শল্যপর্ব: ৮। গদাযুদ্ধের উপক্রম

দুর্য্যোধন পূর্ব্বে কখনও ভর্ৎসনা শোনেন নি, সকলের কাছেই তিনি রাজসম্মান পেতেন। ছত্রের ছায়া এবং সূর্য্যের অল্প কিরণেও যাঁর কষ্ট হ’ত, সমস্ত লোক যাঁর প্রসাদের উপর নির্ভর করত, এখন অসহায় সঙ্কটপন্ন অবস্থায় তাঁকে যুধিষ্ঠিরের কটুবাক্য শুনতে হ’ল। দুর্য্যোধন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে হাত নেড়ে বললেন, রাজা, আপনাদের সুহৃৎ রথ বাহন সবই আছে; আমি একাকী, শোকার্ত, রথবাহনহীন। আপনারা সশস্ত্র, রথারোহী এবং বহু; যদি আপনারা সকলে আমাকে বেষ্টন করেন তবে নিরস্ত্র পাদচারী একাকী আমি কি ক’রে যুদ্ধ করব? আপনারা একে একে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করুন। রাত্রিশেষে সূর্য যেমন সমস্ত নক্ষত্র বিনষ্ট করেন, আমিও সেইরূপ নিরস্ত্র ও রথহীন হয়েও নিজের তেজে রথ ও অশ্ব সমেত আপনাদের সকলকেই বিনষ্ট করব।

যুধিষ্ঠির বললেন, মহাবাহু, সুযোধন, ভাগ্যক্রমে তুমি ক্ষত্রধর্ম্ম বুঝেছ এবং তোমার যুদ্ধে মতি হয়েছে। তুমি বীর এবং যুদ্ধ করতেও জান। মনোমত অস্ত্র নিয়ে তুমি আমাদের এক এক জনের সঙ্গেই যুদ্ধ কর, আমরা আর সকলে দর্শক হয়ে থাকব। আমি তোমার ইষ্টের জন্য আরও বলছি, তুমি আমাদের মধ্যে কেবল একজনকে বধ করলেই কুরুরাজ্য লাভ করবে; আর যদি নিহত হও তবে স্বর্গে যাবে। দুর্যোধন বললেন, একজন বীরই আমাকে দিন; আমি এই গদা নিলাম, আমার প্রতিদ্বন্দ্বীও গদা নিয়ে পাদচারী হয়ে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করুন।

উত্তম অশ্ব যেমন কশাঘাত সইতে পারে না দুর্যোধন সেইরূপ যুধিষ্ঠিরের বাক্যে বার বার আহত হয়ে অসহিষ্ণু হলেন। তিনি জল আলোড়িত ক’রে নাগরাজের ন্যায় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে কাঞ্চনবলয়মণ্ডিত বৃহৎ লৌহগদা নিয়ে হ্রদ থেকে উঠলেন। বজ্রধর ইন্দ্রের ন্যায় এবং শূলপাণি মহাদেবের ন্যায় দুর্যোধনকে দেখে পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ হৃষ্ট হয়ে করতালি দিতে লাগলেন। উপহাস মনে ক’রে দুর্যোধন সক্রোধে ওষ্ঠদংশন ক’রে বললেন, পাণ্ডবগণ, তোমরা শীঘ্রই এই উপহাসের প্রতিফল পাবে, পাঞ্চালদের সঙ্গে সদ্য যমালয়ে যাবে।

তার পর রক্তাস্যদেহ দুর্যোধন মেঘমন্দ্রস্বরে বললেন, যুধিষ্ঠির, আমি অবশ্যই আপনাদের সকলের সঙ্গে যুদ্ধ করব, কিন্তু আপনি জানেন যে একজনের সঙ্গে এককালে বহুলোকের যুদ্ধ উচিত নয়। যুধিষ্ঠির বললেন, সুযোধন, যখন অনেক মহারথ মিলে অভিমন্যুকে বধ করেছিলে তখন তোমার এই বুদ্ধি হয় নি কেন? লোকে বিপদে পড়লেই ধর্মের সন্ধান করে, কিন্তু সম্পদের সময় তারা পরলোকের দ্বার রুদ্ধ দেখে। বীর, তুমি বর্ম ধারণ কর, কেশ বন্ধন কর, যুদ্ধের যে উপকরণ তোমার নেই তাও নাও। আমি পুনর্বার বলছি, পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে যাঁর সঙ্গে তোমার ইচ্ছা তাঁরই সঙ্গে যুদ্ধ কর; তাঁকে বধ ক’রে কুরুরাজ্যের অধিপতি হও, অথবা নিহত হয়ে স্বর্গে যাও। তোমার জীবনরক্ষা ভিন্ন আর কি প্রিয়কার্য করব বল।

