শল্যপর্ব: ৭। যুধিষ্ঠিরের তর্জ্জন
পাণ্ডবগণ অনেক অন্বেষণ করেও দুর্য্যোধনকে কোথাও দেখতে পেলেন না। তাঁদের বাহনসকল পরিশ্রান্ত হলে তাঁরা সৈন্য সহ শিবিরে চলে গেলেন। তখন কৃপ অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা ধীরে ধীরে হ্রদের কাছে গিয়ে বললেন, রাজা, ওঠ, আমাদের সহিত মিলিত হয়ে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধ কর। জয়ী হয়ে পৃথিবী ভোগ কর অথবা হত হয়ে স্বর্গলাভ কর। দুর্য্যোধন বললেন, ভাগ্যক্রমে আপনাদের জীবিত দেখছি। আপনারা পরিশ্রান্ত হয়েছেন, আমিও ক্ষতবিক্ষত হয়েছি; এখন যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করি না, বিশ্রাম করে ক্লান্তিহীন হয়ে শত্রুজয় করব। বীরগণ, আপনাদের মহৎ অন্তঃকরণ এবং আমার প্রতি পরম অনুরাগ আশ্চর্য্য নয়। আজ রাত্রে বিশ্রাম করে কাল আমি নিশ্চয় আপনাদের সহিত মিলিত হয়ে যুদ্ধ করব। অশ্বত্থামা বললেন, রাজা, ওঠ, আমি শপথ করছি আজই সোমক ও পাঞ্চালগণকে বধ করব।
এই সময়ে কয়েকজন ব্যাধ মাংসভারবহনে শ্রান্ত হয়ে জলপানের জন্য হ্রদের নিকটে উপস্থিত হল। এরা প্রত্যহ ভীমসেনকে মাংস এনে দিত। ব্যাধরা অন্তরাল থেকে দুর্য্যোধন অশ্বত্থামা প্রভৃতির সমস্ত কথা শুনলে। পূর্বে যুধিষ্ঠির এদের কাছে দুর্য্যোধন সম্বন্ধে খোঁজ নিয়েছিলেন। দুর্য্যোধন হ্রদের মধ্যে লুকিয়ে আছেন জানতে পেরে তারা পাণ্ডবশিবিরে গেল। দ্বাররক্ষীরা তাদের বাধা দিলে, কিন্তু ভীমের আদেশে তারা শিবিরে প্রবেশ করে তাঁকে সব কথা বললে। ভীম তাদের প্রচুর অর্থ দিলেন এবং যুধিষ্ঠির প্রভৃতিকে দুর্য্যোধনের সংবাদ জানালেন। তখন পাণ্ডবগণ রথারোহণে সদলে সাগরতুল্য বিশাল দ্বৈপায়ন হ্রদের নিকট উপস্থিত হলেন। শঙ্খনাদ, রথের ঘর্ঘর ও সৈন্যদের কোলাহল শুনে কৃপাচার্য অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা দুর্য্যোধনকে বললেন, রাজা, পাণ্ডবরা আসছে, অনুমতি দাও আমরা এখন চলে যাই। তাঁরা বিদায় নিয়ে দূরে গিয়ে এক বটবৃক্ষের নীচে ব’সে দুর্য্যোধনের বিষয় ভাবতে লাগলেন।
হ্রদের তীরে এসে যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে বললেন, দেখ, দুর্য্যোধন দৈবী মায়ায় জল স্তম্ভিত ক’রে ভিতরে রয়েছে, এখন মানুষ হ’তে তার ভয় নেই; কিন্তু এই শঠ আমার কাছ থেকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি পাবে না। কৃষ্ণ বললেন, ভরত নন্দন, মায়ার দ্বারাই মায়াবীকে নষ্ট করতে হয়। আপনি কূট উপায়ে দুর্য্যোধনকে বধ করুন, এইরূপ উপায়েই দানবরাজ বলি বদ্ধ হয়েছিলেন এবং হিরণ্যকশিপু, বৃত্র রাবণ তারকাসুর সুন্দ-উপসুন্দ প্রভৃতি নিহত হয়েছিলেন।
