শল্যপর্ব: ১১। বৃষকন্যা সুভ্রূ — কুরুক্ষেত্র ও সমন্তপঞ্চক

তার পর বলরাম বৃদ্ধকন্যায়শ্রম তীর্থে এলেন। কুণীগর্গ নামে এক মহাতপা ঋষি ছিলেন, তিনি সুভ্রূ নামে এক মানসী কন্যা উৎপন্ন করেছিলেন। কুণীগর্গ দেহত্যাগ করলে অনিন্দিতা সুন্দরী সুভ্রূ আশ্রম নির্মাণ ক’রে কঠোর তপস্যা করতে লাগলেন। বহু কাল পরে তিনি নিজেকে কৃতার্থ মনে করলেন, কিন্তু বার্ধক্য ও তপস্যার জন্য তিনি এমন কৃশ হয়ে গিয়েছিলেন যে এক পাও চলতে পারতেন না। তখন তিনি পরলোকগমনের ইচ্ছা করলেন। নারদ তাঁর কাছে এসে বললেন, অবিবাহিতা কন্যার স্বর্গলাভ কি ক’রে হবে? তুমি কঠোর তপস্যা করেছ কিন্তু স্বর্গলোকের অধিকার পাও নি। সুভ্রূ ঋষিগণের কাছে গিয়ে বললেন, যিনি আমার পাণিগ্রহণ করবেন তাঁকে আমার তপস্যার অর্ধভাগ দান করব। গালবের পুত্র প্রাতঃশৃঙ্গবান বললেন, সুন্দরী, তুমি যদি আমার সঙ্গে এক রাত্রি বাস কর তবে তোমার পাণিগ্রহণ করব। সুভ্রূ সম্মত হ'লে গালবপুত্র যথাবিধি হোম ক'রে তাঁকে বিবাহ করলেন। সুভ্রূ দিব্যাভরণভূষিতা দিব্যমাল্যাধারিণী বরবর্ণিনী তরুণী হয়ে পতির সহিত রাত্রিবাস করলেন। প্রভাতকালে তিনি বললেন, ব্রাহ্মণ, তুমি যে নিয়ম (শর্ত) করেছিলে তা আমি পালন করেছি; তোমার মঙ্গল হ'ক, এখন আমি যাব। গালবপুত্র সম্মতি দিলে সুভ্রূ আবার বললেন, এই তীর্থে যে দেবগণের তর্পণ ক'রে একরাত্রি বাস করবে সে আষ্টম বৎসর ব্রহ্মচর্য পালনের ফল লাভ করবে। এই ব'লে সাধ্বী সুভ্রূ দেহত্যাগ ক'রে স্বর্গে চ'লে গেলেন। গালবপুত্র তাঁর ভার্যার তপস্যার অর্ধভাগ পেয়েছিলেন; শোকে কাতর হয়ে তিনিও রূপবতী সুভ্রূর অনুসরণ করলেন।

তার পর বলরাম স্যমন্তপঞ্চকে এলেন। ঋষিরা তাঁকে কুরুক্ষেত্রের এই ইতিহাস বললেন।—পুরাকালে রাজর্ষি কুরু সেই স্থান সর্বদা কর্ষণ করেন দেখে ইন্দ্র তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, রাজা, একি করছ? কুরু বললেন, এই ক্ষেত্রে যে মরবে সে পাপশূন্য পুণ্যময় লোকে যাবে। ইন্দ্র উপহাস ক'রে চলে গেলেন এবং তার পর বহুবার এসে পূর্বের ন্যায় প্রশ্ন ও উপহাস করতে লাগলেন। দেবতারা ইন্দ্রকে বললেন, রাজর্ষি কুরুকে বর দিয়ে নিবৃত্ত করুন; মানুষ যদি কুরুক্ষেত্রে মরলেই স্বর্গে যেতে পারে তবে আমরা আর যজ্ঞভাগ পাব না। ইন্দ্র কুরুর কাছে এসে বললেন, রাজা, আর পরিশ্রম ক'রো না, আমার কথা শোন। যে লোক এখানে উপবাস ক'রে প্রাণত্যাগ করবে অথবা যুদ্ধে নিহত হবে সে স্বর্গে যাবে। কুরু বললেন, তাই হ'ক।

ঋষিরা বলরামকে আরও বললেন, ব্রহ্মাদি সুরশ্রেষ্ঠগণ এবং পুণ্যবান রাজর্ষিগণের মতে কুরুক্ষেত্র অপেক্ষা পুণ্যস্থান পৃথিবীতে নেই। দেবরাজ ইন্দ্র এই গাথা গান করেছিলেন—কুরুক্ষেত্রে যে ধূলি ওড়ে তার স্পর্শে পাপীরা পরমগতি পায়। তরণ্তুক অরন্তুক রামহ্রদ ও চক্রুকের মধ্যস্থানকেই কুরুক্ষেত্রের স্যমন্তপঞ্চক ও প্রজাপতির উত্তরবেদী বলা হয়।

তার পর বলরাম হিমালয়ের নিকটস্থ তীর্থসকল দেখে মিত্রাবরুণের পুণ্যা আশ্রমে এলেন এবং সেখানে ঋষি ও সিদ্ধগণের নিকট বিবিধ পবিত্র উপাখ্যান শৃণলেন। সেই সময়ে জটামণ্ডলে আবৃত স্বর্ণকৌপীনধারী নৃত্যগীতকুশল কলহপ্রিয় দেবর্ষি নারদ কচ্ছপী বীণা নিয়ে উপস্থিত হলেন। বলরাম নারদের মুখে কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের বৃত্তান্ত এবং দুর্যোধন ও ভীমের আসন্ন যুদ্ধের সংবাদ শৃণলেন। তখন তিনি তাঁর অনুচরবর্গকে বিদায় দিয়ে বার বার পবিত্র সরস্বতী নদীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবং দুই শিষ্যের যুদ্ধ দেখবার জন্য সত্বর রথারোহণে দ্বৈপায়ন হ্রদের নিকট উপস্থিত হলেন।