অনুশাসনপর্ব: ১। গৌতমী, ব্যাধ, সর্প, মৃত্যু ও কাল

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি বহুপ্রকার শান্তিবিষয়ক কথা বলেছেন, কিন্তু জ্ঞাতিবধজনিত পাপের ফলে আমার মন শান্ত হচ্ছে না। আপনাকে শরে আবৃত ক্ষতবিক্ষত ও রুধিরাক্ত দেখে আমি অবসন্ন হচ্ছি। আমরা যে নিন্দিত কর্ম করেছি তার ফলে আমাদের গতি কিপ্রকার হবে? দুর্যোধনকে ভাগ্যবান মনে করি, তিনি আপনাকে এই অবস্থায় দেখছেন না। বিধাতা পাপকর্মের জন্যই নিশ্চয় আমাদের সৃষ্টি করেছেন। যদি আমাদের প্রিয়কামনা করেন তবে এমন উপদেশ দিন যাতে পরলোকে পাপমুক্ত হ'তে পারি। ভীষ্ম বললেন, মানুষের আত্মা বিধাতার অধীন, তাকে পাপপুণ্যের কারণ মনে করছ কেন? আমরা যে কর্ম করি তার হেতু অতি সূক্ষ্ম এবং ইন্দ্রিয়ের অগোচর। আমি এক প্রাচীন ইতিহাস বলছি শোন।—

গৌতমী নামে এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী ছিলেন, তাঁর পুত্র সর্পের দংশনে হতচেতন হয়। অর্জুনক নামে এক ব্যাধ ক্রুদ্ধ হয়ে সর্পকে পাশবদ্ধ ক'রে গৌতমীর কাছে এসে বললে, এই সর্পাধম আপনার পুত্রহন্তা, বলুন একে কি ক'রে বধ করব; একে অগ্নিতে ফেলব, না খণ্ড খণ্ড ক'রে কাটব? গৌতমী বললেন, অর্জুনক, তুমি নির্বোধ, এই সর্পকে মেরো না, ছেড়ে দাও। একে মারলে আমার পুত্র বেঁচে উঠবে না, একে ছেড়ে দিলে তোমারও কোনও অপকার হবে না। এই প্রাণবান জীবকে হত্যা ক'রে কে অনন্ত নরকে যাবে?

ব্যাধ বললে, আপনি যে উপদেশ দিলেন তা প্রকৃতিস্থ মানুষের উপযুক্ত, কিন্তু তাতে শোকার্তের সান্ত্বনা হয় না। যারা শান্তিকামী তারা কালবশে এমন হয়েছে এই ভেবে শোক দমন করে, যারা প্রতিশোধ বোঝে তারা শত্রুনাশ ক'রেই শোকমুক্ত হয়, এবং অন্য লোকে মোহবশে সর্বদাই বিলাপ করে। অতএব এই সর্পকে বধ ক'রে আপনি শোকমুক্ত হ'ন। গৌতমী বললেন, যারা আমার ন্যায় ধর্মনিষ্ঠ তাদের শোক হয় না; এই বালক নিয়তির বশেই প্রাণত্যাগ করেছে, সেজন্য আমি সর্পকে বধ করতে পারি না। ব্রাহ্মণের পক্ষে কোপ অকর্তব্য, তাতে কেবল যাতনা হয়।

তুমি এই সর্পকে ক্ষমা ক’রে মুক্তি দাও। ব্যাধ বললে, একে মারলে বহু লোকের প্রাণরক্ষা হবে, অপরাধীকে বিনষ্ট করাই উচিত।

ব্যাধ বার বার অনুরোধ করলেও গৌতমী সর্পবধে সম্মত হলেন না। তখন সেই সর্প মৃদুস্বরে মনুষ্যভাষায় ব্যাধকে বললে, মূর্খ অর্জ্জুনক, আমার কি দোষ? আমি পরাধীন, ইচ্ছা ক’রে এই বালককে দংশন করি নি, মৃত্যু কর্তৃক প্রেরিত হয়ে করেছি; যদি পাপ হয়ে থাকে তবে মৃত্যুরই হয়েছে। ব্যাধ বললে, অন্যের বশবর্তী হলেও তুমি এই পাপকার্য্যের কারণ, সেজন্য বধযোগ্য। সর্প বললে, কেবল আমিই কারণ নই, বহু কারণের সংযোগে এই কার্য্য হয়েছে। ব্যাধ বললে, তুমিই এই বালকের প্রাণনাশের প্রধান কারণ, অতএব বধযোগ্য।

সর্প ও ব্যাধ যখন এইরূপ বাদানুবাদ করছিল তখন স্বয়ং মৃত্যু সেখানে আবির্ভূত হয়ে বললেন, ওহে সর্প, আমি কাল কর্তৃক প্রেরিত হয়ে তোমাকে প্রেরণ করেছি, অতএব তুমি বা আমি এই বালকের বিনাশের কারণ নই। জগতে স্থাবর জঙ্গম সূর্য্য চন্দ্র বিষ্ণু ইন্দ্র জল বায়ু অগ্নি প্রভৃতি সমস্তই কালের অধীন, অতএব তুমি আমার উপর দোষারোপ করতে পার না। সর্প বললে, আপনাকে আমি দোষী বা নির্দোষী বলছি না, আমি আপনার প্রেরণায় দংশন করেছি — এই কথাই বলেছি; দোষ নির্ধারণ আমার কার্য্য নয়। ব্যাধ, তুমি মৃত্যুর কথা শুনলে, এখন আমাকে মুক্তি দাও। ব্যাধ বললে, তুমি যে নির্দোষ তার প্রমাণ হ’ল না, তুমি ও মৃত্যু উভয়েই এই বালকের বিনাশের কারণ, তোমাদের ধিক।

এমন সময় স্বয়ং কাল আবির্ভূত হয়ে ব্যাধকে বললেন, আমি বা মৃত্যু বা এই সর্প কেউ অপরাধী নই, এই শিশু নিজ কর্ম্মফলেই বিনষ্ট হয়েছে। কুম্ভকার যেমন মৃৎপিণ্ড থেকে ইচ্ছানুসারে বস্তু উৎপাদন করে, মানুষও সেইরূপ আত্মকৃত কর্ম্মের ফল পায়। এই শিশু নিজেই তার বিনাশের কারণ।

গৌতমী বললেন, কাল বা সর্প বা মৃত্যু কেউ এই বালকের বিনাশের কারণ নয়, নিজ কর্ম্মফলেই এ বিনষ্ট হয়েছে, আমিও নিজ কর্ম্মফলে পুত্রহীনা হয়েছি। অতএব কাল ও মৃত্যু এখন প্রস্থান করুন, তুমিও সর্পকে মুক্তি দাও। গৌতমী এইরূপ বললে কাল ও মৃত্যু চলে গেলেন, ব্যাধ সর্পকে ছেড়ে দিলে, গৌতমীও শোকশূন্য হলেন।

উপাখ্যান শেষ ক’রে ভীষ্ম বললেন, মহারাজ, যুদ্ধে যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁরা সকলেই কালের প্রভাবে নিজ কর্ম্মের ফল পেয়েছেন, তোমার বা দুর্য্যোধনের কর্ম্মের জন্য তাঁদের মরণ হয় নি। অতএব তুমি শোক ত্যাগ কর।