কর্ণপর্ব: ১৫। যুধিষ্ঠিরের কটু বাক্য
যেতে যেতে ভীমকে দেখে অর্জুন বললেন, রাজার সংবাদ কি? তিনি কোথায়? ভীম বললেন, কর্ণের বাণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ধর্মরাজ এখান থেকে চলে গেছেন, হয়তো কোনও প্রকারে বেঁচে উঠবেন। অর্জুন বললেন, আপনি শীঘ্র গিয়ে তাঁর অবস্থা জানুন, আমি এখানে শত্রুদের রোধ ক’রে রাখব। ভীম বললেন, তুমিই তাঁর কাছে যাও, আমি গেলে বীরগণ আমাকে ভীত বলবেন। অর্জুন বললেন, সংশপ্তকদের বধ না ক’রে আমি যেতে পারি না। ভীম বললেন, ধনঞ্জয়, আমিই সমস্ত সংশপ্তকের সঙ্গে যুদ্ধ করব, তুমি যাও।
শত্রুস্যৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্য ভীমসেনকে রেখে এবং তাঁকে উপদেশ দিয়ে কৃষ্ণ দ্রুতবেগে যুধিষ্ঠিরের শিবিরে রথ নিয়ে এলেন। যুধিষ্ঠির একাকী শুয়ে ছিলেন, কৃষ্ণার্জুন তাঁর পাদবন্দনা করলেন। কর্ণ নিহত হয়েছেন ভেবে ধর্মরাজ হর্ষগদগদকণ্ঠে স্বাগত সম্ভাষণ করে বললেন, তোমাদের দুজনকে দেখে আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। তোমরা অক্ষতদেহে নিরাপদে সর্বাস্ত্রবিশারদ মহারথ কর্ণকে বধ করেছ তো? কৃতান্ততুল্য সেই কর্ণ আজ আমার সঙ্গে ঘোর যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু তাতে আমি কাতর হই নি। সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি বীরগণকে জয় ক’রে তাঁদের সমক্ষেই কর্ণ আমাকে পরাভূত করেছিলেন, আমাকে বহু নিষ্ঠুর বাক্য বলেছিলেন। ধনঞ্জয়, আমি ভীমের প্রভাবেই জীবিত আছি, এ আমি সইতে পারছি না। কর্ণের ভয়ে আমি তের বৎসর রাত্রিতে নিদ্রা যেতে পারি নি, দিনেও সুখ পাই নি, সকল সময়েই আমি জগৎ কর্ণময় দেখি। সেই বীর আমাকে অশ্ব ও রথ সমেত জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছেন, আমার এই ধিকৃত জীবনে ও রাজ্যে কি প্রয়োজন? ভীষ্ম দ্রোণ আর কৃপের কাছে আমি যে লাঞ্ছনা পাই নি আজ সূতপুত্রের কাছে তা পেয়েছি। অর্জুন, তাই জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কিপ্রকারে কর্ণকে বধ ক’রে নিরাপদে ফিরে এসেছ তা সবিস্তারে বল। কর্ণ তোমাকে বধ করবেন এই আশাতেই ধৃতরাষ্ট্র ও তাঁর পুত্রেরা কর্ণের সম্মান করতেন; সেই কর্ণ তোমার হাতে কি ক’রে নিহত হলেন? যিনি বলেছিলেন, ‘কৃষ্ণা, তুমি দুর্বল পতিত দীনপ্রকৃতি পাণ্ডবদের ত্যাগ করছ না কেন?’ যে দুরাত্মা দ্যূতসভায় হাস্য ক’রে দুঃশাসনকে বলেছিল, ‘যাজ্ঞসেনীকে সবলে ধ’রে নিয়ে এস’—সেই পাপবুদ্ধি কর্ণ শরাঘাতে বিদীর্ণদেহ হয়ে শুয়ে আছে তো?
