কর্ণপর্ব: ১৪। অশ্বত্থামা ও কর্ণের সহিত যুধিষ্ঠির ও অর্জ্জুনের যুদ্ধ

দুর্যোধন তাঁর ভ্রাতাদের বললেন, কর্ণ বিপৎসাগরে পড়েছেন, তোমরা শীঘ্রই গিয়ে তাঁকে রক্ষা কর। তখন ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ সকল দিক থেকে ভীমকে আক্রমণ করলেন। ভীমের ভল্ল ও নারাচের আঘাতে দুর্যোধনের ভ্রাতা বিবিৎসু, বিকট সহ ক্ষুদ্র নন্দ ও উপনন্দ নিহত হলেন। কর্ণ ভীমের ধনু ও রথ বিনষ্ট করলেন, ভীম গদা নিয়ে শত্রুসৈন্য বধ করতে লাগলেন।

এই সময়ে সংশপ্তক কৌশল ও নারায়ণ সৈন্যের সঙ্গে অর্জুনের যুদ্ধ হচ্ছিল। সংশপ্তকগণ অর্জুনের রথ ঘিরে ফেলে তাঁর অশ্ব রথচক্র ও রথদণ্ড ধরে সিংহনাদ করতে লাগল। কয়েকজন কৃষ্ণের দুই বিশাল বাহু ধরলে। দন্ত হাতী যেমন চালককে নিপাতিত করে, কৃষ্ণ সেইরূপ তাঁর বাহুদ্বয় সঞ্চালন ক’রে সংশপ্তকগণকে নিপাতিত করলেন। অর্জুন নাগপাশ অস্ত্র প্রয়োগ করে অন্যান্য সংশপ্তকদের পাদবন্ধন করলেন, তারা সর্পবেষ্টিত হয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে রইল। তখন মহারথ সুশর্মা গরুড় অস্ত্র প্রয়োগ করলেন, সর্পগণ ভয়ে পালিয়ে গেল। অর্জুন ঐন্দ্র অস্ত্র মোচন করলেন, তা থেকে অসংখ্য বাণ নির্গত হয়ে শত্রুসৈন্য সংহার করতে লাগল। সংশপ্তকদের চোদ্দ হাজার পদাতি, দশ হাজার রথী এবং তিন হাজার গজারোহী যোদ্ধা ছিল, তাদের মধ্যে দশ হাজার অর্জুনের শরাঘাতে নিহত হ'ল।

কৌরবসৈন্য অর্জুনের ভয়ে অবসন্ন হয়েছে দেখে কৃতবর্মা রূপ অশ্বত্থামা কর্ণ শকুনি উলূক এবং ভ্রাতাদের সঙ্গে দুর্যোধন তাদের রক্ষা করতে এলেন। শিখণ্ডী ও ধৃষ্টদ্যুম্ন কৃপাচার্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অশ্বত্থামা শরাঘাতে আকাশ আচ্ছন্ন করে পাণ্ডবসৈন্য বধ করছেন দেখে সাত্যকি, যুধিষ্ঠির, প্রতিবিন্ধ্য প্রভৃতি পাঁচ সহোদর এবং অন্যান্য বহু বীর সকল দিক থেকে তাঁকে আক্রমণ করলেন। তিমির আলোড়নে নদীমুখ যেমন হয়, দ্রোণপুত্রের প্রতাপে পাণ্ডবসৈন্য সেইরূপ বিক্ষোভিত হ'ল। যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হয়ে অশ্বত্থামাকে বললেন, পরুষভাষী, তোমার প্রীতি নেই, কৃতজ্ঞতাও নেই, তুমি আমাকেই বধ করতে চাচ্ছ। ব্রাহ্মণের কার্য তপ দান ও অধ্যয়ন; তুমি নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণ তাই ক্ষত্রিয়ের কার্য করছ। অশ্বত্থামা একটু হাসলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের অভিযোগ ন্যায্য ও সত্য জেনে কোনও উত্তর দিলেন না, তাঁকে শরবর্ষণে আচ্ছন্ন করলেন। তখন যুধিষ্ঠির সসত্ত্বরে রণভূমি থেকে চ’লে গেলেন।

