শল্যপর্ব: ৩। শল্যবধ
দুর্যোধন শল্যকে যথাবিধি সেনাপতির পদে অভিষিক্ত করলেন। সৈন্যরা সিংহনাদ ক'রে উঠল, নানাপ্রকার বাদ্যধ্বনি হ'ল, কৌরব ও মদ্রদেশীয় যোদ্ধারা হৃষ্ট হয়ে শল্যের স্তুতি করতে লাগলেন। সকলে সেই রাত্রিতে সুখে নিদ্রা গেলেন।
পাণ্ডবশিবিরে যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে বললেন, মাধব, দুর্যোধন মহাধনুর্ধর শল্যকে সেনাপতি করেছেন। তুমিই আমাদের নেতা ও রক্ষক, অতএব এখন যা কর্তব্য তার ব্যবস্থা কর। কৃষ্ণ বললেন, ভরতনন্দন, আমি শল্যকে জানি, তিনি ভীষ্ম দ্রোণ ও কর্ণের সমান অথবা তাঁদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। শল্যের বল ভীম অর্জুন সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডীর অপেক্ষা অধিক। পুরুষশ্রেষ্ঠ, আপনি বিক্রমে শার্দূলতুল্য, আপনি ভিন্ন অন্য পুরুষ পৃথিবীতে নেই যিনি যুদ্ধে মদ্ররাজকে বধ করতে পারেন। তিনি সম্পর্কে মাতুল এই ভেবে দয়া করবেন না, ক্ষত্রধর্মকে অগ্রগণ্য ক'রে শল্যকে বধ করুন। ভীষ্ম-দ্রোণ-কর্ণ-রূপ সাগর উত্তীর্ণ হয়ে এখন শল্য-রূপ গোষ্পদে নিমজ্জিত হবেন না। এইপ্রকার উপদেশ দিয়ে কৃষ্ণ সায়ংকালে তাঁর শিবিরে প্রস্থান করলেন। কর্ণবধে আনন্দিত পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ সেই রাত্রিতে সুখে নিদ্রা গেলেন।
৩। শল্যবধ
(অষ্টাদশ দিনের যুদ্ধ)
পরদিন প্রভাতে কৃপ কৃতবর্মা অশ্বত্থামা শল্য শকুনি প্রভৃতি দুর্যোধনের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই নিয়ম করলেন যে তাঁরা কেউ একাকী পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন না, পরস্পরকে রক্ষা ক'রে মিলিত হয়েই যুদ্ধ করবেন। শল্য সর্বতোভদ্র নামক ব্যূহ রচনা করলেন এবং মদ্রদেশীয় বীরগণ ও কর্ণপুত্রের সঙ্গে ব্যূহের সম্মুখে রইলেন। ত্রিগর্ত্তসৈন্য সহ কৃতবর্ম্মা ব্যূহের বামে, শক ও যবন সৈন্য সহ কৃপাচার্য্য দক্ষিণে, কাম্বোজ সৈন্য সহ অশ্বত্থামা পৃষ্ঠদেশে, এবং কুরুবীরগণ সহ দুর্য্যোধন ব্যূহের মধ্যদেশে অবস্থান করলেন। পাণ্ডবগণও নিজেদের সৈন্য ব্যূহবদ্ধ ও শিখা বিভক্ত করে অগ্রসর হলেন। কৌরবপক্ষে এগার হাজার রথী, দশ হাজার সাত শ গজারোহী, দু লক্ষ অশ্বারোহী ও তিন কোটি পদাতি, এবং পাণ্ডবপক্ষে ছ হাজার রথী, ছ হাজার গজারোহী, দশ হাজার অশ্বারোহী ও দু কোটি পদাতি অবশিষ্ট ছিল।
দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হ’ল। কর্ণপুত্র চিত্রসেন সত্যসেন ও সুশর্মা নকুলের হাতে নিহত হলেন। পাণ্ডবপক্ষের গজ অশ্ব রথী ও পদাতি সৈন্য শল্যের বাণে নিপীড়িত ও বিচলিত হ’ল। সহদেব শল্যের পুত্রকে বধ করলেন। ভীমের গদাঘাতে শল্যের চার অশ্ব নিহত হ’ল, শল্যও তোমর নিক্ষেপ ক’রে ভীমের বক্ষ বিদ্ধ করলেন। বৃকোদর অবিচলিত থেকে সেই তোমর টেনে নিলেন এবং তারই আঘাতে শল্যের সারথির হৃদয় বিদীর্ণ করলেন। পরস্পরের প্রহারে দুজনেই আহত ও বিহ্বল হলেন, তখন কৃপাচার্য্য শল্যকে নিজের রথে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। ক্ষণকাল পরে ভীমসেন উঠে দাঁড়ালেন এবং মত্তের ন্যায় বিহ্বল হয়ে মদ্ররাজকে আবার যুদ্ধে আহ্বান করলেন।
দুর্য্যোধনের প্রাসের আঘাতে যাদববীর চেকিতান নিহত হলেন। শল্যকে অগ্রবর্ত্তী ক’রে কৃপাচার্য্য কৃতবর্ম্মা ও শকুনি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে এবং তিন হাজার রথী সহ অশ্বত্থামা অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের এবং কৃষ্ণকে ডেকে বললেন, ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ ও অন্যান্য পরাক্রান্ত বহু রাজা কৌরবদের জন্য যুদ্ধ করে নিহত হয়েছেন, তোমরাও উৎসাহের সহিত নিজ নিজ কর্তব্যে পরামুকার দেখিয়েছ। এখন আমার ভাগে কেবল মহারথ শল্য অবশিষ্ট আছেন, আজ আমি তাঁকে যুদ্ধে জয় করতে ইচ্ছা করি। বীরগণ, আমার সত্য বাক্য শোন— আজ শল্য আমাকে বধ করবেন অথবা আমি তাঁকে বধ করব, আজ আমি বিজয়লাভ বা মৃত্যুর জন্য ক্ষত্রধর্ম্মানুসারে মাতুলের সঙ্গে যুদ্ধ করব। রথযোজকগণ (১) আমার রথে প্রচুর অস্ত্র ও অন্যান্য উপকরণ রাখুক; সাত্যকি দক্ষিণচক্র, ধৃষ্টদ্যুম্ন বামচক্র, এবং অর্জুন আমার পৃষ্ঠ রক্ষা করুন, ভীম আমার অগ্রে থাকুন; এতে আমার শক্তি শল্য অপেক্ষা অধিক হবে। যুধিষ্ঠিরের প্রিয়কামীগণ তাঁর আদেশ পালন করলেন।
