শল্যপর্ব: ১০। অসিতদেবল ও জৈগীষব্য — সারস্বত
বলরাম সপ্তসারস্বত কপালমোচন প্রভৃতি সরস্বতীতীরস্থ বহু তীর্থ দর্শন ক’রে আদিত্যতীর্থে উপস্থিত হলেন। পুরাকালে তাপস অসিতদেবল গার্হস্থ্য ধর্ম আশ্রয় ক’রে সেখানে বাস করতেন। তিনি সর্ববিষয়ে সমদর্শী ছিলেন, নিত্য দেবতা ব্রাহ্মণ ও অতিথির পূজা করতেন এবং সর্বদা ব্রহ্মচর্য ও ধর্মকার্যে রত থাকতেন। একদা ভিক্ষু জৈগীষব্য মুনি দেবলের আশ্রমে এলেন এবং যোগনিরত হয়ে সেখানেই বাস করতে লাগলেন। তিনি কেবল ভোজনকালে দেবলের নিকট উপস্থিত হতেন। দীর্ঘকাল পরে একদিন দেবল জৈগীষব্যকে দেখতে পেলেন না। দেবল ভাবলেন, আমি বহু বৎসর এই অলস ভিক্ষুর সেবা করেছি, কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে কোনও আলাপ করেন নি। আকাশচারী দেবল একটি কলস নিয়ে মহাসমুদ্রে গেলেন এবং দেখলেন, জৈগীষব্য পূর্বেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। দেবল বিস্মিত হলেন এবং স্নানাদির পর জলপূর্ণ কলস নিয়ে আশ্রমে ফিরে এসে দেখলেন, জৈগীষব্য নীরবে কাষ্ঠের ন্যায় বসে আছেন। মনস্বী দেবল ভিক্ষু জৈগীষব্যের শক্তি পরীক্ষার জন্য আকাশে উঠলেন এবং দেখলেন, অন্তরীক্ষচারী সিদ্ধগণ জৈগীষব্যের পূজা করছেন। তার পর তিনি দেখলেন, জৈগীষব্য স্বর্গলোক পিতৃলোক যমলোক চন্দ্রলোক প্রভৃতি স্থানে এবং বহুবিধ যজ্ঞকারীদের লোকে গেলেন এবং অবশেষে অন্তর্হিত হলেন। দেবল জিজ্ঞাসা করলে সিদ্ধ যান্ত্রিকগণ বললেন, জৈগীষব্য শাশ্বত ব্রহ্মলোকে গেছেন, সেখানে তোমার যাবার শক্তি নেই। দেবল তাঁর আশ্রমে ফিরে এলেন এবং সেখানে জৈগীষব্যকে দেখলেন। দেবল বিনয়ে অবনত হয়ে সেই মহামুনিকে বললেন, ভগবান, আমি মোক্ষধর্ম শিখতে ইচ্ছা করি। জৈগীষব্য যোগের বিধি এবং শাস্ত্রানুযায়ী কার্যাকার্য সম্বন্ধে উপদেশ দিলেন। দেবল সন্ন্যাসগ্রহণের সংকল্প করলেন, তখন আশ্রমের সমস্ত প্রাণী, পিতৃগণ, এবং ফলমূল লতা প্রভৃতি সরোদনে বলতে লাগল, ক্ষুদ্র দুৰ্মতি দেবল সর্বভূতকে অভয় দিয়েছিল তা ভুলে গেছে, সে নিশ্চয় আমাদের ছেদন করবে। মুনিসত্তম দেবল ভাবতে লাগলেন, মোক্ষধর্ম আর গার্হস্থ্যধর্মের মধ্যে কোন্টি শ্রেয়স্কর; অবশেষে তিনি মোক্ষধর্মই গ্রহণ করে সিদ্ধিলাভ করলেন।
বৃহস্পতিকে পুরোবর্তী ক’রে দেবগণ ও তপস্বিগণ উপস্থিত হলেন এবং জৈগীষব্য ও দেবলের তপস্যার প্রশংসা করলেন। কিন্তু নারদ বললেন, জৈগীষব্যের তপস্যা বৃথা, কারণ তিনি তাঁর শক্তি দেখিয়ে দেবলকে বিস্মিত করেছেন। দেবতারা বললেন, দেবর্ষি, এমন কথা বলবেন না, মহাত্মা জৈগীষব্যের তুল্য প্রভাব তপস্যা ও যোগসিদ্ধি আর কারও নেই।
তার পর বলরাম সোমতীর্থ দেখে সারস্বত মুনির তীর্থে গেলেন।
পুরাকালে সরস্বতীতীরে তপস্যারত দধীচি মুনি অলম্বুষা অপ্সরাকে দেখে বিচলিত হন, তার ফলে সরস্বতী নদীর গর্ভে তাঁর একটি পুত্র উৎপন্ন হয়। প্রসবের পর সরস্বতী দধীচিকে সেই পুত্র দান করলেন। দধীচি তুষ্ট হয়ে সরস্বতীকে বর দিলেন, তোমার জলে তর্পণ করলে দেবগণ পিতৃগণ গন্ধর্বগণ ও অপ্সরোগণ তৃপ্ত হবেন এবং সমস্ত পুণ্যনদীর মধ্যে তুমি পুণ্যাত্মা হবে। দধীচি তাঁর পুত্রের নাম রাখলেন সারস্বত। এই সময়ে দেবদানবের বিরোধ চলছিল। দধীচি দেবগণের হিতার্থে প্রাণত্যাগ ক’রে তাঁর অস্থি দান করলেন, তাতে বজ্র চক্র গদা প্রভৃতি দিব্যাস্ত্র নির্ম্মিত হ’ল এবং ইন্দ্র বজ্রাঘাতে দানবগণকে জয় করলেন।
কিছুকাল পরে দ্বাদশবর্ষব্যাপী ভয়ংকর অনাবৃষ্টি হ’ল, মহর্ষিগণ ক্ষুধার্ত হয়ে প্রাণরক্ষার জন্য নানাদিকে ধাবিত হলেন। সারস্বত মুনিও যাবার ইচ্ছা করলেন, কিন্তু সরস্বতী তাঁকে বললেন, পুত্র, যেয়ো না, তোমার আহারের জন্য আমি উত্তম মৎস্য দেব। সারস্বত তাঁর আশ্রমেই রইলেন এবং মৎস্যভোজনে প্রাণধারণ করে দেবতা ও পিতৃগণের তর্পণ এবং বেদচর্চ্চা করতে লাগলেন। অনাবৃষ্টি অতীত হ’লে মহর্ষিগণ দেখলেন তাঁরা বেদবিদ্যা ভুলে গেছেন। তাঁরা সারস্বত মুনির কাছে গিয়ে বললেন, আমাদের বেদ পড়াও। সারস্বত বললেন, আপনারা যথাবিধি আমার শিষ্য হ’ন। মহর্ষিরা বললেন, পুত্র, তুমি তো বালক। সারস্বত বললেন, যাঁরা অবিধিপূর্ব্বক অধ্যয়ন ও অধ্যাপন করেন তাঁরা উভয়েই পতিত এবং পরস্পরের শত্রু হন। বয়স পক্ককেশ বিত্ত বা বন্ধুবাহুল্য থাকলেই লোকে বড় হয় না, যিনি বেদজ্ঞ তিনিই গুরু হবার যোগ্য। তখন ষাট হাজার মুনি সারস্বতের শিষ্যত্ব স্বীকার করলেন।