দুর্যোধনের সঙ্গে ধৃষ্টদ্যুম্ন ঘোর যুদ্ধ করতে লাগলেন। দুর্যোধনের রথ নষ্ট হওয়ায় তিনি অন্য রথে উঠে চ’লে গেলেন। তখন কর্ণ ধৃষ্টদ্যুম্নকে আক্রমণ করলেন। সিংহ যেমন ভীত মৃগযূথকে করে, কর্ণ সেইরূপ পাঞ্চাল-রক্ষিগণকে বিদ্রাবিত করতে লাগলেন। তখন যুধিষ্ঠির পুনর্ব্বার রণস্থলে এসে শিখণ্ডী, নকুল, সহদেব, সাত্যকি, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, এবং অন্যান্য যোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কর্ণকে বেষ্টন করলেন। অন্য দিকে বাহ্লীক কেকয় মদ্র সিন্ধু প্রভৃতি দেশের সৈন্যের সঙ্গে ভীমসেন একাকী যুদ্ধ করতে লাগলেন।

অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, জনার্দন, এই সংশপ্তক সৈন্য ভগ্ন হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, এখন কর্ণের কাছে রথ নিয়ে চল। অর্জুনের বানরধ্বজ রথ কৃষ্ণ কর্তৃক চালিত হয়ে মেঘগম্ভীরশব্দে কৌরববাহিনীর মধ্যে এল। অশ্বত্থামা অর্জুনকে বাধা দিতে এলেন এবং শত শত বাণ নিক্ষেপ করে কৃষ্ণার্জুনকে নিশ্চেষ্ট করলেন। অশ্বত্থামা অর্জুনকে অতিক্রম করছেন দেখে কৃষ্ণ বললেন, অর্জুন, তোমার বীর্য ও বাহুবল পূর্বের ন্যায় আছে কি? তোমার হাতে গাণ্ডীব আছে তো? গুরুপুত্র মনে ক’রে তুমি অশ্বত্থামাকে উপেক্ষা করো না। তখন অর্জুন ত্বরান্বিত হয়ে চোদ্দটা ভল্লের আঘাতে অশ্বত্থামার ধ্বজ পতাকা রথ ও অস্ত্রশস্ত্র নষ্ট করলেন। অশ্বত্থামা সংজ্ঞাহীন হলেন, তাঁর সারথি তাঁকে রণস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল।

এই সময়ে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দুর্যোধনাদির ঘোর যুদ্ধ হচ্ছিল। কৌরবরা যুধিষ্ঠিরকে ধরবার চেষ্টা করছে দেখে ভীম নকুল সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বহু সৈন্য নিয়ে তাঁকে রক্ষা করতে এলেন। কর্ণ বাণবর্ষণ ক’রে সকলকেই নিরস্ত করলেন, যুধিষ্ঠিরের সৈন্য বিধ্বস্ত হয়ে পালাতে লাগল। কর্ণ তিনটি ভল্ল নিক্ষেপ ক’রে যুধিষ্ঠিরের বক্ষ বিদ্ধ করলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির রথে ব’সে পড়ে তাঁর সারথিকে বললেন, যাও। তখন দুর্যোধন ও তাঁর ভ্রাতারা যুধিষ্ঠিরকে ধরবার জন্য সকল দিক থেকে ধাবিত হলেন, কেকয় ও পাঞ্চালবীরগণ তাঁদের বাধা দিতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির ক্ষতবিক্ষতদেহে নকুল ও সহদেবের মধ্যে থেকে শিবিরে ফিরছিলেন, এমন সময় কর্ণ পুনর্ব্বার তাঁকে তিন বাণে বিদ্ধ করলেন, যুধিষ্ঠির এবং নকুল-সহদেবও কর্ণকে শরাহত করলেন। তখন যুধিষ্ঠির ও নকুলের অশ্ব বধ ক’রে কর্ণ ভল্লের আঘাতে যুধিষ্ঠিরের শিরস্ত্রাণ নিপাতিত করলেন। যুধিষ্ঠির ও নকুল আহতদেহে সহদেবের রথে উঠলেন।

