কর্ণপর্ব: ৪। পাণ্ডবরাজবধ — দুঃশাসনের পরাজয়
(ষোড়শ দিনের আরম্ভ যুদ্ধ)
লোকবিশ্রুত বীরশ্রেষ্ঠ পাণ্ড্যরাজ পাণ্ডবপক্ষে যুদ্ধ করছিলেন। ইনি ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ অর্জুন কৃষ্ণ প্রভৃতি মহারথগণকে নিজের সমকক্ষ মনে করতেন না, ভীষ্ম-দ্রোণের সঙ্গে নিজের তুলনাও সইতে পারতেন না। এই মহাধনুষ্ক শস্ত্রাস্ত্র- বিশারদ পাণ্ড্য পাশহস্ত কৃতান্তের ন্যায় কর্ণের সেনা বধ করছিলেন। অশ্বত্থামা তাঁর কাছে গিয়ে মিষ্টবাক্যে সহাস্যে যুদ্ধে আহ্বান করলেন। দুজনে তুমুল যুদ্ধ হ'ল। আট গরুতে টানে এমন আটখানা গাড়িতে যত অস্ত্র ধরে, অশ্বত্থামা তা চার দণ্ডের মধ্যে নিক্ষেপ করলেন। দ্রোণপুত্রের সেই বাণবর্ষণ বায়ুবেগে নিবারিত ক'রে পাণ্ড্যরাজ আনন্দ গর্জন করতে লাগলেন। অশ্বত্থামা পাণ্ড্যর রথ অশ্ব সারথি এবং সমস্ত অস্ত্র বিনষ্ট করলেন, কিন্তু শত্রুকে আয়ত্তিতে পেয়েও বধ করলেন না। এই সময়ে একটি চালকহীন সুসজ্জিত বলশালী হস্তী সমীপ দিয়ে পাণ্ড্যরাজের কাছে এসে পড়ল। সিংহ যেমন পর্বতশৃঙ্গে ওঠে, গজযূথপ পাণ্ড্য সেইরূপ সেই মহাগজের পৃষ্ঠে চড়ে বসলেন এবং সিংহনাদ করে অশ্বত্থামার প্রতি একটি তোমর নিক্ষেপ করলেন। তোমরের আঘাতে অশ্বত্থামার মণিমুক্তাভূষিত কিরীট বিদীর্ণ হয়ে ভূপাতিত হ'ল। তখন অশ্বত্থামা পদাহত সর্পের ন্যায় ক্রুদ্ধ হয়ে শরাঘাতে হস্তীর পদ ও শুঁড় এবং পাণ্ড্যরাজের বাহু ও মস্তক ছেদন করলেন, পাণ্ড্যের ছয় অনুচরকেও বধ করলেন।
পাণ্ডবরাজ নিহত হ'লে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, আমি যুধিষ্ঠির ও অন্যান্য পাণ্ডবদের দেখছি না, ওদিকে কর্ণ প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায় যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন, অশ্বত্থামাও সৃঞ্জয়গণকে বধ করছেন এবং আমাদের হস্তী অশ্ব রথ পদাতি মর্দন করছেন। অর্জুন বললেন, হৃষীকেশ, শীঘ্র রথ চালাও।
কৌরব ও পাণ্ডবগণ যুদ্ধে মিলিত হলেন। প্রাচ্য দাক্ষিণাত্য অঙ্গ বঙ্গ পুণ্ড্র মগধ তাম্রলিপ্ত মেকল কোশল মদ্র দশার্ণ নিষধ ও কলিঙ্গ দেশের গজযুদ্ধ-বিশারদ যোদ্ধারা পাঞ্চালসৈন্যের উপর অস্ত্রবর্ষণ করতে লাগলেন। সাত্যকি নারাচের আঘাতে বঙ্গরাজকে হস্তী থেকে নিপাতিত করলেন। নকুল অর্ধচন্দ্র বাণে অপরাজিতপুত্রের মস্তক ছেদন করলেন। পাণ্ডবগণের বাণবর্ষণে বিপক্ষের বহু হস্তী নিহত হ'ল। সহদেবের শরাঘাতে দুঃশাসন জ্ঞানহীন হয়ে পড়ে গেলেন, তাঁর সারথি অত্যন্ত ভীত হয়ে রথ নিয়ে পালিয়ে গেল।