শান্তিপর্ব: ১৬। অজগরব্রত — কামনাত্যাগ
ভীষ্ম বললেন, শম্পাক নামে এক ব্রাহ্মণ তাঁর পত্নীর আচরণে এবং অন্নবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পেয়ে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, মানুষে জন্মাবধি যে সুখদুঃখ ভোগ করে, সে সমস্ত যদি সে দৈবকৃত মনে করে তবে হৃষ্ট বা ব্যথিত হয় না। যার কিছুই নেই তিনি সুখে শয়ন করেন, সুখে উত্থান করেন তাঁর শত্রু হয় না। রাজ্যের তুলনায় অকিঞ্চনতারই গুণ অধিক। বিদেহরাজ জনক বলেছিলেন, আমার বিত্তের অন্ত নেই, তথাপি আমার কিছুই নেই; মিথিলারাজ্য দগ্ধ হয়ে গেলেও আমার কিছু নষ্ট হয় না।
দানবরাজ প্রহ্লাদ এক ব্রাহ্মণকে বলেছিলেন, আপনি নির্লোভ শুদ্ধস্বভাব দয়ালু জিতেন্দ্রিয় অসূয়াহীন মেধাবী ও প্রাজ্ঞ, তথাপি বালকের ন্যায় বিচরণ করেন। আপনি লাভালাভে তুষ্ট বা দুঃখিত হন না, ধর্ম অর্থ ও কামেও আপনি উদাসীন। আপনার তত্ত্বজ্ঞান শাস্ত্র ও আচরণ কিরূপ তা আমাকে বলুন। ব্রাহ্মণ বললেন, প্রহ্লাদ, অজ্ঞাত কারণ থেকে জীবগণের উৎপত্তি ও বিনাশ হয়; মহাকায় ও সূক্ষ্ম, স্থাবর ও জঙ্গম সকল জীবেরই মৃত্যু হয়; আকাশচারী জ্যোতিষ্কগণেরও পতন হয়। সকলেই মৃত্যুর বশীভূত এই জেনে আমি সুখে নিদ্রা যাই। যদি লোকে দেয় তবে উৎকৃষ্ট খাদ্য প্রচুর পরিমাণে খাই, না পেলে অভুক্ত থাকি। কখনও অন্নের কণা, কখনও পিণ্যাক (তিলের খোল), কখনও পলান্ন খাই; কখনও পর্যঙ্কে কখনও ভূমিতে শুই; কখনও চীর কখনও মহামূল্য বস্ত্র পরি। স্বধর্ম থেকে চ্যুত না হয়ে রাগদ্বেষাদি ত্যাগ করে পবিত্রভাবে আমি অজগরব্রত আচরণ করছি। অজগর সর্প যেমন দৈবক্রমে লব্ধ খাদ্যে তুষ্ট থাকে, আমিও সেইরূপ যদৃচ্ছাগত বিষয়েই তুষ্ট থাকি। আমার শয়ন ভোজনের নিয়ম নেই, আমি সুখের অনিত্যতা উপলব্ধি করে পবিত্রভাবে আহ্লাদিত হয়ে এই অজগরব্রত পালন করছি।
যুধিষ্ঠির, কশ্যপবংশীয় এক ঋষিপুত্র কোনও বৈশ্যের রথের নীচে প'ড়ে আহত হয়েছিলেন। ক্রুদ্ধ ও রুদ্ধ হয়ে তিনি প্রাণত্যাগের সংকল্প করলেন। তখন ইন্দ্র শৃগালের রূপ ধারণ ক'রে তাঁর কাছে এসে বললেন, তুমি দুর্লভ মানব-জন্ম, ব্রাহ্মণত্ব ও বেদবিদ্যা লাভ করেছ। তোমার দশ-অঙ্গুলಿಯುত দুই হস্ত আছে তার দ্বারা সকল কর্ম করতে পার। সৌভাগ্যক্রমে তুমি শৃগাল কীট মূষিক সাপ বা ভেক হও নি, মনুষ্য এবং ব্রাহ্মণ হয়েছ; এতেই তোমার সন্তুষ্ট থাকা উচিত। আমার অবস্থা দেখ, আমার হস্ত নেই, দংশক কীটাদি তাড়াতে পারি না; আবার আমার চেয়েও নিকৃষ্ট জীব আছে। অতএব তুমি নিজের অবস্থায় তুষ্ট হও। যিনি কামনা রোধ করতে পারেন তিনি ভয় থেকে মুক্ত হন। মানুষ যে বস্তুর রসজ্ঞ নয় তাতে তার কামনা হয় না। মদ্য ও লট্বক (চড়াই) পক্ষীর মাংস অপেক্ষা উত্তম ভক্ষ্য কিছুই নেই, কিন্তু তুমি এই দুইএর স্বাদ জান না এজন্য তোমার কামনা নেই। অতএব ভক্ষণ স্পর্শন দর্শন দমিত করাই শ্রেয়স্কর। তুমি প্রাণবিসর্জনের সংকল্প ত্যাগ করে ধর্মাচরণে উদ্যোগী হও। এইপ্রকার উপদেশ দিয়ে ইন্দ্র নিজ রূপ ধারণ করলেন, তখন ঋষিপুত্র দেবরাজকে পূজা ক'রে স্বগৃহে চলে গেলেন।