মাতুল শল্য অনুকম্পাপরবশ হয়ে কর্ণকে বললেন, তুমি অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ না ক’রে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধ করছ কেন? এতে তোমার অস্ত্রশস্ত্রের বৃথা ক্ষয় হবে, তূণীর বাণশূন্য হবে, সারথি ও অশ্ব শ্রান্ত হবে, তুমিও আহত হবে; এমন অবস্থায় অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে লোকে তোমাকে উপহাস করবে। তুমি অর্জুনকে মারবে ব’লেই দুর্যোধন তোমার সম্মান করেন, যুধিষ্ঠিরকে মেরে তোমার কি হবে? ওই দেখ, ভীমসেন দুর্যোধনকে গ্রাস করছেন, তুমি দুর্যোধনকে রক্ষা কর। তখন যুধিষ্ঠির ও নকুল-সহদেবকে ত্যাগ ক’রে কর্ণ সত্বর দুর্যোধনের দিকে গেলেন।

যুধিষ্ঠির লজ্জিত হয়ে ক্ষতবিক্ষতদেহে সেনানিবেষে ফিরে এলেন এবং রথ থেকে নেমে শয়নগৃহে প্রবেশ করলেন। তাঁর দেহে যেসকল শল্য বিদ্ধ ছিল তা তুলে ফেলা হ’ল, কিন্তু তাঁর মনের শল্য দূর হ’ল না। তিনি নকুল-সহদেবকে বললেন, তোমরা শীঘ্র ভীমসেনের কাছে যাও, তিনি মেঘের ন্যায় গর্জন ক’রে যুদ্ধ করছেন।

মাতুল শল্য অনুকম্পাপরবশ হয়ে কর্ণকে বললেন, তুমি অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ না ক’রে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধ করছ কেন? এতে তোমার অস্ত্রশস্ত্রের বৃথা ক্ষয় হবে, তূণীর বাণশূন্য হবে, সারথি ও অশ্ব শ্রান্ত হবে, তুমিও আহত হবে; এমন অবস্থায় অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে লোকে তোমাকে উপহাস করবে। তুমি অর্জুনকে মারবে ব’লেই দুর্যোধন তোমার সম্মান করেন, যুধিষ্ঠিরকে মেরে তোমার কি হবে? ওই দেখ, ভীমসেন দুর্যোধনকে গ্রাস করছেন, তুমি দুর্যোধনকে রক্ষা কর। তখন যুধিষ্ঠির ও নকুল-সহদেবকে ত্যাগ ক’রে কর্ণ সত্বর দুর্যোধনের দিকে গেলেন।

যুধিষ্ঠির লজ্জিত হয়ে ক্ষতবিক্ষতদেহে সেনানিবেষে ফিরে এলেন এবং রথ থেকে নেমে শয়নগৃহে প্রবেশ করলেন। তাঁর দেহে যেসকল শল্য বিদ্ধ ছিল তা তুলে ফেলা হ’ল, কিন্তু তাঁর মনের শল্য দূর হ’ল না। তিনি নকুল-সহদেবকে বললেন, তোমরা শীঘ্র ভীমসেনের কাছে যাও, তিনি মেঘের ন্যায় গর্জন ক’রে যুদ্ধ করছেন।

এদিকে কর্ণ তাঁর বিজয় নামক ধনু থেকে ভার্গবাস্ত্র মোচন করলেন, তা থেকে অসংখ্য বাণ নির্গত হয়ে পাণ্ডবসৈন্য সংহার করতে লাগল। অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, কর্ণের ভার্গবাস্ত্রের শক্তি দেখ, আমি কোনও প্রকারে এই অস্ত্র নিবারণ করতে পারব না, কর্ণের সহিত যুগে পালাতেও পারব না। কৃষ্ণ বললেন, রাজা যুধিষ্ঠির কর্ণের সহিত যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। তুমি তাঁর সঙ্গে দেখা ক’রে তাঁকে আশ্বাস দাও, তার পর ফিরে গিয়ে কর্ণকে বধ করবে। কৃষ্ণের উদ্দেশ্য — কর্ণকে যুগে নিযুক্ত রেখে পরিশ্রান্ত করা, এজন্যই তিনি অর্জুনকে যুধিষ্ঠিরের কাছে নিয়ে চললেন।