শল্যপর্ব: ৯। বলরামের তীর্থভ্রমণ — চ্যবনের যজ্ঞ — একত স্থিত ত্রিত

জনমেজয় বৈশম্পায়নকে বললেন, বলরাম পূর্বে কৃষ্ণকে বলেছিলেন যে তিনি ধৃতরাষ্ট্রপুত্রে বা পাণ্ডুপুত্রে কাউকেও সাহায্য করবেন না, ইচ্ছানুসারে দেশভ্রমণ করবেন; তবে আবার তিনি কুরুক্ষেত্রে কেন এলেন?

বৈশম্পায়ন বললেন, কৃতবর্মা যখন যাদবসৈন্য নিয়ে দুর্যোধনের পক্ষে গেলেন এবং কৃষ্ণ ও সাত্যকি পাণ্ডবপক্ষে গেলেন, তখন বলরাম ক্রুদ্ধ হয়ে তীর্থযাত্রায় নির্গত হলেন। তিনি বহু সুবর্ণ রজত বস্ত্র অশ্ব হস্তী রথ গর্দভ উষ্ট্র প্রভৃতি সঙ্গে নিলেন, ঋত্বিক ও ব্রাহ্মণগণও তাঁর সঙ্গে যাত্রা করলেন। বলরাম সমুদ্র থেকে সরস্বতী নদীর স্রোতের বিপরীত দিকে যেতে লাগলেন এবং দেশে দেশে শ্রান্ত ও ক্লান্ত, শিশু ও বৃদ্ধ বহু লোককে এবং ব্রাহ্মণগণকে খাদ্য পানীয় ধনরত্ন ধেনু যানবাহন প্রভৃতি দান করলেন।

বলরাম প্রথমে পবিত্র প্রভাসতীর্থে গেলেন। পুরাকালে প্রজাপতি দক্ষ চন্দ্রকে তাঁর সাতাশ কন্যা (নক্ষত্র) দান করেছিলেন। এই কন্যারা সকলেই অতুলনীয় রূপবতী ছিলেন, কিন্তু চন্দ্র সর্বদা রোহিণীর সঙ্গেই বাস করতেন। দক্ষের অন্য কন্যারা রুষ্ট হয়ে দক্ষের কাছে অভিযোগ করলেন। দক্ষ বহু বার চন্দ্রকে বললেন, তুমি সকল ভার্যার সহিত সমান ব্যবহার করবে; কিন্তু চন্দ্র তা শুনলেন না। তখন দক্ষের অভিশাপে চন্দ্র যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হলেন। চন্দ্রের ক্ষয় দেখে দেবতারা দক্ষকে বললেন, ভগবান, প্রসন্ন হ’ন, আপনার শাপে চন্দ্র ক্ষীণ হচ্ছেন, তার ফলে লতা ওষধি বীজ এবং প্রজাগণও ক্ষীণ হচ্ছে, আমরাও ক্ষীণ হচ্ছি। দক্ষ বললেন, আমার বাক্যের প্রত্যাহার হবে না। চন্দ্র সকল ভার্যার সঙ্গে সমান ব্যবহার করুন, সরস্বতী নদীর প্রধান তীর্থ প্রভাসে অবগাহন করুন, তার পর পুনর্বার বৃদ্ধিলাভ করবেন; কিন্তু মাসার্ধকাল তাঁর নিত্য ক্ষয় হবে এবং মাসার্ধকাল নিত্য বৃদ্ধি হবে। চন্দ্র পশ্চিম সমুদ্রে সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে গিয়ে বিভুর আরাধনা করুন তা হলে কান্তি ফিরে পাবেন। চন্দ্র প্রভাসতীর্থে গেলেন এবং অমাবস্যায় অবগাহন করে ক্রমশ তাঁর শীতল কিরণ ফিরে পেলেন। তদবধি তিনি প্রতি অমাবস্যায় প্রভাসতীর্থে স্নান ক’রে বর্ধিত হন। চন্দ্র সেখানে প্রভা লাভ করেছিলেন এজন্যই ‘প্রভাস’ নাম।

তার পর বলরাম ক্রমশ উদপানতীর্থে গেলেন। সত্যযুগে সেখানে গৌতমের তিন পুত্র একত দ্ব্বিত ও ত্রিত বাস করতেন। তাঁরা স্থির করলেন যে তাঁদের যজমানদের কাছ থেকে বহু পশু সংগ্রহ করবেন এবং মহাফলপ্রদ যজ্ঞ ক’রে আনন্দে সোমরস পান করবেন। তিন ভ্রাতা বহু পশু লাভ ক’রে ফিরলেন, ত্রিত আগে আগে এবং একত ও দ্ব্বিত পশুর দল নিয়ে পিছনে চললেন। দুষ্টবুদ্ধি একত ও দ্ব্বিত পরামর্শ করলেন, ত্রিত যজ্ঞনিপুণ ও বেদজ্ঞ, সে বহু পশু লাভ করতে পারবে; আমরা দুজনে এইসকল পশু নিয়ে চলে যাই, ত্রিত একাকী যেখানে ইচ্ছা হয় যাক। রাত্রিকালে চলতে চলতে ত্রিত এক বৃক (নেকড়ে) দেখতে পেলেন এবং ভীত হয়ে পালাতে গিয়ে সরস্বতীতীরবর্তী এক অগাধ কূপে প’ড়ে গেলেন। তিনি আর্তনাদ করতে লাগলেন, একত ও দ্ব্বিত শুনতে পেয়েও এলেন না, বৃকের ভয়ে এবং লোভের বশে পশু নিয়ে চ’লে গেলেন। ত্রিত দেখলেন, কূপের মধ্যে একটি লতা ঝুলছে। তিনি সেই লতাকে সোম, কূপের জলকে ঘৃত এবং কাঁকরকে শর্করা কল্পনা ক’রে যজ্ঞ করলেন। তাঁর উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে বৃহস্পতি দেবগণকে সঙ্গে নিয়ে কূপের নিকটে এলেন। দেবতারা বললেন, আমরা যজ্ঞের ভাগ নিতে এসেছি। ত্রিত যথাবিধি মন্ত্রপাঠ ক’রে যজ্ঞভাগ দিলেন। দেবগণ প্রীত হয়ে বর দিতে চাইলেন। ত্রিত বললেন, আপনারা আমাকে উদ্ধার করুন এবং এই বর দিন — যে এই কূপের জল স্পর্শ করবে সে সোমপায়ীদের গতি লাভ করবে। তখন কূপ থেকে ঊর্মিমতী সরস্বতী নদী উত্থিত হলেন, ত্রিত উৎক্ষিপ্ত হয়ে তীরে উঠে দেবগণের পূজা করলেন। তার পর তিনি তাঁর দুই লোভী ভ্রাতাকে শাপ দিলেন — তোমরা বৃকের ন্যায় দংষ্ট্রাযুক্ত ভীষণ পশু হবে, তোমাদের সন্তানগণ ভল্লুক ও বানর হবে।