শান্তিপর্ব: ৮। রাজার মিত্র — দণ্ডবিধি — রাজকর — বৃদ্ধিনীতি
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, অন্যের সাহায্য না নিয়ে রাজকার্য সম্পাদন করা অসম্ভব। রাজার সচিব কিপ্রকার হবেন? কিপ্রকার লোককে রাজা বিশ্বাস করবেন?
ভীষ্ম বললেন, রাজার মিত্র চতুর্বিধ— সমার্থ (যার স্বার্থ রাজার স্বার্থের সমান), ভজমান (অনুগত), সহজ (আত্মীয়) এবং কৃত্রিম (অর্থ দ্বারা বশীভূত)। এ ভিন্ন রাজার পঞ্চম মিত্র — ধর্মাত্মা; তিনি যে পক্ষে ধর্ম দেখেন সেই পক্ষেরই সহায় হন, সংশয়স্থলে নিরপেক্ষ থাকেন। বিজয়লাভের জন্য রাজা ধর্ম ও অধর্ম দুইই অবলম্বন করেন; তাঁর যে সংকল্প ধর্মবিরুদ্ধ তা ধর্মাত্মা মিত্রের নিকট প্রকাশ করবেন না। পূর্বোক্ত চতুর্বিধ মিত্রের মধ্যে ভজমান ও সহজই শ্রেষ্ঠ, অপর দুজন আশঙ্কার পাত্র। একই কার্যের জন্য দু-তিন জনকে মন্ত্রী করা উচিত নয়, তাঁরা পরস্পরকে সইতে পারবেন না।
কোনও রাজকর্মচারী যদি রাজধন চুরি করে, তবে যে লোক তা জানাবে তাকে রাজা রক্ষা করবেন, নতুবা চোর-কর্মচারী তাকে বিনষ্ট করবে। যিনি লজ্জাশীল ইন্দ্রিয়জয়ী সত্যবাদী সরল ও উচিতবক্তা, এমন লোকই সভাসদ হবার যোগ্য। সদ্বংশজাত বুদ্ধিমান রূপবান চতুর ও অনুরক্ত লোককে তোমার পরিজন নিযুক্ত করবে। অপরাধীকে তার অপরাধ অনুসারে দণ্ড দেবে, ধনীর অর্থদণ্ড করবে এবং নির্ধনকে কারাদণ্ড দেবে। দুর্বৃত্তগণকে প্রহার করে দমন করবে এবং সজ্জনকে মিষ্ট বাক্যে এবং উপহার দিয়ে পালন করবে। রাজা সকলেরই বিশ্বাস জন্মাবেন, কিন্তু নিজে কাকেও বিশ্বাস করবেন না, পুত্রকেও নয়।
রাজা ছয় প্রকার দুর্গের আশ্রয়ে নগর স্থাপন করবেন — মরু দুর্গ মহীদুর্গ গিরিদুর্গ মনুষ্যদুর্গ মৃদ্দুর্গ ও বনদুর্গ। প্রত্যেক গ্রামের একজন অধিপতি থাকবেন, তাঁর উপরে দশ গ্রামের এক অধিপতি, তাঁর উপরে বিশ গ্রামের, শত গ্রামের এবং সহস্র গ্রামের এক এক জন অধিপতি থাকবেন। এঁরা সকলেই নিজ নিজ অধিকারে উৎপন্ন খাদ্যের উপযুক্ত অংশ পাবেন। রাজা নানাবিধ কর আদায় করবেন, কিন্তু করভারে প্রজাদের অবসন্ন করবেন না। ইঁদুর যেমন ধারাল দাঁত দিয়ে ঘুমন্ত লোকের পায়ের মাংস কুরে কুরে খায়, পা নাড়লেও ছাড়ে না, রাজা সেইরূপ প্রজার কাছ থেকে ধীরে ধীরে কর আদায় করবেন। যদি শত্রুর আক্রমণের ভয় উপস্থিত হয় তবে রাজা সেই ভয়ের বিষয় প্রজাদের জানিয়ে বলবেন, ‘তোমাদের রক্ষার জন্য আমি ধন প্রার্থনা করছি, ভয় দূর হলে এই ধন ফিরিয়ে দেব; শত্রু যদি তোমাদের ধন কেড়ে নেয় তবে তা আর ফিরে পাবে না। তোমরা স্ত্রীপুত্রের জন্যই ধনসঞ্চয় করে থাক, কিন্তু সেই স্ত্রীপুত্রই এখন বিনষ্ট হতে বসেছে; আপৎকালে ধনের মায়া করা উচিত নয়।'
ক্ষত্রিয় রাজা কর্মহীন বিপক্ষকে আক্রমণ করবেন না। তিনি শঠ যোদ্ধার সঙ্গে শঠতার দ্বারা এবং ধার্মিক যোদ্ধার সঙ্গে ধর্মানুসারে যুদ্ধ করবেন। ভীত বা বিজিত লোককে প্রহার করা উচিত নয়। বিষলিপ্ত বাণ বর্জনীয়, অসৎ লোকেই এরূপ অস্ত্র প্রয়োগ করে। যার অস্ত্র ভগ্ন হয়েছে বা বাহন হত হয়েছে, অথবা যে শরণাগত হয়েছে, তাকে বধ করবে না। আহত শত্রুর চিকিৎসা করবে অথবা তাকে নিজের গৃহে পাঠাবে। চিকিৎসার পর ক্ষত সেরে গেলে শত্রুকে মুক্তি দেবে।
চৈত্র বা অগ্রহায়ণ মাসেই সেনাসজ্জা করা প্রশস্ত; তখন শস্য পক্ক হয়, অধিক শীত বা গ্রীষ্ম থাকে না। বিপক্ষ বিপদগ্রস্ত হলে অন্য সময়েও সেনাসজ্জা করা যেতে পারে। বৃষ্টিহীন কালে রথঅশ্ববহুল সৈন্য এবং বর্ষাকালে পদাতি ও হস্তিবহুল সৈন্য প্রশস্ত। যদি শান্তিস্থাপন সাধ্য হয় তবে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া অনুচিত। সাম দান ও ভেদ নীতি অসম্ভব হলেই যুদ্ধ বিধেয়। যুদ্ধকালে রাজা বলবেন, 'আমার লোকেরা বিপক্ষসৈন্য বধ করছে তা আমার প্রিয়কার্য নয়, আহা, সকলেই বাঁচতে চায়।' শত্রুর সমক্ষে এইরূপ বলে রাজা গোপনে নিজের যোদ্ধাদের প্রশংসা করবেন, এতে হত ও হন্তা উভয়েরই সম্মান হবে।
বিজিগীষুর, আত্মকলহের ফলে গণভেদ(১) ও বংশনাশ হয়, রাজ্যের মূল উচ্ছিন্ন হয়, সেজন্য তার প্রতিবিধান করা আবশ্যক। এই আভ্যন্তরিক ভয়ের তুলনায় বাহ্য শত্রুর ভয় তুচ্ছ। স্বপক্ষের সংঘবদ্ধতাই রাজ্যরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়।