শল্যপর্ব: ১২। দুর্য্যোধনের ঊরুভঙ্গ
(অষ্টাদশ দিনের যুদ্ধান্ত)
বলরাম যুধিষ্ঠিরকে বললেন, নৃশ্রেষ্ঠ, আমি ঋষিদের কাছে শৃণেছি যে কুরুক্ষেত্র অতি পুণ্যময় স্বর্গপ্রদ স্থান, সেখানে যাঁরা যুদ্ধে নিহত হন তাঁরা ইন্দ্রের সহিত স্বর্গে বাস করেন। অতএব এখান থেকে সমন্তপঞ্চকে (১) চলুন, সেই স্থান প্রজাপতির উত্তরবেদী ব'লে প্রসিদ্ধ। তখন যুধিষ্ঠিরাদি ও দুর্যোধন পদব্রজে গিয়ে সরস্বতীর দক্ষিণ তীরে একটি পবিত্র উন্মুক্ত স্থানে উপস্থিত হলেন।
অনন্তর দুর্যোধন ও ভীম পরস্পরকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন এবং দুই বৃষের ন্যায় গর্জন ক'রে উন্মত্তবৎ আস্ফালন করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ বাগ্যুদ্ধের পর তুমুল গদাযুদ্ধ আরম্ভ হ'ল। দুই বীর পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধান ক'রে প্রহার করতে লাগলেন। বিচিত্র গতিতে মণ্ডলাকারে ভ্রমণ ক'রে, এগিয়ে গিয়ে, পিছনে হটে, একবার নীচু হয়ে, একবার লাফিয়ে উঠে তাঁরা নানাপ্রকার যুদ্ধকৌশল দেখালেন। দুর্যোধন তাঁর গদা ঘুরিয়ে ভীমের মাথায় আঘাত করলেন; ভীম অবিচলিত থেকে প্রত্যাঘাত করলেন, কিন্তু দুর্যোধন ক্ষিপ্রগতিতে সরে গিয়ে ভীমের প্রহার ব্যর্থ ক'রে দিলেন। তার পর ভীম বক্ষে আহত হ'য়ে মূর্চ্ছিতপ্রায় হলেন এবং কিছুক্ষণ পরে প্রকৃতিস্থ হ'য়ে দুর্যোধনের পার্শ্বে প্রহার করলেন। দুর্যোধন বিহ্বল হয়ে হাঁটু গেড়ে ব'সে পড়লেন এবং আবার উঠে গদাঘাতে ভীমকে ভূপাতিত করলেন। ভীমের বর্ম বিদীর্ণ হ'ল; মুহূর্তকাল পরে তিনি দাঁড়িয়ে উঠে তাঁর রক্তাক্ত মুখ মূর্ছলেন। তখন নকুল সহদেব ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সাত্যকি দুর্যোধনের দিকে ধাবিত হলেন। ভীম তাঁদের নিবৃত্ত ক'রে পুনর্বার দুর্যোধনকে আক্রমণ করলেন।
যুদ্ধ ক্রমশ দারুণ হচ্ছে দেখে অর্জুন বললেন, জনার্দন, এই দুই বীরের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? কৃষ্ণ বললেন, এঁরা দুজনেই সমান শিক্ষা পেয়েছেন, কিন্তু ভীমসেন অধিক বলশালী এবং দুর্যোধন দক্ষতায় ও যত্নে শ্রেষ্ঠ। ভীম ন্যায়যুদ্ধে জয়লাভ করবেন না, অন্যায়যুদ্ধেই দুর্যোধনকে বধ করতে পারবেন। দ্যুতসভায় ভীম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে যুদ্ধে গদাঘাতে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করবেন; এখন সেই প্রতিজ্ঞা পালন করুন, মায়াবী দুর্যোধনকে মায়া (কপটতা) দ্বারাই বিনষ্ট করুন। ভীম যদি কেবল নিজের বলের উপর নির্ভর করে ন্যায়যুদ্ধ করেন তবে যুধিষ্ঠির বিপদে পড়বেন। ধর্মরাজের দোষে আবার আমরা সংকটে পড়েছি, বিজয়লাভ আসন্ন হয়েও সংশয়ের বিষয় হয়েছে। যুধিষ্ঠির নির্বোধের ন্যায় এই পণ করেছেন যে দুর্যোধন একজনকে বধ করতে পারলেই জয়ী হবেন। শুক্রাচার্যর রচিত একটি পুরাতন শ্লোক আছে — পরাজিত হতাবশিষ্ট যোদ্ধা যদি ফিরে আসে তবে তাকে ভয় করতে হবে, কারণ সে মরণ পণ ক'রে যুদ্ধ করবে।
