কর্ণপর্ব: ১৬। অর্জ্জুনের ক্রোধ — কৃষ্ণের উপদেশ
যুধিষ্ঠিরের তিরস্কার শুনে অর্জুন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর খড়্গ ধারণ করলেন। চিত্তজ্ঞ কেশব বললেন, ধনঞ্জয়, তুমি খড়্গ হাতে নিলে কেন? বধের যোগ্য কোনও লোককে এখানে দেখছি না, এখন ভীমসেন দুর্যোধনদিকে আক্রমণ করেছেন, তুমি রাজা যুধিষ্ঠিরকে দেখতে এসেছ, তিনিও কুশলে আছেন। এই নৃপশ্রেষ্ঠকে দেখে তোমার আনন্দই হওয়া উচিত, তবে ক্রোধ হ’ল কেন? তোমার অভিপ্রায় কি?
সর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে যুধিষ্ঠিরের দিকে চেয়ে অর্জুন বললেন, আমার এই গূঢ় প্রতিজ্ঞা আছে, যে আমাকে বলবে, ‘অন্য লোককে গাণ্ডীব দাও’, তার আমি শিরশ্ছেদ করব। গোবিন্দ, তোমার সমক্ষেই রাজা যুধিষ্ঠির আমাকে তাই বলেছেন। আমি ধর্মভীরু সেজন্য একে বধ ক’রে আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করব, সত্যের নিকট ঋণমুক্ত হব। তুমিই বল এ সময়ে কি কর্তব্য। জগৎপিতা, তুমি ভূত ভবিষ্যৎ সবই জান, আমাকে যা বলবে তাই আমি করব।
কৃষ্ণ বললেন, ধিক্ ধিক্! অর্জুন, আমি বুঝেছি তুমি বৃদ্ধের নিকট উপদেশ লাভ কর নি, তাই অকালে ক্রুদ্ধ হয়েছ। তুমি ধর্মভীরু কিন্তু অপণ্ডিত; যাঁরা ধর্মের সকল বিভাগ জানেন তাঁরা এমন করেন না। যে লোক অকর্তব্য কর্মে প্রবৃত্ত হয় এবং কর্তব্য কর্মে বিরত থাকে সে পুরুষাধম। আমার মতে প্রাণিবধ না করাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম, বরং অসত্য বলবে কিন্তু প্রাণিহিংসা করবে না। যিনি জ্যেষ্ঠ-ভ্রাতা, ধর্মজ্ঞ ও রাজা, নীচ লোকের ন্যায় তুমি তাঁকে কি ক’রে হত্যা করতে পার? তুমি বালকের ন্যায় প্রতিজ্ঞা করেছিলে, এখন মূঢ়তার বশে অধর্ম কার্যে উদ্যত হয়েছ। ধর্মের সূক্ষ্ম ও দুরূহ তত্ত্ব না জেনেই তুমি গুরুহত্যা করতে যাচ্ছ। ধর্মজ্ঞ ভীষ্ম, যুধিষ্ঠির, বিদুর বা যশস্বিনী কুন্তী যে ধর্মতত্ত্ব বলতে পারেন, আমি তাই বলছি শোন।—
সত্যস্য বচনং সাধু ন সত্যাদ্বিদ্যতে পরম্।
তত্তেনৈব সুদুর্জ্ঞেয়ং পশ্য সত্যমনৃতস্তুতম্ ॥
ভবেৎ সত্যমবক্তব্যং বক্তব্যমনৃতং ভবেৎ।
যত্রানৃতং ভবেৎ সত্যং সত্যঞ্চাপ্যনৃতং ভবেৎ ॥
— সত্য বলাই ধর্মসংগত, সত্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কিছু নেই; কিন্তু জানবে যে সত্যানুসারে কর্মের অনুষ্ঠান উচিত কিনা তা স্থির করা অতি দুরূহ। যেখানে মিথ্যই সত্যতুল্য হিতকর এবং সত্য মিথ্যাতুল্য অহিতকর হয়, সেখানে সত্য বলা অনুচিত, মিথ্যাই বলা উচিত। — বিবাহকালে রতিসম্প্রয়োগে প্রাণাত্যায়ে সৰ্ব্বধনাপহারে। বিপ্রস্য চার্থে হ্যনৃতং বদেত পঞ্চানৃতান্যাহুরপাতকানি ॥ — বিবাহকালে, রতিসম্বন্ধে, প্রাণসংশয়ে, সর্ব্বনাশের সম্ভাবনায়, এবং ব্রাহ্মণের উপকারের্থে মিথ্যা বলা যেতে পারে; এই পাঁচ অবস্থায় মিথ্যা বললে পাপ হয় না।(১) তার পর কৃষ্ণ বললেন, শিক্ষিত জ্ঞানী লোকে নিদারুণ কর্ম্ম করেও মহৎ পুণ্যের অধিকারী হতে পারেন, যেমন বলাক নামক ব্যাধ অন্ধকে হত্যা ক’রে হয়েছিল। আবার, মূঢ় অপণ্ডিত ধর্ম্মকামীও মহাপাপগ্রস্ত হতে পারেন, যেমন কৌশিক হয়েছিলেন। — পুরাকালে বলাক নামে এক ব্যাধ ছিল, সে বৃথা পশুবধ করত না, কেবল স্ত্রী পুত্র পিতা মাতা প্রভৃতির জীবনযাত্রানিৰ্ব্বাহের জন্যই করত। একদা সে বনে গিয়ে কোনও মৃগ পেল না, অবশেষে সে দেখলে, একটি শ্বাপদ জলপান করছে। এই পশুর চক্ষু ছিল না, ঘ্রাণশক্তিই তার দৃষ্টির কাজ করত। বলাক সেই অদৃষ্টপূর্ব্ব অন্ধ পশুকে বধ করলে আকাশ থেকে তার মাথায় পুষ্পবৃষ্টি হ’ল। তার পর সেই ব্যাধকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য একটি মনোরম বিমান এল, তাতে অপ্সরারা গীতবাদ্য করছিল। অর্জুন, সেই পশু সমস্ত প্রাণী বিনষ্ট ক’রে অভীষ্ট বর পেয়েছিল, কিন্তু রহস্য তাঁকে অন্ধ ক’রে দেন। সেই সর্ব্বপ্রাণিহিংসক শ্বাপদকে বধ ক’রে বলাক স্বর্গে গিয়েছিল। কৌশিক নামে এক ব্রাহ্মণ গ্রামের অদূরে নদীর সঙ্গমস্থলে বাস করতেন। তিনি তপস্বী কিন্তু অল্পজ্ঞ ছিলেন। তাঁর এই ব্রত ছিল যে সর্ব্বদাই সত্য বলবেন, সেজন্য তিনি সত্যবাদী ব’লে বিখ্যাত হয়েছিলেন। একদিন কয়েকজন লোক দস্যুর ভয়ে কৌশিকের তপোবনে আশ্রয় নিলে। দস্যুরা খুঁজতে খুঁজতে কৌশিকের কাছে এসে বললে, ভগবান, কয়েকজন লোক এদিকে এসেছিল, তারা কোন্ পথে গেছে যদি জানেন তো বলুন। সত্যবাদী কৌশিক বললেন, তারা বহু-বৃক্ষ-লতা-গুল্ম-সমাকীর্ণ এই বনে আশ্রয় নিয়েছে। তখন নিষ্ঠুর দস্যুরা সেইলোকদের খুঁজে বার ক'রে হত্যা করলে। মূঢ় কৌশিক ধর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব জানতেননা, তিনি তাঁর দূরদর্শিতার জন্য পাপগ্রস্ত হয়ে কষ্টময় নরকে গিয়েছিলেন।
উপাখ্যান শেষ ক'রে কৃষ্ণ বললেন, কেউ কেউ তর্ক দ্বারা দুর্বোধ পরমজ্ঞানলাভ করবার চেষ্টা করে, আবার অনেকে বলে ধর্মের তত্ত্ব শ্রুতিতেই আছে। আমিএই দুই মতের কোনওটির দোষ ধরছি না, কিন্তু শ্রুতিতে সমস্ত ধর্মের বিধান নেই,সেজন্য প্রাণিগণের অভ্যুদয়ের নিমিত্ত প্রবচন রচিত হয়েছে। —
যৎ স্যাদহিংসাসংযুক্তং স ধর্ম ইতি নিশ্চয়ঃ।
অহিংসার্থায় ভূতানাং ধর্মপ্রবচনং কৃতম্।।
ধারণাদ্ধর্মমিত্যাহুধর্মে। ধারয়তে প্রজাঃ।
যৎ স্যাদ্ধারণসংযুক্তং স ধর্ম ইতি নিশ্চয়ঃ।।
— যে কর্মে হিংসা নেই তা নিশ্চয়ই ধর্ম; প্রাণিগণের অহিংসার নিমিত্ত ধর্মপ্রবচনরচিত হয়েছে। ধারণ (রক্ষা) করে এজন্যই ‘ধর্ম’ বলা হয়; ধর্ম প্রজাগণকে ধারণকরে; যা ধারণ করে তা নিশ্চয়ই ধর্ম। —
