শান্তিপর্ব: ১৮। বরাহরূপী বিষ্ণু — যজ্ঞে অহিংসা — প্রাণদণ্ডের নিন্দা
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, কৃষ্ণ তির্যযোনিতে বরাহরূপে কেন জন্মেছিলেন তা শুনতে ইচ্ছা করি। ভীষ্ম বললেন, পুরাকালে নরক প্রভৃতি বলদর্পিত অসুরগণ দেবগণের সমৃদ্ধি দেখে ঈর্ষান্বিত হয়েছিল। তাদের উৎপীড়নে বসুমতী ভারাক্রান্ত ও কাতর হলেন। তখন ব্রহ্মা দেবগণকে আশ্বাস দিলেন যে বিষ্ণু দানবগণকে সংহার করবেন। তার পর মহাতেজা বিষ্ণু বরাহের মূর্ত্তি ধারণ ক'রে ভূগর্ভে গিয়ে দানবদের প্রতি ধাবিত হলেন। তাঁর নিনাদে ত্রিলোক বিক্ষুব্ধ হ'ল, দানবগণ বিষ্ণুতেজে মোহিত ও গতাসু হ'য়ে পতিত হ'ল। মহর্ষিগণ স্তব করলে বরাহরূপী বিষ্ণু রসাতল থেকে উত্থিত হলেন। সেই মহাযোগী ভূতভাবন পদ্মনাভ বিষ্ণুর প্রভাবে সকলের ভয় ও শোক দূর হয়েছিল।
তার পর যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম বিবিধ দার্শনিক তত্ত্ব বিবৃত ক'রে অহিংসা সম্বন্ধে এই উপদেশ দিলেন। — পুরাকালে রাজা বিচখু গোমেধ-যজ্ঞে নিহত বৃষের দেহ দেখে এবং গোসকলের আর্তনাদ শুনে কাতর হয়ে এই আশীর্বাদ করেছিলেন — গোজাতির স্বস্তি হ'ক। যারা মূঢ় ও সংশয়গ্রস্ত নাস্তিক তারাই যজ্ঞে পশুবধের প্রশংসা করে। ধর্মাত্মা মনু সকল কর্মে অহিংসারই উপদেশ দিয়েছেন। সর্বভূতে অহিংসাই সকল ধর্মের শ্রেষ্ঠ গণ্য হয়। ধূর্তেরাই সুরা মৎস্য মাংস মধু ও কৃশরান্ন ভোজন প্রবর্তিত করেছে, বেদে এসকলের বিধান নেই। সকল যজ্ঞেই বিষ্ণুর অধিষ্ঠান জেনে ব্রাহ্মণগণ পায়স ও পুষ্প দ্বারাই অর্চনা করেন। শুদ্ধস্বভাব মহাত্মাদের মতে যা কিছু উত্তম গণ্য হয় তাই দেবতাকে নিবেদন করা যেতে পারে।
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, কোনও লোককে বধদণ্ড না দিয়েও রাজা কোন্ উপায়ে প্রজাশাসন করতে পারেন? ভীষ্ম বললেন, আমি এক পুরাতন ইতিহাস বলছি শোন। — দ্যুমৎসেনের আজ্ঞায় বধদণ্ডের যোগ্য কয়েকজন অপরাধীকে সত্যবানের নিকট আনা হ'লে সত্যবান বললেন, পিতা, অবস্থাবিশেষে ধর্ম অধর্মরূপে এবং অধর্ম ধর্মরূপে গণ্য হয়, কিন্তু বধ কখনই ধর্ম হতে পারে না। দ্যুমৎসেন বললেন, দস্যুদের বধ না করলে নানা দোষ ঘটে; দুষ্টের দমনের নিমিত্ত বধদণ্ড আবশ্যক, নতুবা ধর্মরক্ষা হয় না। অন্য উপায় যদি তোমার জানা থাকে তো বল।
সত্যবান বললেন, ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্রকে ব্রাহ্মণের অধীন করা কর্তব্য। কেউ যদি ব্রাহ্মণের বাক্য না শোনে তবে ব্রাহ্মণ রাজকে জানাবেন, তখন রাজা তাকে দণ্ড দেবেন। অপরাধীর কর্ম নীতিশাস্ত্র অনুসারে বিচার না ক'রে বধদণ্ড দেওয়া অন্যায়। একজনকে বধ করলে তার পিতা মাতা পত্নী পুত্র প্রভৃতিরও প্রাণ-সংশয় হয়। অসাধুলোকেও পরে সচ্চরিত্র হ'তে পারে, অসাধুরও সাধু সন্তান হ'তে পারে, অতএব সমূলে সংহার করা অকর্ত্তব্য। অপরাধের শাস্তি অন্য রূপেও হ'তে পারে, যথা ভয়প্রদর্শন, বন্ধন (কারাদণ্ড), বিপ্রকরণ প্রভৃতি। অপরাধী যদি পুরোহিতের শরণাগত হয়ে বলে — আর এমন কর্ম করব না, তবে তাকে প্রথম বারে মার্জনা করাই উচিত। মান্যগণ্য লোকের প্রথম অপরাধ ক্ষমার্হ, বার বার অপরাধ দণ্ডনীয়।
দ্যুমৎসেন বললেন, পূর্ব্বে লোকেরা সদৃশ সত্যনিষ্ঠ ও মৃদুস্বভাব ছিল, ধিক্কারেই তাদের যথেষ্ট দণ্ড হ'ত। তার পর বাগ্দণ্ড (তিরস্কার) ও অর্থদণ্ড প্রচলিত হয়, সম্প্রতি বধদণ্ড প্রবর্ত্তিত হয়েছে। এখন অপরাধীকে বধদণ্ড দিয়েও অন্যান্য লোককে দমন করা যায় না। কথিত আছে, দস্যু কারও আত্মীয় নয়, তার সঙ্গে কোনও লোকের সম্বন্ধ নেই। যারা শ্মশান থেকে শবের বস্ত্রাদি এবং ভূতাবিষ্ট লোকের ধন হরণ করে, শপথ করিয়ে তাদের শাসন করা যায় না।
সত্যবান বললেন, যদি অহিংস উপায়ে অসাধুকে সাধু করা অসাধ্য হয় তবে যজ্ঞ দ্বারা তাদের সংহার করুন। কিন্তু যদি ভয় দেখিয়ে শাসন করা সম্ভবপর হয় তবে ইচ্ছাপূর্ব্বক বধ করা অকর্ত্তব্য। রাজা সদাচারী হ'লে প্রজাও সেইরূপ হয়, শ্রেষ্ঠ লোকে যেমন আচরণ করেন ইতর লোকে তারই অনুসরণ করে। যে রাজা নিজেকে সংযত না ক'রে অন্যকে শাসন করতে যান তাঁকে লোকে উপহাস করে। নিজের বন্ধু ও আত্মীয়কেও কঠোর দণ্ড দিয়ে শাসন করা উচিত। আয়ু, শক্তি ও কাল বিচার ক'রে রাজা দণ্ডবিধান করবেন। জীবগণের প্রতি অনুকম্পা ক'রে স্বায়ম্ভুব মনু বলেছেন, যিনি সত্যার্থী (রহস্যলাভেচ্ছু) তিনি মহৎ কর্ম্মের ফল কদাচ ত্যাগ করবেন না।