যুধিষ্ঠির সহাস্যে জলস্থ দুর্য্যোধনকে বললেন, সুযোধন, ওঠ, আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। তোমার দর্প আর মান কোথায় গেল? যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা সজ্জনের ধৰ্ম্ম নয়, স্বর্গপ্রদও নয়। তুমি পুত্ৰ ভ্রাতা ও পিতৃগণকে নিপাতিত দেখেও যুদ্ধ শেষ না ক’রে নিজে বাঁচতে চাও কেন? বৎস, তুমি আত্মীয় বয়স্য ও বান্ধবগণকে বিনষ্ট করিয়ে হ্রদের মধ্যে লুকিয়ে আছ কেন? দুর্ব্বুদ্ধি, তুমি বীর নও তথাপি মিথ্যা বীরত্বের অভিমান কর। ওঠ, ভয় ত্যাগ ক’রে যুদ্ধ কর; আমাদের পরাজিত ক’রে পৃথিবী শাসন কর, অথবা নিহত হয়ে ভূমিতে শয়ন কর।
দুর্য্যোধন জলের মধ্যে থেকে উত্তর দিলেন, মহারাজ, প্রাণিগণ ভয়ে অভিভূত হয় তা বিচিত্র নয়, কিন্তু আমি প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসি নি। আমার রথ নেই, তূণ নেই, আমার পার্শ্বরক্ষী সারথি নিহত হয়েছে, আমি সহায়হীন একাকী, অত্যন্ত ক্লান্ত হ’য়ে বিশ্রামের জন্য জলমধ্যে আশ্রয় নিয়েছি। কুন্তীপুত্ৰ, আপনারা আশ্বস্ত হ’ন, আমি উঠে আপনাদের সকলের সঙ্গেই যুদ্ধ করব।
যুধিষ্ঠির বললেন, সুযোধন, আমরা আশ্বস্তই আছি। বহুক্ষণ তোমার অন্বেষণ করেছি, এখন জল থেকে উঠে যুদ্ধ কর। দুর্য্যোধন বললেন, মহারাজ, যাঁদের জন্য কুরুরাজ্য আমার কাম্য, আমার সেই ভ্রাতারা সকলেই পরলোকে গেছেন; আমাদের ধনরত্নের ক্ষয় হয়েছে, ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠগণ নিহত হয়েছেন, আমি বিধবা নারীর তুল্য এই পৃথিবী ভোগ করতে ইচ্ছা করি না। তথাপি আমি পাণ্ডব ও পাঞ্চালদের উৎসাহ ভঙ্গ ক’রে আপনাকে জয় করবার আশা করি। কিন্তু পিতামহ ভীষ্মের পতন ও দ্রোণ-কর্ণের নিধনের পর আর যুদ্ধের প্রয়োজন দেখি না। আমার পক্ষের সকলেই বিনষ্ট হয়েছে, আমার আর রাজ্যের স্পৃহা নেই, আমি দুই খণ্ড মৃগচর্ম্ম পরে বনে যাব। মহারাজ, আপনি এই রিক্ত পৃথিবী যথাসুখে ভোগ করুন।
দুর্য্যোধনের করুণ বাক্য শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, বৎস, মাংসাশী পক্ষীর রবের ন্যায় তোমার এই আর্তপ্রলাপ আমার ভাল লাগছে না। তুমি সমস্ত পৃথিবী দান করলেও আমি নিতে চাই না, তোমাকে যুদ্ধে পরাজিত ক’রেই আমি এই বসুধা ভোগ করতে ইচ্ছা করি। তুমি এখন রাজ্যের অধীশ্বর নও, তবে দান করতে চাচ্ছ কেন? যখন আমরা ধর্ম্মানুসারে শান্তিকামনায় রাজ্য চেয়েছিলাম তখন দাও নি কেন? মহাবল কৃষ্ণ যখন সন্ধির প্রার্থনা করেছিলেন তখন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে, এখন তোমার চিত্তবিভ্রম হ’ল কেন? সূচীর অগ্রে যেটুকু ভূমি ধরে তাও তুমি দিতে চাও নি, এখন সমস্ত পৃথিবী ছেড়ে দিচ্ছ কেন? পাপী, তোমার জীবন এখন আমার হাতে। তুমি আমাদের বহু অনিষ্ট করেছ, তুমি জীবনধারণের যোগ্য নও; এখন উঠে যুদ্ধ কর।