শান্তিপর্ব: ১৭। সংস্তিব্রত — সদাচার

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, স্থাবরজঙ্গম সমেত এই জগৎ কি থেকে সৃষ্ট হ'ল, প্রলয়কালে কিসে লয় পাবে, মৃত্যুর পরে জীব কোথায় যায়, এইসব আমাকে বলুন। ভীষ্ম বললেন, ভরদ্বাজের প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি ভৃগু যা বলেছিলেন শোন। — মানস নামে এক দেব আছেন, তিনি অনাদি অজর অমর অব্যক্ত শাশ্বত অক্ষয় অব্যয়; তাঁ হতেই সমস্ত জীব সৃষ্ট হয় এবং তাতেই লীন হয়। সেই দেবই মহৎ অহংকার আকাশ সলিল প্রভৃতির মূল কারণ। মানসদেবের সৃষ্ট পদ্ম হতে ব্রহ্মার উৎপত্তি। ব্রহ্মা উৎপন্ন হয়েই ‘সোহহং’ বলেছিলেন, সেজন্য তিনি অহংকার নামে খ্যাত হয়েছেন। পর্বত মেদিনী সাগর আকাশ বায়ু অগ্নি চন্দ্র সূর্য প্রভৃতি তাঁরই অঙ্গ। অহঙ্কারের যিনি স্রষ্টা, সেই আত্মভূত দুজ্ঞেয় আদিদেবই ভগবান অনন্ত-বিষ্ণু।

আকাশের অন্ত নেই। যে স্থান থেকে চন্দ্রসূর্যও দেখা যায় না সেখানে স্বয়ংদীপ্ত দেবগণ বিরাজ করেন। পৃথিবীর অন্তে সমুদ্র, তার পর অন্ধকার, তার পর সলিল, তদ্ পর অগ্নি। আবার রসাতলের পর সলিল, তার পর সর্প- লোক, তার পর পবিত্র আকাশ জল প্রভৃতি। এই সকলের তত্ত্ব দেবগণেরও দুজ্ঞেয়।

জীবের বিনাশ নেই, দেহ নষ্ট হ'লে জীব দেহান্তরে যায়। কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে গেলে অগ্নি যেমন অদৃশ্যভাবে আকাশ আশ্রয় করে, শরীরত্যাগের পর জীবও সেইরূপ আকাশের ন্যায় অবস্থান করে। শরীরব্যাপী অন্তরাত্মাই দর্শন শ্রবণ প্রভৃতি কার্য নির্বাহ করেন এবং সুখদুঃখ অনুভব করেন।

সত্যই ব্রহ্ম ও তপস্যা, সত্যই প্রজাগণকে সৃষ্টি ও পালন করে। ধর্ম ও অর্থ হতেই সুখের উৎপত্তি হয়, যার শারীরিক ও মানসিক দুঃখ নেই সেই সুখ অনুভব করে। স্বর্গে নিত্য সুখ, ইহলোকে সুখদুঃখ দুইই আছে, নরকে কেবল দুঃখ। সুখই পরম পদার্থ।

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আমি সদাচারের বিধি শুনতে ইচ্ছা করি। ভীষ্ম বললেন, সদাচারই সাধুদের লক্ষণ, অসাধুরা দুরাচার। প্রাতঃকালে শৌচের পর দেবতাদের তর্পণ ক'রে নদীতে অবগাহন করবে। সূর্যোদয় হ'লে নিদ্রা যাবে না। সায়ংকালে ও প্রাতঃকালে পূর্ব- ও পশ্চিম-মুখ হয়ে সাবিত্রীমন্ত্র জপ করবে। হস্ত পদ মুখ আর্দ্র ক'রে মৌনী হয়ে ভোজন করবে। অতিথি স্বং ও ভৃত্যদের সঙ্গে সমানভাবে ভোজন করাই প্রশংসনীয়। ব্রাহ্মণের উচ্ছিষ্ট ননীর হৃদয়ের ন্যায় অমৃততুল্য। যিনি মাংসভক্ষণ ত্যাগ করেছেন তিনি যজ্ঞে সংস্কৃত মাংসও খাবেন না। উদীয়মান সূর্য এবং নগ্না পরস্ত্রীকে দেখবে না। সূর্য অভিমুখে মূত্রত্যাগ, নিজের পুরীষ দর্শন এবং স্ত্রীলোকের সঙ্গে একত্রে শয়ন ও ভোজন করবে না। জ্যেষ্ঠদের 'তুমি' বলবে না।

তার পর যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে ভীষ্ম অধ্যাত্মযোগ, ধ্যানযোগ, জপানুষ্ঠান ও জ্ঞানযোগ সম্বন্ধে সবিস্তারে বললেন।