অনুশাসনপর্ব: ২। সুদর্শন-ওঘবতীর অতিথি- সৎকার

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, গৃহস্থ ধর্মপরায়ণ হয়ে কি ক’রে মৃত্যুকে জয় করতে পারে তা বলুন। ভীষ্ম বললেন, আমি এক ইতিহাস বলছি শোন। — মাহিষ্মতী নগরীতে ইক্ষ্বাকুবংশীয় দুর্যোধন নামে এক ধর্মাত্মা রাজা ছিলেন। তাঁর ঔরসে দেবনদী নর্মদার গর্ভে সুদর্শনা নামে এক পরমরূপবতী কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। ভগবান অগ্নিদেবের অভিলাষ জেনে রাজা তাঁকে কন্যাদান করলেন এবং শুল্ক-স্বরূপ এই বর পেলেন যে অগ্নি সর্বদা মাহিষ্মতীতে অধিষ্ঠিত থাকবেন। সহদেব যখন দক্ষিণ দিক জয় করতে গিয়েছিলেন তখন তিনি সেই অগ্নি দেখেছিলেন (১)। অগ্নিদেবের ঔরসে সুদর্শনার এক পুত্র হ’ল, তাঁর নাম সুদর্শন। সুদর্শনের সঙ্গে নগ্ন রাজার পিতামহ ওঘবানের কন্যা ওঘবতীর বিবাহ হ’ল।

(১) সভাপর্ব ৬-পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

সুদর্শন পত্নীর সঙ্গে কুরুক্ষেত্রে বাস করতে লাগলেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন যে গৃহস্থাশ্রমে থেকেই মৃত্যুকে জয় করবেন। তিনি ওঘবতীকে বললেন, তুমি অতিথিকে সর্বপ্রকারে তুষ্ট রাখবে, এমন কি প্রয়োজন হ’লে নির্বিচারে নিজেকেও দান করবে। আমি গৃহে থাকি বা না থাকি তুমি কখনও অতিথিসেবার অবহেলা করবে না। কল্যাণী, অতিথি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কেউ নেই। ওঘবতী তাঁর মস্তকে অঞ্জলি রেখে বললেন, তোমার আদেশ অবশ্যই পালন করব।

একদিন সুদর্শন কাষ্ঠ সংগ্রহ করতে গেলে স্বয়ং ধর্ম ব্রাহ্মণের বেশে ওঘবতীর কাছে এসে বললেন, আমি তোমার অতিথি, যদি গার্হস্থ্যধর্মে তোমার আস্থা থাকে তবে আমার সৎকার কর। ওঘবতী আসন ও পাদ্য দিয়ে বললেন, বিপ্র, আপনার কি প্রয়োজন? ব্রাহ্মণরূপী ধর্ম বললেন, তোমাকেই আমার প্রয়োজন। ওঘবতী অন্যান্য অভীষ্ট বস্তুর প্রলোভন দেখালেন, কিন্তু ব্রাহ্মণ তাতে সম্মত হলেন না। তখন তিনি পতির আজ্ঞা স্মরণ ক’রে সলজ্জভাবে বললেন, তাই হ’ক, এবং ব্রাহ্মণের সঙ্গে সহাস্যে অন্য গৃহে গেলেন।

সুদর্শন ফিরে এসে পত্নীকে দেখতে না পেয়ে বার বার ডাকতে লাগলেন। ওঘবতী তখন ব্রাহ্মণের বাহুপাশে বদ্ধ ছিলেন এবং নিজেকে উচ্ছিষ্ট মনে ক’রে পতির আহ্বানের উত্তর দিলেন না। সুদর্শন আবার বললেন, আমার সাধ্বী পতিব্রতা সরলা পত্নী কোথায় গেল, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ আমার কিছুই নেই। তখন কুটিরের ভিতর থেকে ব্রাহ্মণ বললেন, অগ্নিপয়ে সুদর্শন, আমি অতিথি ব্রাহ্মণ তোমার গৃহে এসেছি, তোমার ভার্যা আমার প্রার্থনা পূরণ করছেন; তোমার যা উচিত মনে হয় কর।

সুদর্শনের পশ্চাতে লৌহমুদগরধারী মৃত্যু অদৃশ্যভাবে অপেক্ষা করছিলেন; তিনি স্থির করেছিলেন, সুদর্শন যদি অতিথিসৎকারব্রত পালন না করেন তবে তাঁকে বধ করবেন। অতিথির কথা শুনে সুদর্শন বিস্মিত হলেন, এবং ঈর্ষা ও ক্রোধ ত্যাগ ক'রে বললেন, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আপনার সুব্রত সম্পন্ন হ'ক, আমার প্রাণ পত্নী এবং আর যা কিছু আছে সবই আমি অতিথিকে দান করতে পারি। আমি সত্য কথা বলেছি, এই সত্যদ্বারা দেবতারা আমাকে পালন করুন অথবা দহন করুন। তখন সেই অতিথি ব্রাহ্মণ কুটীর থেকে বেরিয়ে এসে ত্রিলোক অনুনাদিত ক'রে বললেন, আমি ধর্ম, তোমাকে পরীক্ষা করবার জন্য এসেছি। মৃত্যু সর্বদা তোমার রন্ধ্র অনুসন্ধান করছিলেন, তাঁকে তুমি জয় করেছ। নরশ্রেষ্ঠ, ত্রিলোকে এমন কেউ নেই যে তোমার পতিব্রতা সাধ্বী পত্নীর প্রতি দৃষ্টিপাত করতে পারে। ইনি তোমার এবং নিজের গুণে রক্ষিতা, ইনি যা বলবেন তার অন্যথা হবে না। এই ব্রহ্মবাদিনী নিজ তপস্যার প্রভাবে অর্ধশরীর দ্বারা ওঘবতী নদী হয়ে লোকপাবন করবেন এবং অর্ধ-শরীরে তোমার অনুগমন করবেন। তুমিও সশরীরে এঁর সঙ্গে শাশ্বত সনাতন লোক লাভ করবে। তুমি মৃত্যুকে পরাজিত করেছ, বীর্যবলে পঞ্চভূতকে অতিক্রম করেছ, গৃহস্থ ধর্ম দ্বারা কাম ক্রোধ জয় করেছ। অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র শুক্লবর্ণ সহস্র অশ্ব যোজিত রথে সুদর্শন ও ওঘবতীকে তুলে নিয়ে প্রস্থান করলেন।

ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বললেন, গৃহস্থের পক্ষে অতিথিই পরমদেবতা, অতিথি পূজিত হ'লে যে শুভচিন্তা করেন তার ফল শত যজ্ঞেরও অধিক। সাধু স্বভাব অতিথি যদি সমাদর না পান তবে তিনি নিজের পাপ গৃহস্থকে দিয়ে এবং তার পুণ্য নিয়ে প্রস্থান করেন। বৎস, গৃহস্থ সুদর্শন যে প্রকারে মৃত্যুকে পরাস্ত করেছিলেন তার পুণ্যময় আখ্যান তোমাকে বললাম।