শান্তিপর্ব: ২৪। উত্তরগীতার উপাখ্যান

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি মোক্ষধর্ম বিবৃত করেছেন, এখন আশ্রমবাসীদের ধর্ম সম্বন্ধে বলুন। ভীষ্ম বললেন, সকল আশ্রমের জন্যই স্বর্গদায়ক ও মোক্ষফলপ্রদ ধর্ম বিহিত আছে। ধর্মের বহু দ্বার, ধর্মানুষ্ঠান কখনও বিফল হয় না। যাঁর যে ধর্মে নিষ্ঠা, সেই ধর্মই তিনি অবলম্বন করেন। পুরাকালে দেবর্ষি নারদ ইন্দ্রকে যে উপাখ্যান বলেছিলেন তা শোন। —

গঙ্গার দক্ষিণ তীরে মহাপদ্ম নগরে এক ধার্মিক জিতেন্দ্রিয় ব্রাহ্মণ বাস করতেন, তাঁর অনেক পুত্র ছিল। তাঁর এই ভাবনা হ'ল — বেদোক্ত ধর্ম, শাস্ত্রোক্ত ধর্ম, এবং শিষ্টাচারসম্মত ধর্ম, এই তিনের মধ্যে কোন্টি তাঁর পক্ষে শ্রেয়। একদিন তাঁর গৃহে একজন ব্রাহ্মণ অতিথি এলে তিনি যথাবিধি সৎকার করে নিজের সংশয়ের বিষয় জানালেন। অতিথি বললেন, এ সম্বন্ধে আমিও কিছু স্থির করতে পারি নি। কেউ মোক্ষের প্রশংসা করেন, কেউ বা যজ্ঞ, দানতপঃ, গার্হস্থ্য, রাজধর্ম, গুরুনির্দ্দিষ্ট ধর্ম, বাক্‌সংযম, পিতামাতার সেবা, অহিংসা, সত্যকথন, সম্মুখযুদ্ধে মরণ, অথবা উঞ্ছবৃত্তিকেই শ্রেষ্ঠ মার্গ মনে করেন। আমার গুরুর নিকট শুনেছি, নৈমিষক্ষেত্রে গোমতীতীরে নাগাহ্বয় (নাগ নামক) নগর আছে, সেখানে পদ্মনাভ নামে এক মহানাগ বাস করেন। তাঁর কাছে গেলে তিনি তোমার সংশয় ভঞ্জন করবেন।

পরদিন অতিথি চলে গেলে ব্রাহ্মণ নাগনগরের অভিমুখে যাত্রা করলেন এবং বহু বন তীর্থ সরোবর প্রভৃতি অতিক্রম করে পদ্মনাভের পত্নীর নিকট উপস্থিত হলেন। ধর্মপরায়ণা নাগপত্নী বললেন, আমার পতি সূর্যের রথ বহন করবার জন্য গেছেন, সাত আট দিন পরে ফিরে আসবেন। ব্রাহ্মণ বললেন, আমি গোমতীতীরে যাচ্ছি, সেখানে অল্পাহারী হয়ে তাঁর প্রতীক্ষা করব। পদ্মনাভ যথাকালে তাঁর ভবনে ফিরে এলে নাগপত্নী তাঁকে জানালেন যে তাঁর দর্শনার্থী এক ব্রাহ্মণ গোমতীতীরে অনাহারে রয়েছেন, বহু অনুরোধেও তিনি আহার করেন নি, তাঁর কি প্রয়োজন তাও বলেন নি। পদ্মনাভ তখনই ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে তাঁর আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। ব্রাহ্মণ বললেন, আমার নাম ধর্মারণ্য; কৃষক যেমন জলধরের প্রতীক্ষা করে সেইরূপ আমি এত দিন তোমার প্রতীক্ষা করেছি। আমার প্রয়োজনের কথা পরে বলব, এখন তুমি আমার এই প্রশ্নের উত্তর দাও — তুমি পর্যায়ক্রমে সূর্যের একচক্র রথ বহন করতে যাও, সেখানে আশ্চর্য বিষয় কি দেখেছ?

