কর্ণপর্ব: ১৩। কর্ণের সহিত যুধিষ্ঠির ও ভীমের যুদ্ধ
(সপ্তদশ দিনের যুদ্ধ)
ব্যূহ রচনা ক’রে কর্ণ পাণ্ডুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হলেন। কৃপ ও কৃতবর্মা ব্যূহের দক্ষিণে রইলেন। পিশাচের ন্যায় ভীষণদর্শন দুর্জয় অশ্বারোহী গান্ধার সৈন্য ও পার্বত্য সৈন্য সহ শকুনি ও উলূক তাঁদের পার্শ্ব রক্ষা করতে লাগলেন। চৌত্রিশ হাজার সংশপ্তকের সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ ব্যূহের বামে রইলেন এবং তাঁদের পার্শ্বে কম্বোজ শক ও যবন যোদ্ধারা অবস্থান করলেন। ব্যূহের মধ্য দেশে কর্ণ এবং পশ্চাতে দুঃশাসন রইলেন।
পুরাকালে বেদমন্ত্রে উদ্দীপিত অগ্নি যে রথের অশ্ব হয়েছিলেন, যে রথ ব্রহ্মা ঈশান ইন্দ্র ও বরুণকে পর পর বহন করেছিল, সেই আদিম আশ্চর্য রথে কৃষ্ণার্জুন আসছেন দেখে শল্য বললেন, কর্ণ, শ্বেত অশ্ব যার বাহন এবং কৃষ্ণ যার সারথি সেই রথ আসছে। তুমি যাঁর অনুসন্ধান করছিলে, কর্মবিপাকের ন্যায় দুর্নিবার সেই অর্জুন শত্রুবধ করতে করতে অগ্রসর হচ্ছেন। দেখ, নানাপ্রকার দুর্লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, একটা ঘোরদর্শন মেঘতুল্য কবন্ধ সূর্যমণ্ডল আবৃত্ত ক’রে রয়েছে, বহু সহস্র কঙ্ক ও গৃধ্র সমবেত হয়ে ঘোর রব করছে। অর্জুনের গাণ্ডীব আকৃষ্ট হয়ে কূজন করছে, তাঁর হস্তনিক্ষিপ্ত তীক্ষ্ণ শরজাল শত্রু বিনাশ করছে। নিহত রাজাদের মুণ্ডে রণভূমি আবৃত হয়েছে, আরোহীর সহিত অশ্বগণ মুমূর্ষু হয়ে ভূমিতে শুয়ে পড়ছে, নিহত হস্তীরা পর্বতের ন্যায় পতিত হচ্ছে। রাধেয় কর্ণ, কৃষ্ণ যার সারথি এবং গাণ্ডীব যাঁর ধনু, সেই অর্জুনকে যদি বধ করতে পার তবে তুমিই আমাদের রাজা হবে।
এই সময়ে সংশপ্তকগণের আহ্বানে অর্জুন তাদের সঙ্গে যুদ্ধে রত হলেন। কর্ণ বললেন, শল্য, দেখুন, মেঘ যেমন সূর্যকে আবৃত করে, সংশপ্তকগণ সেইরূপ অর্জুনকে ঘিরে অদৃশ্য ক’রে ফেলেছে। অর্জুন যোদ্ধৃসাগরে নিমগ্ন হয়েছে, এই তার শেষ। শল্য বললেন, জল দ্বারা কে বরুণকে বধ করতে পারে? কাষ্ঠ দ্বারা কে অগ্নি নির্বাপণ করতে পারে? কোন্ লোক বায়ুকে ধরে রাখতে বা মহার্ণব পান করতে পারে? যুদ্ধে অর্জুনের নিগ্রহ আমি সেইরূপই অসম্ভব মনে করি। তবে কথা ব’লে যদি তোমার পরিতোষ হয় তবে তাই বল।
কর্ণ ও শল্য এইরূপ আলাপ করছিলেন এমন সময়ে দুই পক্ষের সেনা গঙ্গাযমুনার ন্যায় মিলিত হ’ল। রুদ্র যেমন পশুসংহার করেন অর্জুন সেইরূপ তাঁর চতুর্দিকের শত্রু বধ করতে লাগলেন। কর্ণের শরাঘাতে বহু পাঞ্চালবীর নিহত হলেন, তাঁদের সৈন্যমধ্যে হাহাকার উঠল। পাণ্ডববাহিনী ভেদ ক’রে কর্ণ বহু রথ হস্তী অশ্ব ও পদাতি নিয়ে যুধিষ্ঠিরের নিকটে এলেন। শিখণ্ডী ও সাতকির সহিত পাণ্ডবগণ যুধিষ্ঠিরকে বেষ্টন করলেন। সাতকি কর্তৃক প্রেরিত হয়ে দ্রাবিড় অন্ধ্র