অর্জুন তখন ভীমকে দেখিয়ে নিজের বাম উরুতে চপেটাঘাত করলেন। এই সময়ে ভীম ও দুর্যোধন দুজনেই পরিশ্রান্ত হয়েছিলেন। সহসা দুর্যোধনকে নিকটে পেয়ে ভীম মহাবেগে তাঁর গদা নিক্ষেপ করলেন, দুর্যোধন সত্বর সরে গিয়ে ভীমকে প্রহার করলেন। ভীম রুধিরাক্তদেহে কিছুক্ষণ মূর্ছিতের ন্যায় রইলেন, তাঁর পর আবার দুর্যোধনের প্রতি ধাবিত হলেন। ভীমের প্রহার ব্যর্থ করবার ইচ্ছায় দুর্যোধন লাফিয়ে উঠলেন, সেই অবসরে ভীম সিংহের ন্যায় গর্জন ক'রে গদাঘাতে দুর্যোধনের দুই ঊরু ভঙ্গ করলেন।
দুর্যোধন সশব্দে ভূতলে নিপতিত হলেন। তখন ধুলিবৃষ্টি রক্তবৃষ্টি ও উল্কাপাত হ'ল, যক্ষ রাক্ষস ও পিশাচগণ অন্তরীক্ষে কোলাহল ক'রে উঠল, ঘোরদর্শন কবন্ধসকল নৃত্য করতে লাগল। ভূপতিত শত্রুকে ভর্ৎসনা ক'রে ভীম বললেন, আমাদের শঠতা দ্যূতক্রীড়া বা বঞ্চনা নেই, আমরা আগুন লাগাই না, নিজের বাহু-বলেই শত্রু বধ করি। তার পর ভীম তাঁর বাঁ পা দিয়ে দুর্যোধনের মাথা মাড়িয়ে তাঁকে শঠ ব'লে তিরস্কার করলেন।
ক্ষুদ্রচেতা ভীমের আচরণে সোমকবীরগণ অসন্তুষ্ট হলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ভীম, তুমি সৎ বা অসৎ উপায়ে শত্রুতার প্রতিশোধ নিয়েছ, প্রতিজ্ঞাও পূর্ণ করেছ, এখন ক্ষান্ত হও। রাজা দুর্যোধন এখন হতপ্রায়, ইনি একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা ও কৌরবগণের অধিপতি, তোমার জ্ঞাতি, তুমি চরণ দিয়ে একে স্পর্শ ক'রো না। এর জন্য শোক করাই উচিত, উপহাস উচিত নয়। এর অমাত্য ভ্রাতা ও পুত্রগণ নিহত হয়েছেন, পিণ্ডলোপ হয়েছে; ইনি তোমার ভ্রাতা, একে পদাঘাত করে তুমি অন্যায় করেছ। তার পর যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের কাছে গিয়ে সাস্রুকণ্ঠে বললেন, বৎস, দুঃখ ক'রো না, তুমি পূর্ব্বকৃত কর্ম্মের এই দারুণ ফল ভোগ করছ। তোমারই অপরাধে আমরা তোমার ভ্রাতা ও জ্ঞাতিদের বধ করেছি। তুমি নিজের জন্য শোক ক'রো না, তুমি শ্লাঘ্য মৃত্যু লাভ করেছ; আমাদের অবস্থাই এখন শোচনীয় হয়েছে, কারণ প্রিয় বন্ধুদের হারিয়ে দীনভাবে জীবনযাপন করতে হবে। শোকাকুলা বিধবা বধূদের আমি কি ক'রে দেখব? রাজা, তুমি নিশ্চয় স্বর্গে বাস করবে, কিন্তু আমরা নারকী আখ্যা পেয়ে দারুণ দুঃখ ভোগ করব।