আমিষলোভী দুই শার্দূলের ন্যায় যুধিষ্ঠির ও শল্য বিবিধ বাণ দ্বারা পরস্পর প্রহার করতে লাগলেন, ভীম ধৃষ্টদ্যুম্ন সাত্যকি এবং নকুল-সহদেবও শকুনি প্রভৃতির সঙ্গে যুদ্ধে রত হলেন। কৌরবগণ আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠির যিনি পূর্বে মৃদু ও শান্ত ছিলেন, এখন তিনি দারুণ হয়েছেন, এবং ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে ভল্লের আঘাতে শতসহস্র যোদ্ধাকে বধ করছেন। যুধিষ্ঠির শল্যের চার অশ্ব ও দুই পৃষ্ঠসারথিকে বিনষ্ট করলেন, তখন অশ্বত্থামা বেগে এসে শল্যকে নিজের রথে তুলে নিয়ে চ'লে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে শল্য অন্য রথে চ'ড়ে পুনর্বার যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধে রত হলেন।
শল্যের চার বাণে যুধিষ্ঠিরের চার অশ্ব নিহত হ'ল, তখন ভীমসেনও শল্যের চার অশ্ব ও সারথিকে বিনষ্ট করলেন। শল্য রথ থেকে নেমে খড়্গ ও চর্ম নিয়ে যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবিত হলেন, কিন্তু ভীমসেন শরাঘাতে শল্যের চর্ম এবং ভল্ল দ্বারা তাঁর খড়্গের মুষ্টি ছেদন করলেন। যুধিষ্ঠির তখন গোবিন্দের বাক্য স্মরণ ক'রে শল্যবধে যত্নবান হলেন। তিনি অশ্বসারথিহীন রথে আরূঢ় থেকেই একটি স্বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল মন্ত্রসিদ্ধ শক্তি অস্ত্র নিলেন, এবং 'পাপী, তুমি হত হ'লে' — এই বলে বিস্ফারিত দীপ্তনয়নে মদ্ররাজকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলেন। প্রলয়কালে আকাশ থেকে পতিত মহতী উল্কার ন্যায় সেই শক্তি অস্ত্র স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে ছড়াতে মহাবেগে শল্যের অভিমুখে গেল, এবং তাঁর শুভ্র বর্ম ও বিশাল বক্ষ বিদীর্ণ ক'রে জলের ন্যায় ভূমিতে প্রবিষ্ট হ'ল। বজ্রাহত পর্বতশৃঙ্গের ন্যায় শল্য বাহু প্রসারিত ক'রে ভূমিতে পড়ে গেলেন।
শল্য নিপতিত হ'লে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা রথারোহণে যুধিষ্ঠিরের দিকে ধাবিত হলেন এবং বহু নারাচ নিক্ষেপ ক'রে তাঁকে বিদ্ধ করতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির শল্যভ্রাতার ধনু ও ধ্বজ ছেদন ক'রে ভল্লের আঘাতে তাঁর মস্তক দেহচ্যুত করলেন। কৌরবসেনা ভগ্ন হ'য়ে হাহাকার ক'রে পালাতে লাগল।
শল্য নিহত হ'লে তাঁর অনুচর সাত শ রথী কৌরবসেনা থেকে বেরিয়ে এলেন। সেই সময়ে একটি পর্বতাকার হস্তীতে চ'ড়ে দুর্যোধন সেখানে এলেন; একজন তাঁর মস্তকের উপর ছত্র ধরেছিল, আর একজন তাঁকে চামর বীজন করছিল। দুর্যোধন বার বার মদ্রযোদ্ধাদের বললেন, যাবেন না, যাবেন না। অবশেষে তাঁরা দুর্যোধনের অনুরোধে পুনর্বার পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। শল্য হত হয়েছেন এবং মদ্রদেশীয় মহারথগণ ধৰ্ম্মরাজকে পীড়িত করছেন শুনে অৰ্জ্জুন সত্বর সেখানে এলেন, ভীম নকুল সহদেব সাত্যকি প্রভৃতিও যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা করবার জন্য বেষ্টন করলেন। পাণ্ডবগণের আক্রমণে মদ্রবীরগণ বিনষ্ট হলেন, তখন দুৰ্য্যোধনের সমস্ত সৈন্য ভীত ও চঞ্চল হয়ে পালাতে লাগল। বিজয়ী পাণ্ডবগণ শঙ্খধ্বনি ও সিংহনাদ করতে লাগলেন।