ও নিষাদ দেশীয় পদাতি সৈন্যরা কর্ণকে মারবার জন্য সবেগে এল, কিন্তু শরাহত হয়ে ছিন্ন শালবনের ন্যায় ভূপতিত হ’ল। পাণ্ডব, পাঞ্চাল ও কেকয়গণ কর্তৃক রক্ষিত হয়ে যুধিষ্ঠির কর্ণকে বললেন, সূতপুত্র, তুমি সর্বদাই অর্জুনের সহিত স্পর্দ্ধা কর, দুর্যোধনের মতে চলে সর্বদাই আমাদের শত্রুতা কর। তোমার যত বীর্য আর পাণ্ডবদের উপর যত বিদ্বেষ আছে আজ সে সমস্তই দেখাও। আজ মহাযুদ্ধে তোমার যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা দূর করব। এই ব'লে যুধিষ্ঠির কর্ণকে আক্রমণ করলেন। তাঁর বজ্রতুল্য বাণের প্রহারে কর্ণের বাম পার্শ্ব বিদীর্ণ হ'ল, কর্ণ মূর্ছিত হয়ে রথের মধ্যে পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে সংজ্ঞালাভ ক'রে কর্ণ যুধিষ্ঠিরের চক্ররক্ষক পাঞ্চালবীর চন্দ্রদেব ও দণ্ডধারকে বধ করলেন এবং যুধিষ্ঠিরের বর্ম বিদীর্ণ করলেন। রক্তাক্তদেহে যুধিষ্ঠির এক শক্তি ও চার তোমর নিক্ষেপ করলেন। কর্ণ ভল্লের আঘাতে যুধিষ্ঠিরের রথ নষ্ট করলেন। তখন যুধিষ্ঠির অন্য রথে উঠে যুদ্ধে বিমুখ হয়ে পালাতে লাগলেন। কর্ণ দ্রুতবেগে এসে যুধিষ্ঠিরের স্কন্ধ স্পর্শ ক'রে বললেন, ক্ষত্রিয়বীর প্রাণরক্ষার জন্য কি ক'রে রণস্থল ত্যাগ করতে পারেন? আপনি ক্ষত্রধর্মে পটু নন, বেদাধ্যয়ন আর যজ্ঞ ক'রে ব্রাহ্মণের শক্তিই লাভ করেছেন। কুন্তীপুত্র, আর যুদ্ধ করবেন না, বীরগণের কাছে যাবেন না, তাঁদের অপ্রিয় বাক্যও বলবেন না।
যুধিষ্ঠির লজ্জিত হয়ে স'রে এলেন এবং কর্ণের বিক্রম দেখে নিজ পক্ষের যোদ্ধাদের বললেন, তোমরা নিশ্চেষ্ট হয়ে আছ কেন, শত্রুদের বধ কর। তখন ভীমসেন প্রভৃতি কৌরবসেন্যের প্রতি ধাবিত হলেন। তুমুল যুদ্ধে সহস্র সহস্র হস্তী অশ্ব রথ ও পদাতি বিনষ্ট হ'তে লাগল। অপ্সরারা সম্মুখ সমরে নিহত বীরগণকে বিমানে তুলে স্বর্গে নিয়ে চলল। এই আশ্চর্য ব্যাপার দেখে বীরগণ স্বর্গলাভের ইচ্ছায় ত্বরান্বিত হয়ে পরস্পরকে বধ করতে লাগলেন। ভীম সাত্যকি প্রভৃতি যোদ্ধাদের শরাঘাতে আকুল হয়ে কৌরবসেনা পালাতে লাগল। তখন কর্ণের আদেশে শল্য ভীমের কাছে রথ নিয়ে গেলেন। শল্য বললেন, দেখ, মহাবাহু ভীম কিরূপ ক্রুদ্ধ হয়ে আসছেন, ইনি দীর্ঘকালসঞ্চিত ক্রোধ নিশ্চয় তোমার উপর মুক্ত করবেন। কর্ণ বললেন, মদ্ররাজ, আপনার কথা সত্য, কিন্তু দণ্ডধারী যমের সঙ্গে ভীম কি ক'রে যুদ্ধ করবেন? আমি অর্জুনকে চাই, ভীমসেন পরাস্ত হ'লে অর্জুন নিশ্চয় আমার কাছে আসবেন।
কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর ভীমের শরাঘাতে কর্ণ অচেতন হয়ে রথের মধ্যে ব'সে পড়লেন, শল্য তাঁকে রণস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। তখন ভীমসেন বিশাল কৌরববাহিনী নিপীড়িত করতে লাগলেন, পুরাকালে ইন্দ্র যেমন দানবগণকে করেছিলেন।