কর্ণপর্ব: ৬। পাণ্ডবগণের জয়

(ষোড়শ দিনের যুদ্ধান্ত)

কৌরবসৈন্যের সঙ্গে ত্রিগর্ত শিবি শল্ব সংশপ্তক ও নারায়ণ সৈন্যগণ, এবং ভ্রাতা ও পুত্রগণে বেষ্টিত হয়ে ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা অর্জুনের অভিমুখে চললেন। পতঙ্গ যেমন অগ্নিতে দগ্ধ হয় সেইরূপ শতসহস্র যোদ্ধা অর্জুনের বাণে বিনষ্ট হলেন, তথাপি তাঁরা স'রে গেলেন না। রাজা শল্বের এবং সুশর্মার ভ্রাতা সৌভ্রতি নিহত হলেন। সুশর্মার আর এক ভ্রাতা সত্যসেন তোমরের আঘাতে কৃষ্ণের বাম বাহু বিদ্ধ করলেন, কৃষ্ণের হাত থেকে কশা ও রশ্মি প'ড়ে গেল। অর্জুন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে শাণিত ক্ষুরপ্র আঘাতে সত্যসেনের মস্তক ছেদন এবং শরাঘাতে তাঁর ভ্রাতা চিত্রসেনকে বধ করলেন। তার পর অর্জুন ঐন্দ্রাস্ত্র প্রয়োগ করলেন, তা থেকে বহু সহস্র বাণ নির্গত হয়ে শত্রুবাহিনী ধ্বংস করতে লাগল। কৌরবপক্ষীয় প্রায় সকল সৈন্য যুদ্ধে বিমুখ হয়ে পালিয়ে গেল।

রণভূমির অন্য দিকে যুধিষ্ঠির ও দুর্যোধন পরস্পরের প্রতি বাণবর্ষণ করছিলেন। যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের চার অশ্ব ও সারথি বধ ক'রে তাঁর রথধ্বজ ধনু ও খড়গ ভূপাতিত করলেন। দুর্যোধন বিপন্ন হয়ে রথ থেকে লাফিয়ে নামলেন, তখন কর্ণ অশ্বত্থামা কৃপ প্রভৃতি তাঁকে রক্ষা করতে এলেন, পাণ্ডবগণও যুধিষ্ঠিরের কাছে এসে তাঁকে বেষ্টন করলেন। দুই পক্ষে ভয়ংকর যুদ্ধ হতে লাগল, রণভূমিতে শতসহস্র কবন্ধ উত্থিত হ'ল। কর্ণ পাঞ্চালগণকে, ধনঞ্জয় ত্রিগর্তগণকে, এবং ভীমসেন কুরুসৈন্য ও সমস্ত হস্তিসৈন্য বধ করতে লাগলেন। দুর্যোধন পুনর্বার যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধে রত হলেন এবং দুজনে বৃষের ন্যায় গর্জন ক'রে পরস্পরকে শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করলেন। অবশেষে কলহের অন্ত করবার জন্য দুর্যোধন গদাহস্তে ধাবিত হলেন, যুধিষ্ঠির প্রজ্বলিত উল্কার ন্যায় দীপ্যমান একটি বৃহৎ শক্তি অস্ত্র দুর্যোধনের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। সেই অস্ত্রে দুর্যোধনের মর্মস্থান বিদ্ধ হ'ল, তিনি সহসা মোহগ্রস্ত হয়ে প'ড়ে গেলেন। ভীম নিজের প্রতিজ্ঞা স্মরণ ক'রে বললেন, মহারাজ, দুর্যোধন আপনার বধ্য নয়। তখন যুধিষ্ঠির যুদ্ধে নিবৃত্ত হলেন।

কর্ণের সঙ্গে সাত্যকির যুদ্ধ হচ্ছিল। সায়ংকালে কৃষ্ণাৰ্জুন যথাবিধি আহ্নিককৃত্য ও শিবপূজা ক'রে কৌরবসৈন্যের দিকে এলেন। তখন দুর্যোধন অশ্বত্থামা কৃতবর্মা কর্ণ প্রভৃতির সঙ্গে অর্জুন সাত্যকি ও অন্যান্য পাণ্ডবপক্ষীয় বীরগণের ঘোর যুদ্ধ হ’তে লাগল। অর্জ্জুনের বাণবর্ষণে কৌরবসেনা বিধ্বস্ত হ’ল। কিয়ৎকাল পরে সূর্য্য অস্তাচলে গেলেন, অন্ধকার ও ধূলিতে সমস্তই দৃষ্টির অগোচর হ’ল। রাত্রিযুদ্ধের ভয়ে কৌরবযোদ্ধগণ তাঁদের সেনা অপসারিত করলেন, বিজয়ী পাণ্ডবগণ হৃষ্টমনে শিবিরে ফিরে গেলেন। তার পর রুদ্রের ক্রীড়াভূমি-তুল্য সেই ঘোর রণস্থলে রাক্ষস পিশাচ ও শ্বাপদগণ দলে দলে আসতে লাগল।