অবশ্যাং কুজিতব্যে বা শঙ্কেরন্নপ্যকুজতঃ।
শ্রেয়স্তত্রানৃতং বক্তৃং তৎ সত্যমবিচারিতম্।।
— যেখানে অবশ্যই কিছু বলা প্রয়োজন, না বলা শঙ্কা জনক, সেখানে মিথ্যাই বলাশ্রেয়, সে মিথ্যাকে নির্বিচারে সত্যের সমান গণ্য করতে হবে।
তার পর কৃষ্ণ বললেন, যদি মিথ্যা শপথ ক'রে দস্যুর হাত থেকে মুক্তিপাওয়া যায়, তবে ধর্মতত্ত্বজ্ঞানীরা তাতে অধর্ম দেখতে পান না, কারণ উপায় থাকলেদস্যুকে কখনও ধন দেওয়া উচিত নয়। ধর্মের জন্য মিথ্যা বললে পাপ হয় না।অর্জুন, আমি তোমাকে সত্য-মিথ্যার স্বরূপ বুঝিয়ে দিলাম, এখন বল যুধিষ্ঠিরকেবধ করা উচিত কিনা।
অর্জুন বললেন, তোমার বাক্য মহাপ্রাজ্ঞ মহামতি পুরুষের যোগ্য,আমাদেরও হিতকর। কৃষ্ণ, তুমি আমাদের মাতার সমান, পিতার সমান, আমাদেরপরম গতি। আমি বুঝেছি যে ধর্মরাজ আমার অবধ্য। এখন তুমি আমার সংকল্পেরবিষয় শুনে অনুগ্রহ ক'রে উপদেশ দাও। তুমি আমার এই প্রতিজ্ঞা জান — কেউ যদিআমাকে বলে, ‘অপর লোক তোমার চেয়ে অস্ত্রবিদ্যায় বা বীর্যে শ্রেষ্ঠ, তুমি তাকেগাণ্ডীব দাও,’-তবে আমি তাকে বধ করব। ভীমেরও প্রতিজ্ঞা আছে — যে তাঁকে ত্ববরক (১) বলবে তাকে তিনি বধ করবেন। তোমার সমক্ষেই যুধিষ্ঠির একাধিক বার আমাকে বলেছেন, ‘গাণ্ডীব অন্য লোককে দাও’। কিন্তু যদি তাঁকে বধ করি তবে আমি অল্পকালও জীবিত থাকতে পারব না। কৃষ্ণ, তুমি আমাকে এমন বুদ্ধি দাও যাতে আমার সত্যরক্ষা হয় এবং যুধিষ্ঠির ও আমি দুজনেই জীবিত থাকি।
কৃষ্ণ বললেন, কর্ণের সহিত যুদ্ধ করে যুধিষ্ঠির শ্রান্ত দুঃখিত ও ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন, সেজন্যই ক্ষোভ ও ক্রোধের বশে তোমাকে অনুচিত বাক্য বলেছেন। এর এই উদ্দেশ্যও আছে যে কুপিত হলে তুমি কর্ণকে বধ করবে। ইনি এও জানেন যে তুমি ভিন্ন আর কেউ কর্ণের বিক্রম সইতে পারে না। যুধিষ্ঠির অবধ্য, তোমার প্রতিজ্ঞাও পালনীয়। যে উপায়ে ইনি জীবিত থেকেই মৃত হবেন তা বলছি শোন। মাননীয় লোক যত কাল সম্মান লাভ করেন তত কালই জীবিত থাকেন; যখন তিনি অপমানিত হন তখন তাঁকে জীবন্মৃত বলা যায়। রাজা যুধিষ্ঠির তোমাদের সকলের নিকট সর্বদাই সম্মান পেয়েছেন, এখন তুমি তাঁর কিঞ্চিৎ অপমান কর। পূজনীয় যুধিষ্ঠিরকে ‘তুমি’ বল; যিনি প্রভু ও গুরুজন তাঁকে তুমি বললে অবধ্যেরই তার বধ হয়। এই অপমানে ধর্মরাজ নিজেকে নিহত মনে করবেন; তার পর তুমি চরণবন্দনা ক’রে এবং সান্ত্বনা দিয়ে তাঁর প্রতি পূর্ববৎ আচরণ করবে। প্রজ্ঞাবান রাজা যুধিষ্ঠির এতে কখনই কুপিত হবেন না। সত্যভঙ্গ ও ভ্রাতৃবধের পাপ থেকে এইরূপে মুক্ত হয়ে তুমি হৃষ্টচিত্তে সূতপুত্রকে বধ কর।