শান্তিপর্ব: ১০। আপদগ্রস্ত রাজা — তিন মৎস্যের উপাখ্যান

যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন, যে রাজা অলস ও দুর্ব্বল, যাঁর ধনাগার শূন্য, মন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে এবং অমাত্যেরা বিপক্ষের বশীভূত হয়েছে, তিনি অন্য রাজা কর্তৃক আক্রান্ত হ'লে কি করবেন?

ভীষ্ম বললেন, বিপক্ষ রাজা যদি ধাৰ্ম্মিক ও শুদ্ধস্বভাব হন তবে শীঘ্র সন্ধি করা উচিত। সন্ধি অসম্ভব হ'লে যুদ্ধই কৰ্ত্তব্য। সৈন্য যদি অনুরক্ত ও সন্তুষ্ট থাকে তবে অল্প সৈন্যেও পৃথিবী জয় করা যায়। যদি যুদ্ধ করা নিতান্ত অসম্ভব হয় তবে রাজা দুর্গ ত্যাগ ক'রে কিছুকাল অন্য দেশে থাকবেন এবং পরে উপযুক্ত মন্ত্রণা ক'রে পুনৰ্ব্বার নিজ রাজ্য অধিকার করবেন।

শাস্ত্রে আছে, আপদগ্রস্ত রাজা স্বরাজ্য ও পররাজ্য থেকে ধনসংগ্রহ করবেন এবং বিশেষত ধনী ও দণ্ডার্হ লোকের ধনই নেবেন। গ্রামবাসীরা যদি পরস্পরের নামে অভিযোগ করে তবে রাজা কাকেও পুরস্কার দেবেন না, তিরস্কারও করবেন না। কেবল সদুপায়ে বা কেবল নিষ্ঠুর উপায়ে ধনসংগ্রহ হয় না, মধ্যবর্তী উপায়ই প্রশস্ত। লোকে ধনহীন রাজাকে অবজ্ঞা করে। বস্ত্র যেমন নারীর লজ্জা আবরণ করে ধনও সেইরূপ রাজার সকল দোষ আবরণ করে। রাজা সর্বতোভাবে নিজের উন্নতির চেষ্টা করবেন, বরং ভগ্ন হবেন কিন্তু কখনও নত হবেন না। দস্যুরা যদি মর্যাদাযুক্ত (ভদ্রভাবাপন্ন) হয় তবে তাদের উচ্ছিন্ন না করে বশীভূত করাই উচিত। ক্ষত্রিয় রাজা দস্যু ও নিষ্ক্রিয় লোকের ধন হরণ করতে পারেন। যিনি অসাধু লোকের অর্থ নিয়ে সাধুদের পালন করেন তিনিই পূর্ণ ধর্মজ্ঞ।

যুধিষ্ঠির, কার্যাকার্যনির্ধারণ সম্বন্ধে আমি একটি উত্তম উপাখ্যান বলছি শোন। — কোনও জলাশয়ে তিনটি শকুল (শোল) মৎস্য বাস করত, তাদের নাম অনাগতবিধাতা(১), প্রত্যুৎপন্নমতি(২) ও দীর্ঘসূত্র(৩)। একদিন জেলেরা মাছ ধরবার জন্য সেই জলাশয় থেকে জল বার করে ফেলতে লাগল। ক্রমশ জল কমছে দেখে দীর্ঘদর্শী অনাগতবিধাতা তার দুই বন্ধুকে বললে, জলচরদের বিপদ উপস্থিত হয়েছে, পালাবার পথ বন্ধ হবার আগেই অন্য জলাশয়ে চল; যে উপযুক্ত উপায়ে অনাগত অনিষ্টের প্রতিবিধান করে সে বিপন্ন হয় না। দীর্ঘসূত্র বললে, তোমার কথা যথার্থ, কিন্তু কোনও বিষয়ে ত্বরান্বিত হওয়া উচিত নয়। প্রত্যুৎপন্নমতি বললে, কার্যকাল উপস্থিত হলে আমি কর্তব্যে অবহেলা করি না। তখন অনাগত-বিধাতা জলস্রোতে নির্গত হয়ে অন্য এক জলাশয়ে গেল। জল বেরিয়ে গেলে জেলেরা নানা উপায়ে সমস্ত মাছ ধরতে লাগল, অন্য মাছের সঙ্গে দীর্ঘসূত্র এবং প্রত্যুৎপন্নমতিও ধরা পড়ল। জেলেরা যখন সমস্ত মাছ দড়ি দিয়ে গাঁথছিল তখন প্রত্যুৎপন্নমতি দড়ি কামড়ে রইল, জেলেরা ভাবলে তাকেও গাঁথা হয়েছে। তার পর জেলেরা দড়িতে গাঁথা সমস্ত মাছ অন্য এক বৃহৎ জলাশয়ে ডুবিয়ে ধুতে লাগল, সেই সুযোগে প্রত্যুৎপন্নমতি পালিয়ে গেল। মন্দবুদ্ধি দীর্ঘসূত্র বিনষ্ট হ’ল।

(১) যে ভবিষ্যতের জন্য ব্যবস্থা করে বা প্রস্তুত থাকে।
(২) যে পূর্বে প্রস্তুত না থেকেও কার্যকালে বুদ্ধি খাটিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা করে।
(৩) যে কাজ করতে দেরি করে, অলস।

যুধিষ্ঠির, যে লোক মোহের বশে আসন্ন বিপদ বুঝতে পারে না সে দীর্ঘসূত্রের ন্যায় বিনষ্ট হয়। যে লোক নিজেকে চতুর মনে ক’রে পূর্বেই প্রস্তুত না হয় সে প্রত্যুৎপন্নমতির ন্যায় সংশয়াপন্ন থাকে। অনাগতবিধাতা ও প্রত্যুৎপন্নমতি উভয়ই সুখী হ'তে পারে, কিন্তু দীর্ঘসূত্র বিনষ্ট হয়। যাঁরা বিচার ক'রে যুক্তি অনুসারে কার্য সম্পাদন করেন তাঁরাই সম্যক ফললাভ করেন।