎকচের সমস্ত মায়া ভস্ম ক'রে এবং তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ ক'রে আকাশে নক্ষত্রগণের মধ্যে চলে গেল। মরণকালে ঘটোৎকচ আর এক আশ্চর্য কার্য করলেন। তিনি পর্বত ও মেঘের ন্যায় বিশাল দেহ ধারণ ক'রে আকাশ থেকে পতিত হলেন; তাঁর প্রাণহীন দেহের ভারে কৌরববাহিনীর এক অংশ নিষ্পেষিত হ'ল।
কৌরবগণ হৃষ্ট হয়ে সিংহনাদ ও বাদ্যধ্বনি করতে লাগলেন, কর্ণ বৃত্রহন্তা ইন্দ্রের ন্যায় পূজিত হলেন।
ঘটোৎকচের মৃত্যুতে পাণ্ডবগণ শোকে অশ্রুমোচন করতে লাগলেন, কিন্তু কৃষ্ণ হৃষ্ট হয়ে সিংহনাদ ক'রে অর্জুনকে আলিঙ্গন করলেন। তিনি অশ্বের রশ্মি সংযত ক'রে রথের উপর নৃত্য করতে লাগলেন এবং বার বার তাল ঠুকে গর্জন করলেন। অর্জুন অপ্রীত হয়ে বললেন, মধুসূদন, আমরা শোকগ্রস্ত হয়েছি, তুমি অসময়ে হর্ষপ্রকাশ করছ। তোমার এই অধীরতার কারণ কি?
কৃষ্ণ বললেন, আজ কর্ণ ঘটোৎকচের উপর শক্তি নিক্ষেপ করেছেন, তার ফলে তিনি নিজেই যুদ্ধে নিহত হবেন। ভাগ্যক্রমে কর্ণের অক্ষয় কবচ আর কুণ্ডল দূর হয়েছে, ভাগ্যক্রমে ইন্দ্রদত্ত অমোঘ শক্তিও ঘটোৎকচকে মেরে অপসৃত হয়েছে। অর্জুন, তোমার হিতের জন্যই আমি জরাসন্ধ শিশুপাল আর একলব্যকে একে একে নিহত করিয়েছি, হিড়িম্ব কির্মীর বক অলায়ুধ এবং উগ্রকর্মা ঘটোৎকচকেও নিপাতিত করিয়েছি। অর্জুন বললেন, আমার হিতের জন্য কেন? কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, জরাসন্ধ শিশুপাল আর একলব্য না মরলে এখন ভয়ের কারণ হতেন, দুর্যোধন নিশ্চয় তাঁদের বরণ করতেন এবং তাঁরাও এই যুদ্ধে কুরুপক্ষে যেতেন। নরশ্রেষ্ঠ, তোমার সহায়তায় দেবদ্বেষীদের বিনাশ এবং জগতের হিতসাধনের জন্য আমি জন্মেছি। হিড়িম্ব বক আর কির্মীরকে ভীমসেন মেরেছেন, ঘটোৎকচ অলায়ুধকে মেরেছে, কর্ণ ঘটোৎকচের উপর শক্তি নিক্ষেপ করেছেন। কর্ণ যদি বধ না করতেন তবে আমিই ঘটোৎকচকে বধ করতাম, কিন্তু তোমাদের প্রীতির জন্য তা করি নি। এই রাক্ষস ব্রাহ্মণদ্বেষী যজ্ঞদ্বেষী ধর্মনাশক পাপাত্মা, সেজন্যই কৌশলে তাকে নিপাতিত করিয়েছি, ইন্দ্রের শক্তিও বারিত করিয়েছি। আমিই কর্ণকে বিমোহিত ক’রেছিলাম, তাই তিনি তোমার জন্য রক্ষিত শক্তি ঘটোৎকচের উপর নিক্ষেপ করেছেন।
ঘটোৎকচের মৃত্যুতে যুধিষ্ঠির কাতর হয়েছেন দেখে কৃষ্ণ বললেন, ভরতশ্রেষ্ঠ, আপনি শোক করবেন না, এরূপ বিহ্বলতা আপনার যোগ্য নয়। আপনি উঠুন, ধৈর্য ধরুন, গুরুভার বহন করুন। আপনি শোকাকুল হ’লে আমাদের জয়লাভ সংশয়ের বিষয় হবে। যুধিষ্ঠির হাত দিয়ে চোখ মুছে বললেন, মহাবাহু, যে লোক উপকার মনে রাখে না তার ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়। আমাদের বনবাসকালে ঘটোৎকচ বালক হ’লেও বহু সাহায্য করেছিল। অর্জুনের অনুপস্থিতিকালে সে কাম্যক বনে আমাদের কাছে ছিল, যখন আমরা গন্ধমাদন পর্বতে যাই তখন তার সাহায্যেই আমরা অনেক দুর্গম স্থান পার হ’তে পেরেছিলাম, পরিভ্রান্তা পাঞ্চালীকেও সে পৃষ্ঠে বহন করেছিল। এই যুদ্ধে সে আমার জন্য বহু দুঃসাধ্য কর্ম করেছে। সে আমার ভক্ত ও প্রিয় ছিল, তার জন্য আমি শোকার্ত হয়েছি। জনার্দন, তুমি ও আমরা জীবিত থাকতে এবং অর্জুনের সমক্ষে ঘটোৎকচ কেন কর্ণের হাতে নিহত হ’ল? অর্জুন অল্প কারণে জয়দ্রথকে বধ করেছেন, তাতে আমি বিশেষ প্রীত হই নি। যদি শত্রুবধ করাই ন্যায্য হয় তবে আগে দ্রোণ ও কর্ণকেই বধ করা উচিত, এরাই আমাদের দুঃখের মূলে। যেখানে দ্রোণ আর কর্ণকে মারা উচিত সেখানে অর্জুন জয়দ্রথকে মেরেছেন। মহাবাহু, ভীমসেন এখন দ্রোণের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, আমি নিজেই কর্ণকে বধ করতে যাব।
যুধিষ্ঠির বেগে কর্ণের দিকে যাচ্ছিলেন এমন সময় ব্যাসদেব এসে তাঁকে বললেন, যুধিষ্ঠির, ভাগ্যক্রমে অর্জুন কর্ণের সঙ্গে দ্বৈরথ যুদ্ধ করেন নি তাই তিনি ইন্দ্রদত্ত শক্তির প্রহার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ঘটোৎকচ নিহত হওয়ায় অর্জুন রক্ষা পেয়েছেন। বৎস, ঘটোৎকচের জন্য শোক করো না, তুমি ভ্রাতাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধ কর। আর পাঁচ দিন পরে তুমি পৃথিবীর অধিপতি হবে। তুমি সর্বদা ধর্মের চিন্তা কর, যেখানে ধর্ম সেখানেই জয় হয়। এই বলে ব্যাস অন্তর্হিত হলেন।