কর্ণপর্ব: ১৭। অর্জ্জুনের সত্যরক্ষা — যুধিষ্ঠিরের অনুতাপ
অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে বললেন, রাজা, আমাকে কটুবাক্য বলো না, বলো না; তুমি রণভূমি থেকে এক ক্রোশ দূরে রয়েছ। ভীম আমার নিন্দা করতে পারেন, কারণ তিনি শ্রেষ্ঠ বীরগণের সঙ্গে সিংহবিক্রমে যুদ্ধ করছেন। ভরত নন্দন, পণ্ডিতগণ বলেন, ব্রাহ্মণের বল বাক্যে আর ক্ষত্রিয়ের বল বাহুতে; কিন্তু তোমারও বল বাক্যে, এবং তুমি নিষ্ঠুর। আমি কিরূপ তা তুমি জান। স্ত্রী পুত্র ও জীবন দিয়েও আমি সর্বদা তোমার ইষ্টসাধনের চেষ্টা করি, তথাপি তুমি যখন আমাকে বাক্যবাণে আঘাত করছ তখন বুঝেছি তোমার কাছে আমাদের কোনও সুফলাভের আশা নেই। তুমি দ্রৌপদীর শয্যায় শুয়ে আমাকে অবজ্ঞা করো না; তোমার জন্যই আমি মহারথগণকে বধ করেছি, তাতেই তুমি নিঃশঙ্ক ও নিষ্ঠুর হয়েছ। অধিরথজের পদ পেয়ে তুমি যা করেছ তার আমি প্রশংসা করতে পারি না। তোমার দ্যুতাসক্তির জন্য আমাদের রাজ্য-নাশ হয়েছে, আমরা বিপদে পড়েছি। তুমি অল্পভাগা, এখন ক্রুর বাক্যের কশাঘাতে আমাদের ক্রুদ্ধ করো না।
যুধিষ্ঠিরকে এইপ্রকার পরুষ বাক্য ব’লে অর্জুন অনুতপ্ত হলেন এবং নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে অসি কোষমুক্ত করলেন। কৃষ্ণ বললেন, একি, তুমি আবার অসি নিষ্কাশিত করলে কেন? অর্জুন বললেন, যে শরীরে আমি অহিত আচরণ করেছি সে শরীর আমি নষ্ট করব। কৃষ্ণ বললেন, রাজা যুধিষ্ঠিরকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেছ সেজন্য মোহগ্রস্ত হলে কেন? তুমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছ? যদি তুমি সত্যরক্ষার নিমিত্ত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে বধ করতে তবে তোমার কি অনুকম্পা হ’ত? পার্থ, ধর্মের তত্ত্ব সূক্ষ্ম ও দুজ্ঞেয়, বিশেষত অজ্ঞ লোকের কাছে। আমি যা বলছি শোন। আত্মহত্যা করলে তোমার ভ্রাতৃহত্যার চেয়ে গুরুতর পাপ হবে। এখন তুমি নিজের মুখে নিজের গুণকীর্তন কর, তাতেই আত্মহত্যা হবে।
তখন ধনঞ্জয় তাঁর ধনু নমিত করে যুধিষ্ঠিরকে বলতে লাগলেন, মহারাজ, শুনুন — পিনাকপাণি মহাদেব ভিন্ন আমার তুল্য ধনুর্ধর কেউ নেই। আমি মহাদেবের অনুমতিতে ক্ষণমধ্যে চরাচর সহ সমস্ত জগৎ বিনষ্ট করতে পারি। রাজসূয় যজ্ঞের পূর্বে আমিই সকল দিক ও দিক্পালগণকে জয় করে আপনার বশে এনেছিলাম। আমার তেজেই আপনার দিব্য সভা নির্মিত এবং রাজসূয় যজ্ঞ সমাপ্ত হয়েছিল। আমার দক্ষিণ হস্তে বাণ, বাম হস্তে বাণযুক্ত বিস্তৃত ধনু, এবং দুই পদতলে রথ ও ধ্বজ অঙ্কিত আছে, আমার তুল্য পুরুষ যুদ্ধে