অর্জুন বললেন, মহারাজ, আমি সংশপ্তকদের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম সেই সময়ে অশ্বত্থামা আমার সম্মুখে এলেন। আটটি শকট তাঁর বাণ বহন করছিল, আমার সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনি সেই সমস্ত বাণই নিক্ষেপ করলেন। তথাপি আমার শরাঘাতে তাঁর দেহ শজারুর ন্যায় কণ্টকিত হ’ল, তিনি রুধিরার্তদেহে কর্ণের সৈন্যমধ্যে আশ্রয় নিলেন। তখন কর্ণ পঞ্চাশ জন রথীর সঙ্গে আমার কাছে এলেন। আমি কর্ণের সহচরদের বিনষ্ট ক’রে সত্বর আপনাকে দেখবার জন্য এসেছি। আমি শুনেছি, অশ্বত্থামা ও কর্ণের সহিত যুদ্ধে আপনি আহত হয়েছেন, সে কারণে উপযুক্ত সময়েই আপনি কুরুপ্রভাব কর্ণের কাছ থেকে চলে এসেছেন। মহারাজ, যুদ্ধকালে আমি কর্ণের আশ্চর্য্য ভাগ্যবল দেখেছি, কর্ণের আক্রমণ সইতে পারেন এমন যোদ্ধা সৃঞ্জয়গণের মধ্যে নেই। আপনি আসুন, দেখবেন আজ আমি রণস্থলে কর্ণের সহিত মিলিত হব। যদি আজ কর্ণকে সবান্ধবে বধ না করি তবে প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গকারীর যে কষ্টকর গতি হয়, আমার যেন তাই হয়। আপনি জয়াশীর্বাদ করুন, যেন আমি সূতপুত্র ও শত্রুগণকে সসৈন্যে বধ করতে পারি।
কর্ণ সশরীরে আছেন জেনে শরাঘাতে পীড়িত যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, বৎস, তোমার সৈন্যরা পালিয়েছে, তুমি তাদের পিছনে ফেলে এসেছ। কর্ণবধে অক্ষম হয়ে তুমি ভীমকে ত্যাগ ক'রে ভীত হয়ে চলে এসেছ। অর্জুন, তুমি কুন্তীর গর্ভকে হেয় করেছ। আমরা তোমার উপর অনেক আশা রেখেছিলাম, কিন্তু অতিপুষ্পশালী বৃক্ষ যেমন ফল দেয় না সেইরূপ আমাদের আশা বিফল হয়েছে। ভূমিতে উপ্ত বীজ যেমন দৈবকৃত বৃষ্টির প্রতীক্ষায় জীবিত থাকে, আমরাও সেইরূপ রাজ্যলাভের আশায় তের বৎসর তোমার উপর নির্ভর করেছিলাম, কিন্তু এখন তুমি আমাদের সকলকেই নরকে নিমজ্জিত করেছ। মন্দবুদ্ধি, তোমার জন্মের পর কুন্তী আকাশবাণী শুনেছিলেন, 'এই পুত্র ইন্দ্রের ন্যায় বিক্রমশালী ও সর্বশত্রুজয়ী হবে, মদ্র কলিঙ্গ ও কেকয়গণকে জয় করবে, কৌরবগণকে বধ করবে।' শতশৃঙ্গ পর্বতের শিখরে তপস্বিগণ এই দৈববাণী শুনেছিলেন, কিন্তু তা সফল হ'ল না, অতএব দেবতারাও অসত্য বলেন। আমি জানতাম না যে তুমি কর্ণের ভয়ে অভিভূত। কেশব যার সারথি সেই বিশ্বকর্মা-নির্মিত শব্দহীন কপিধ্বজ রথে আরোহণ ক'রে এবং স্বর্ণমণ্ডিত খড়্গ ও গাণ্ডীবধনু ধারণ ক'রে তুমি কর্ণের ভয়ে পালিয়ে এলে! দুরাত্মা, তুমি যদি কেশবকে ধনু দিয়ে নিজে সারথি হতে তবে বজ্রধর দেবরাজ ইন্দ্র যেমন বৃত্রবধ করেছিলেন সেইরূপ কেশব কর্ণকে বধ করতেন। তুমি যদি রাধেয় কর্ণকে আক্রমণ করতে অসমর্থ হও তবে তোমার চেয়ে অস্ত্রবিশারদ অন্য রাজাকে গাণ্ডীবধনু দাও। দুরাত্মা, তুমি যদি পঞ্চম মাসে গর্ভচ্যূত হতে কিংবা কুন্তীর গর্ভে জন্মগ্রহণ না করতে তবে তাই তোমার পক্ষে শ্রেয় হ'ত, তা হলে তোমাকে যুদ্ধ থেকে পালাতে হত না। তোমার গাণ্ডীবকে ধিক, তোমার বাহুবল ও বাণসমূহকে ধিক, তোমার কপিধ্বজ ও অগ্নিদত্ত রথকেও ধিক।