শল্যপর্ব: ৬। দুর্য্যোধনের হ্রদপ্রবেশ

৬। দুৰ্য্যোধনের হ্রদপ্ৰবেশ হতাবশিষ্ট কৌরবসৈন্য দুৰ্য্যোধনের বাক্যে উৎসাহিত হয়ে পুনৰ্ব্বার যুদ্ধে রত হ'ল, কিন্তু পাণ্ডবসৈন্যের আক্রমণে তারা একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল। দুৰ্য্যোধনের একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা ধ্বংস হ'ল। পাণ্ডবসেনার দুই হাজার রথ, সাত শ হস্তী, পাঁচ হাজার অশ্ব ও দশ হাজার পদাতি অবশিষ্ট রইল। দুৰ্য্যোধন যখন দেখলেন যে তাঁর সহায় কেউ নেই তখন তিনি তাঁর নিহত অশ্ব পরিত্যাগ ক'রে একাকী গদাহস্তে দ্রুতবেগে পূৰ্ব্বমুখে প্রস্থান করলেন।

সঞ্জয়কে দেখে ধৃষ্টদ্যুম্ন সহাস্যে সাত্যকিকে বললেন, একে বন্দী ক’রে কি হবে, এর জীবনে কোনও প্রয়োজন নেই। সাত্যকি তখন খরধার খড়্গ তুলে সঞ্জয়কে বধ করতে উদ্যত হলেন। সেই সময়ে মহাপ্রাজ্ঞ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস উপস্থিত হয়ে বললেন, সঞ্জয়কে মুক্তি দাও, একে বধ করা কখনও উচিত নয়। সাত্যকি কৃতাঞ্জলি হয়ে ব্যাসদেবের আদেশ মেনে নিয়ে বললেন, সঞ্জয়, যাও, তোমার মঙ্গল হ’ক। বর্মহীন ও নিরস্ত্র সঞ্জয় মুক্তি পেয়ে সায়াহ্নকালে রুধিরাক্তদেহে হস্তিনাপুরের দিকে প্রস্থান করলেন।

রঙ্গস্থল থেকে এক ক্রোশ দূরে গিয়ে সঞ্জয় দেখলেন, দুর্যোধন ক্ষত-বিক্ষতদেহে গদাহস্তে একাকী রয়েছেন। দুজনে অশ্রুপূর্ণনয়নে কাতরভাবে কিছুক্ষণ পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলেন, তার পর সঞ্জয় তাঁর বন্ধন ও মুক্তির বিবরণ জানালেন। ক্ষণকাল পরে দুর্যোধন প্রকৃতিস্থ হয়ে তাঁর ভ্রাতৃগণ ও সৈন্যদের বিবরণ জিজ্ঞাসা করলেন। সঞ্জয় বললেন, আপনার সকল ভ্রাতাই নিহত হয়েছেন, সৈন্যও নষ্ট হয়েছে, কেবল তিন জন রথী (কৃপ, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা) অবশিষ্ট আছেন; প্রস্থানকালে ব্যাসদেব আমাকে এই কথা বলেছেন। দুর্যোধন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সঞ্জয়কে স্পর্শ করে বললেন, এই সংগ্রামে আমার পক্ষে তুমি ভিন্ন দ্বিতীয় কেউ জীবিত নেই, কিন্তু পাণ্ডবরা সহায়সম্পন্নই রয়েছে। সঞ্জয়, তুমি প্রজ্ঞাচক্ষু রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বলবে, আপনার পুত্র দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদে আশ্রয় নিয়েছে। আমার মহৎ ভ্রাতা ও পুত্রেরা গত হয়েছে, রাজ্য পাণ্ডবরা নিয়েছে, এ অবস্থায় কে বেঁচে থাকে? তুমি আরও বলবে, আমি মহাযুদ্ধ থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষতবিক্ষতদেহে এই হ্রদে মৃতের ন্যায় নিশ্চেষ্ট হয়ে জীবিত রয়েছি।

এই কথা বলে রাজা দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদের মধ্যে প্রবেশ করলেন এবং মায়া দ্বারা তার জল স্তম্ভিত ক’রে রইলেন। এই সময়ে কৃপাচার্য অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা রথারোহণে সেখানে উপস্থিত হলেন। সঞ্জয় সকল সংবাদ জানালে অশ্বত্থামা বললেন, হা ধিক, রাজা দুর্যোধন জানেন না যে আমরা জীবিত আছি এবং তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেও সমর্থ আছি। সেই তিন মহারথ বহুক্ষণ বিলাপ করলেন, তার পর পাণ্ডবদের দেখতে পেয়ে বেগে শিবিরে চলে গেলেন।

সূর্যাস্ত হ’লে কৌরবশিবিরের সকলেই দুর্যোধনভ্রাতাদের বিনাশের সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত ভীত হ’ল। দুর্যোধনের অমাত্যগণ এবং বেত্রধারী নারী রক্ষকগণ রাজভার্যাদের নিয়ে হস্তিনাপুরে যাত্রা করলেন। শয্যা আস্তরণ প্রভৃতিও পাঠানো হ’ল। অন্যান্য সকলে অশ্বতরীবদ্ধ রথে চড়ে নিজ নিজ পত্নী সহ প্রস্থান করলেন।

পূর্বে রাজপুরীতে যেসকল নারীকে সূর্য্যও দেখতে পেতেন না, তাঁদের এখন সকলেই দেখতে লাগল।

বৈশ্যাগর্ভজাত ধৃতরাষ্ট্রপুত্র যুযুৎসু, যিনি পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়েছিলেন, তিনিও যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে রাজভার্য্যাদের সঙ্গে প্রস্থান করলেন। হস্তিনা-পুরে এসে যুযুৎসু বিদুরকে সকল বৃত্তান্ত জানালেন। বিদুর বললেন, বৎস, কৌরবকুলের এই ক্ষয়কালে তুমি এখানে এসে উপযুক্ত কার্য্যই করেছ। হতভাগ্য অন্ধরাজের তুমিই এখন একমাত্র অবলম্বন। আজ বিশ্রাম করে কাল তুমি যুধিষ্ঠিরের কাছে ফিরে যেয়ো।