অজেয়। সংশপ্তকদের অল্পই অবশিষ্ট আছে, শত্রুসৈন্যের অর্ধ ভাগ আমি বিনষ্ট করেছি। আমি অস্ত্র দ্বারাই অস্ত্রজ্ঞদের বধ করি, অস্ত্রপ্রয়োগে বিপক্ষ সৈন্য ভস্মসাৎ করি না। কৃষ্ণ, শীঘ্র চল, আমরা বিজয় রথে চড়ে সূতপুত্রকে বধ করতে যাই। আমাদের রাজা আজ সদ্ভাব লাভ করুন, আমি কর্ণকে বিনষ্ট করব। আজ কর্ণের মাতা অথবা কুন্তী পুত্রহীনা হবেন, আমি সত্য বলছি — কর্ণকে বধ না ক’রে আমার কবচ খুলব না।
এই কথা ব’লে অর্জুন তাঁর খড়্গ কোষবদ্ধ ক’রে ধনু ত্যাগ করলেন এবং লজ্জায় নতমস্তকে কৃতাঞ্জলিপুটে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, প্রসন্ন হ’ন, যা বলেছি তা ক্ষমা করুন, পরে আপনি আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পারবেন, আপনাকে নমস্কার করছি। আমি ভীমকে যুদ্ধ থেকে মুক্ত করতে এবং সূতপুত্রকে বধ করতে এখনই যাচ্ছি। সত্য বলছি, আপনার প্রিয়সাধনের জন্যই আমার জীবন। এই ব'লে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের পাদস্পর্শ ক'রে যুদ্ধযাত্রার জন্য দণ্ডায়মান হলেন।
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শয্যা থেকে উঠে দুঃখিত মনে বললেন, অর্জুন, আমি অসাধ্য কর্ম করেছি, তার জন্যই তোমরা বিপদগ্রস্ত হয়েছ। আমি কুলনাশক পরুষাধম, তুমি আমার শিরশ্ছেদ কর। আমার ন্যায় পাপী মৃদুভাষী অলস ভীরু নিষ্ঠুর পুরুষের অনুসরণ ক'রে তোমাদের কি লাভ হবে? আমি আজই বনে যাব, মহাত্মা ভীমসেনই তোমাদের যোগ্য রাজা, আমার ন্যায় ক্লীবের আবার রাজকার্য কি? তোমার পরুষ বাক্য আমি সইতে পারছি না, অপমানিত হয়ে আমার জীবনধারণের প্রয়োজন নেই।
অর্জুনের প্রতিজ্ঞারক্ষার বিষয় যুধিষ্ঠিরকে বুঝিয়ে দিয়ে কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, আমি আর অর্জুন আপনার শরণাগত, আমি প্রণত হয়ে প্রার্থনা করছি, ক্ষমা করুন, আজ রণভূমি পাপী কর্ণের রক্ত পান করবে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সসম্ভ্রমে কৃষ্ণকে উঠিয়ে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, গোাবিন্দ, আমরা অজ্ঞানে মোহিত হয়েছিলাম, ঘোর বিপদসাগর থেকে তুমি আমাদের উদ্ধার করেছ।
অর্জুন সরোদনে যুধিষ্ঠিরের চরণে পড়লেন। ভ্রাতাকে সস্নেহে উঠিয়ে আলিঙ্গন ক'রে যুধিষ্ঠিরও রোদন করতে লাগলেন। তার পর অর্জুন বললেন, মহারাজ, আপনার পাদস্পর্শ ক'রে প্রতিজ্ঞা করছি, আজ কর্ণকে বধ না ক'রে আমি যুদ্ধ থেকে ফিরব না। যুধিষ্ঠির প্রসন্নমনে বললেন, অর্জুন, তুমি যশস্বী হও, অক্ষয় জীবন ও অভীষ্ট লাভ কর, সর্বদা জয়ী হও, তোমার শত্রুর ক্ষয় হ'ক।