পদ্মনাভ বললেন, ভগবান রবি বহু আশ্চর্যের আধার। দেবগণ ও সিদ্ধ মুনিগণ তাঁর সহস্র রশ্মি আশ্রয় করে বাস করেন, তাঁর প্রভাবেই সমীরণ প্রবাহিত হয়, বর্ষায় বারিপাত হয়; তাঁর মন্ডলমধ্যবর্তী তেজোময় মহান আত্মা সর্বলোকে নিরীক্ষণ করেন। তিনি বর্ষিত জল পবিত্র কিরণ দ্বারা আট মাস পুনর্বার গ্রহণ করেন, তাঁর জন্যই এই বসুন্ধরা বীজ ধারণ করে, তাঁর মধ্যে অনাদি অনন্ত পুরুষোত্তম বিরাজ করেন। এইসকল অপেক্ষা আশ্চর্য আর কি আছে? তথাপি আরও আশ্চর্য যা দেখেছি তা শুনুন। একদিন মধ্যাহ্নকালে যখন ভাস্কর সর্বলোক তাপিত করেছিলেন তখন তাঁর অভিমুখে দ্বিতীয় আদিত্যতুল্য দীপ্যমান অপর এক পুরুষকে আসতে দেখলাম। সূর্যদেব তাঁর দিকে দুই হস্ত প্রসারিত করে সংবর্ধনা করলেন, সেই তেজোময় পুরুষ সসম্মানে নিজের দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে সূর্যের রশ্মি-মন্ডলে প্রবিষ্ট হলেন। উভয়ের মধ্যে কে সূর্য তা আর বোঝা গেল না। আমরা সূর্যকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভগবান, দ্বিতীয় সূর্যতুল্য ইনি কে? সূর্য বললেন, ইনি অগ্নিদেব নন, অসুর বা পন্নগও নন; ইনি উঞ্ছবৃত্তি(১)-ব্রতধারী সমাধিনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ ছিলেন, অনাসক্ত এবং সর্বভূতহিতে রত হয়ে ফলমূল জীর্ণপত্র জল ও বায়ু ভক্ষণ করে প্রাণধারণ করতেন। মহাদেবকে তুষ্ট করে ইনি এখন সূর্যমন্ডলে এসেছেন।

(১) ক্ষেত্রে পতিত ধান্যাদি খুঁটে নেওয়া; অর্থাৎ অত্যল্প উপকরণে জীবিকানির্বাহ।

ব্রাহ্মণ বললেন, নাগ, তোমার কথা আশ্চর্য বটে। আমি প্রীত হয়েছি তোমার কথায় আমি পথের সন্ধান পেয়েছি, তোমার মঙ্গল হ’ক, আমি এখন প্রস্থান করব। পদ্মনাভ বললেন দ্বিজশ্রেষ্ঠ, কোন্ প্রয়োজনে আপনি এসেছিলেন তা না ব’লেই যাবেন? বহুকাল উপবিষ্ট পথিকের ন্যায় আমাকে একবার দেখেই চ’লে যাওয়া আপনার উচিত নয়। আমি আপনার প্রতি অনুরক্ত, আপনিও নিশ্চয় আমাকে স্নেহ করেন, আমার অনুচরগণও আপনার অনুগত, তবে কেন যাবার জন্য ব্যস্ত হয়েছেন? ব্রাহ্মণ বললেন, মহাপ্রাজ্ঞ ভুজঙ্গম, তোমার কথা যথার্থ। তুমিও যে, আমিও সে, ক্ষে’তার আমার এবং সর্বভূতের একই সত্তা। তোমার কথায় আমার সংশয় দূর হয়েছে, আমি পরমার্থলাভের উপায় স্বরূপ উঞ্ছবৃত্তিই গ্রহণ করব। তোমার মঙ্গল হ’ক, আমি কৃতার্থ হয়েছি। এই ব’লে ব্রাহ্মণ প্রস্থান করলেন এবং ভৃগুবংশ-জাত চ্যবনের নিকট দীক্ষা নিয়ে উঞ্ছবৃত্তি অবলম্বন করলেন।