কর্ণপর্ব: ৫। কর্ণের হস্তে নকুলের পরাজয় — যূথবৎস প্রভৃতির যুদ্ধ

( ষোড়শ দিনের আরও যুদ্ধ )

নকুল কৌরবসেনা মথন করছেন দেখে কর্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে বাধা দিতে এলেন। নকুল সহাস্যে তাঁকে বললেন, বহু দিন পরে দেবতারা আমার উপর সদয় হয়েছেন, তুমি আমার সমক্ষে এসেছ। পাপী, তুমিই সমস্ত অনর্থ শত্রুতা ও কলহের মূল, আজ তোমাকে সমরে বধ ক’রে কৃতার্থ ও বিগতজ্বর হব। কর্ণ বললেন, ওহে বীর, আগে তোমার পৌরুষ দেখাও তার পর গর্ব ক’রো। বৎস, বীরগণ কিছু না ব’লেই যথাশক্তি যুদ্ধ করেন, তুমিও তাই কর, আমি তোমার দর্প চূর্ণ করব। তার পর নকুল ও কর্ণ পরস্পরের প্রতি প্রচণ্ড বাণবর্ষণ করতে লাগলেন। দুই পক্ষের সৈন্য শরাঘাতে নিপীড়িত হয়ে দূরে সরে গিয়ে দর্শকের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। কর্ণের বাণে সমস্ত আকাশ মেঘাবৃতের ন্যায় ছায়াময় হ'ল। কর্ণ নকুলের চার অশ্ব, রথ পতাকা গদা খড়্গ চর্ম প্রভৃতি বিনষ্ট করলেন, নকুল রথ থেকে নেমে একটা পরিঘ নিয়ে দাঁড়ালেন। কর্ণের শরাঘাতে সেই পরিঘও নষ্ট হ'ল, তখন নকুল ব্যাকুল হয়ে পালাতে লাগলেন। কর্ণ বেগে পিছনে গিয়ে তাঁর জ্যা সমেত বৃহৎ ধনু নকুলের গলায় লাগিয়ে সহাস্যে বললেন, তুমি যে মিথ্যা বাক্য বলেছিলে, এখন বার বার আহত হবার পর আবার তা বল দেখি! বৎস, তুমি বলবান কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ ক’রো না, নিজের সমান যোদ্ধাদের সঙ্গেই যুদ্ধ ক’রো; আমার কাছে পরাজয়ের জন্য লজ্জিত হয়ো না। মাদ্রীপুত্র, এখন গৃহে যাও অথবা কৃষ্ণার্জুনের কাছে যাও। বীর ও ধর্মজ্ঞ কর্ণ নকুলকে বধ করতে পারতেন, কিন্তু কুন্তীর অনুরোধ স্মরণ করে মুক্তি দিলেন। দুঃখসন্তপ্ত নকুল কলসে রুদ্ধ সর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে তাঁর রথে উঠলেন। কর্ণ তখন পাঞ্চালসৈন্যদের দিকে গেলেন। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর পাঞ্চালসৈন্য বিধ্বস্ত হল, হতাবশিষ্ট পাঞ্চালবীরগণ বেগে পালাতে লাগলেন, কর্ণও তাঁদের পিছনে ধাবিত হলেন।

বৈশ্যগর্ভজাত ধৃতরাষ্ট্রপুত্র যূযুৎসু পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়েছিলেন (১)। তিনি দুর্যোধনের বিশাল বাহিনী মন্থন করছেন দেখে শকুনিপুত্র উলূক তাঁকে আক্রমণ করলেন। যূযুৎসুর অশ্ব ও সারথি বিনষ্ট হল, তিনি অন্য রথে উঠলেন। বিজয়ী উলূক তখন পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণকে বধ করতে গেলেন।

দুর্যোধনভ্রাতা শ্রুতকর্মা নকুলপুত্র শতানীককে অশ্ব রথ ও সারথি বিনষ্ট করলেন, শতানীক তখন রথে থেকেই একটি গদা নিক্ষেপ করলেন, তার আঘাতে শ্রুতকর্মারও অশ্ব রথ সারথি বিনষ্ট হল। তখন রথহীন দুই বীর পরস্পরকে দেখতে দেখতে রণভূমি থেকে চলে গেলেন।

ভীমের পুত্র শ্রুতসোম শকুনির সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। শকুনির শরাঘাতে শ্রুতসোমের অশ্ব সারথি রথ ও ধনু প্রভৃতি নষ্ট হল, শ্রুতসোম তখন ভূমিতে নেমে যমদণ্ডতুল্য খড়্গ ঘোরাতে লাগলেন। তিনি চতুর্দশ প্রকার মণ্ডলাকারে বেগে বিচরণ ক’রে ভ্রান্ত উদ্ভ্রান্ত আবিদ্ধ আপ্লুত বিপ্লুত সৃত সম্পাত সমদীর্ণ প্রভৃতি গতি দেখালেন। শকুনি তীক্ষ্ণ ক্ষুরপ্রের আঘাতে শ্রুতসোমের খড়্গ দ্বিখণ্ড করলেন, শ্রুতসোম তাঁর হস্তধৃত খড়্গাংশ নিক্ষেপ করে শকুনির ধনু ছেদন করলেন। তারপর শকুনি অন্য ধনু নিয়ে পাণ্ডবসৈন্যের অভিমুখে ধাবিত হলেন।

কৃপাচার্যের সঙ্গে ধৃষ্টদ্যুম্নের যুদ্ধ হচ্ছিল। কৃপের শরাঘাতে আহত ও অবসন্ন হয়ে ধৃষ্টদ্যুম্ন ভীমের কাছে চলে গেলেন, তখন কৃপ শিখণ্ডীকে আক্রমণ করলেন। বহুক্ষণ যুদ্ধের পর শিখণ্ডী শরাঘাতে মূর্ছিত হলেন, তাঁর সারথি রণভূমি থেকে সত্বর রথ সরিয়ে নিয়ে গেল।