দুর্যোধন স্বর্ণময় বর্ম ও বিচিত্র শিরস্ত্রাণ ধারণ ক’রে গদাহস্তে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, দুর্যোধন যদি আপনার সঙ্গে অথবা অর্জুন নকুল বা সহদেবের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চান তবে কি হবে? আপনি কেন এই দুঃসাহসের কথা বললেন — ‘আমাদের মধ্যে একজনকে বধ ক’রেই কুরুরাজ্যের অধিপতি হও’? ভীমসেনকে বধ করার ইচ্ছায় দুর্যোধন তের বৎসর একটা লৌহমূর্তির উপর গদাপ্রহার অভ্যাস করেছেন। ভীমসেন ভিন্ন দুর্যোধনের প্রতিযোদ্ধা দেখছি না, কিন্তু ভীমও গদাযুদ্ধশিক্ষায় অধিক পরিশ্রম করেন নি। আপনি শকুনির সঙ্গে দ্যুতক্রীড়া ক’রে যেমন বিষম কার্য করেছিলেন, আজও সেইরূপ করছেন। ভীম অধিকতর বলবান ও সহিষ্ণু, কিন্তু দুর্যোধন অধিকতর কৃতী; বলবান অপেক্ষা কৃতীই শ্রেষ্ঠ। মহারাজ, আপনি শত্রুকে সুবিধা দিয়েছেন, আমাদের বিপদে ফেলেছেন। গদাহস্ত দুর্যোধনকে জয় করতে পারেন এমন মানুষ বা দেবতা আমি দেখি না। আপনারা কেউ ন্যায়যুদ্ধে দুর্যোধনকে জয় করতে পারবেন না। পাণ্ডু ও কুন্তীর পুত্রগণ নিশ্চয়ই রাজ্যভোগের জন্য সৃষ্ট হন নি, দীর্ঘকাল বনবাস ও ভিক্ষার জন্যই সৃষ্ট হয়েছেন।

ভীম বললেন, মধুসূদন, তুমি বিষণ্ণ হয়ো না, আজ আমি দুর্যোধনকে বধ করব তাতে সন্দেহ নেই। আমার গদা দুর্যোধনের গদার চেয়ে দেড় গুণ ভারী, অতএব তুমি দুঃখ ক'রো না। দুর্যোধনের কথা দূরে থাক, আমি দেবগণ এবং দ্বিলোকের সকলের সঙ্গেই যুদ্ধ করতে পারি। বাসুদেব হৃষ্ট হয়ে বললেন, মহাবাহু, আপনাকে আশ্রয় ক'রেই ধর্মরাজ শত্রুহীন হয়ে রাজলক্ষ্মী লাভ করবেন তাতে সন্দেহ নেই। বিষ্ণু যেমন দানবসংহার ক'রে শচীপতি ইন্দ্রকে স্বর্গরাজ্য দিয়েছিলেন, আপনিও সেইরূপ দুর্যোধনকে বধ ক'রে ধর্মরাজকে সসাগরা পৃথিবী দিন।

ভীম গদাহস্তে দণ্ডায়মান হয়ে দুর্যোধনকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন। মত্ত হস্তী যেমন মত্ত হস্তীর অভিমুখে যায়, দুর্যোধন সেইরূপ ভীমের কাছে গেলেন। ভীম তাঁকে বললেন, রাজা ধৃতরাষ্ট্র আর তুমি যেসব দুষ্কৃত করেছ তা এখন স্মরণ কর। দুরাত্মা, তুমি সভামধ্যে রজস্বলা দ্রৌপদীকে কষ্ট দিয়েছিলে, শকুনির বুদ্ধিতে যুধিষ্ঠিরকে দ্যূতক্রীড়ায় জয় করেছিলে, নিরপরাধ পাণ্ডবদের প্রতি বহু দুর্ব্যবহার করেছিলে, তার মহৎ ফল এখন দেখ। তোমার জন্যই আমাদের পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় পড়ে আছেন, দ্রোণ কর্ণ শল্য শকুনি, তোমার বীর ভ্রাতা ও পুত্রেরা, এবং তোমার পক্ষের রাজারা সসৈন্যে নিহত হয়েছেন। কুলঘ্ন পুত্রাধম একমাত্র তুমিই এখন অবশিষ্ট আছ, আজ তোমাকে গদাঘাতে বধ করব তাতে সন্দেহ নেই।

দুর্যোধন বললেন, বৃকোদর, আত্মশ্লাঘা ক'রে কি হবে, আমার সঙ্গে যুদ্ধ কর, তোমার যুদ্ধপ্রীতি আজ দূর করব। পাপী, কোন্ শত্রু আজ ন্যায়যুদ্ধে আমাকে জয় করতে পারবে? ইন্দ্রও পারবেন না। কুন্তীপুত্র, শরৎকালীন মেঘের ন্যায় বৃথা গর্জন ক'রো না, তোমার যত বল আছে তা আজ যুদ্ধে দেখাও।

এই সময়ে হলায়ুধ বলরাম সেখানে উপস্থিত হলেন; তিনি সংবাদ পেয়েছিলেন যে দুর্যোধন ও ভীম যুদ্ধে উদ্যত হয়েছেন। কৃষ্ণ ও পাণ্ডবগণ তাঁকে যথাবিধি অর্চনা ক'রে বললেন, আপনি আপনার দুই শিষ্যের যুদ্ধকৌশল দেখুন। বলরাম বললেন, কৃষ্ণ, আমি পুষ্যা নক্ষত্রে দ্বারকা ত্যাগ করেছি, তার পর বিয়াল্লিশ দিন গত হয়েছে, এখন শ্রবণ নক্ষত্রে এখানে এসেছি। এই ব'লে নীলবসন শুভ্রকান্তি বলরাম সকলকে যথাযোগ্য সম্মাননা আলিঙ্গন ও কুশলপ্রশ্ন ক’রে যুদ্ধ দেখবার জন্য উপবিষ্ট হলেন।