কর্ণপর্ব: ১৮। অর্জ্জুন-কর্ণের অভিযান

(সপ্তদশ দিনের আরও যুদ্ধ)

কৃষ্ণের আজ্ঞায় দারুক অর্জুনের ব্যাঘ্রচর্মাবৃত রথ সজ্জিত করলে। যথাবিধি অস্ত্রাভরণের পর কৃষ্ণের সহিত অর্জুন সেই রথে উঠে রণভূমির অভিমুখে চললেন। সেই সময়ে সকল দিক নির্মল হ'ল, চাষ (নীলকণ্ঠ), শতপত্র (কাঠঠোকরা) ও ক্রৌঞ্চ (কোঁচ বক) প্রভৃতি শুভসূচক পক্ষী অর্জুনকে প্রদক্ষিণ করতে লাগল। কঙ্ক গৃধ্র বক শ্যেন বায়স প্রভৃতি মাংসাশী পক্ষী খাদ্যের লোভে আগে আগে যেতে লাগল।

কৃষ্ণ বললেন, অর্জুন, তোমার সমান যোদ্ধা পৃথিবীতে নেই, তথাপি তুমি কর্ণকে অবজ্ঞা ক'রো না। আজ যুদ্ধের সপ্তদশ দিন চলছে, তোমাদের এবং শত্রু- পক্ষের বিপুল সৈন্যের এখন অল্পই অবশিষ্ট আছে। কৌরবপক্ষে এখন পাঁচ মহারথ জীবিত আছেন — অশ্বত্থামা কৃতবর্মা কর্ণ শল্য ও কৃপ। অশ্বত্থামা তোমার মাননীয় গুরু দ্রোণের পুত্র, কৃপ তোমার আচার্য, কৃতবর্মা তোমার মাতুকুলের বান্ধব, মহারাজ শল্য তোমার বিমাতার ভ্রাতা, এই কারণে এঁদের উপর তোমার দয়া থাকতে পারে, কিন্তু পাপমতি ক্ষুদ্রাশয় কর্ণকে আজ তুমি সত্বর বধ কর। জতুগৃহদাহ, দ্যুতক্রীড়া, এবং দুর্যোধন তোমাদের উপর যত উৎপীড়ন করেছেন সে সমস্তেরই মূল দুরাত্মা কর্ণ। অর্জুন বললেন, গোবিন্দ, ভূতভবিষ্যদ্বিং তুমি যখন আমার সহায় তখন কর্ণের কথা দূরে থাক, ত্রিলোকের সকলকেই আমি পরলোকে পাঠাতে পারি।

এই সময়ে ভীম তুমুল যুদ্ধে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর সারথি বিশোককে বললেন, আমি সবদিকে শত্রুদের রথ ও ধ্বজাগ্র দেখে উদ্বিগ্ন হয়েছি। অর্জুন এখনও এলেন না, ধর্মরাজও আহত হয়ে চ'লে গেছেন। এঁরা জীবিত আছেন কিনা জানি না। যাই হ'ক, এখন আমি শত্রুসৈন্য সংহার করব, তুমি দেখে বল আমার কত বাণ অবশিষ্ট আছে। বিশোক বললে, পাণ্ডুপুত্র, আপনার কাছে এত অস্ত্র আছে যে ছয় গোশকট তা বহন করতে পারে না। আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে বহু সহস্র অস্ত্র নিক্ষেপ করুন।

কিছুক্ষণ পরে বিশোক বললে, ভীমসেন, আপনি গাণ্ডীব আকর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না? আপনার অভিলাষ পূর্ণ হয়েছে, হস্তিসৈন্যের মধ্য থেকে অর্জুনের ধ্বজাগ্রে ওই ভয়ংকর বানর দেখা যাচ্ছে, তিনি কৌরবসৈন্য বিনষ্ট করতে করতে আপনার কাছে আসছেন। ভীম হৃষ্ট হয়ে বললেন, বিশোক, তুমি যে প্রিয়সংবাদ দিলে তার জন্য আমি তোমাকে চৌদ্দটি গ্রাম, এক শ দাসী এবং কুড়িটি রথ দেব।

অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, পাঞ্চালসৈন্যেরা কর্ণের ভয়ে পালাচ্ছে, তুমি শীঘ্র কর্ণের কাছে রথ নিয়ে চল, নতুবা তিনি পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণকে নিঃশেষ করবেন। অর্জুনের রথ দেখতে পেয়ে শল্য বললেন, কর্ণ, ওই দেখ অর্জুন আসছেন, তাঁর ভয়ে কৌরবসৈন্য সব দিকে ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু তিনি সমস্ত সৈন্য বর্জন ক'রে তোমার দিকেই আসছেন। রাধেয়, তুমি কৃষ্ণার্জুনকে বধ করতে সমর্থ, তুমি ভীষ্ম দ্রোণ অশ্বত্থামা ও কৃপাচার্যের সমান। আমাদের পক্ষের রাজারা অর্জুনের ভয়ে পালাচ্ছেন, তুমি ভিন্ন আর কেউ এ ঘোর ভয় দূর করতে পারবে না। এই যুদ্ধে কৌরবগণ তোমাকেই দ্বীপের ন্যায় আশ্রয় মনে করেন। কর্ণ বললেন, মহারাজ, আপনি এখন প্রকৃতিস্থ হয়েছেন, ও আমার মনের মত কথা বলছেন, ধনঞ্জয়ের ভয়ও ত্যাগ করেছেন। আজ আমার বাহুবল দেখুন, আমি একাকীই পাণ্ডবগণের মহাসৈন্য ধ্বংস করব এবং পুরুষব্যাঘ্র কৃষ্ণার্জুনকেও বধ করব। এই দুই বীরকে না মেরে আমি ফিরব না।

এই সময়ে দুর্যোধন কৃপ কৃতবর্মা শকুনি অশ্বত্থামা প্রভৃতিকে দেখে কর্ণ বললেন, আপনারা সকল দিক থেকে কৃষ্ণার্জুনকে আক্রমণ করুন, তাঁরা পরিশ্রান্ত ও ক্ষতবিক্ষত হ’লে আমি অনায়াসে তাঁদের বধ করব। কর্ণের উপদেশ অনুসারে কৌরবপক্ষের মহারথগণ সসৈন্যে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। অর্জুনের বাণবর্ষণে কৌরবসৈন্য নিষ্পিষ্ট ও বিধ্বস্ত হতে লাগল, যারা ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল তারাও পরাঙ্মুখ হ’ল। কৌরবসৈন্য ভগ্ন হ’লে অর্জুন ভীমের কাছে এলেন এবং তাঁকে যুধিষ্ঠিরের কুশলসংবাদ জানিয়ে অন্যত্র যুদ্ধ করতে গেলেন।

দুঃশাসনের কনিষ্ঠ দশ জন অর্জুনকে পরিবেষ্টন করলেন, কিন্তু অর্জুন অস্ত্রের আঘাতে সকলেরই শিরশ্ছেদ করলেন। নব্বই জন সংশপ্তক রথী অর্জুনকে বাধা দিতে এলেন, কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর তাঁরাও নিহত হলেন।