অনুশাসনপর্ব: ৩। কৃতজ্ঞ শুক — দৈব ও পুরুষ- কার — ভগবদ্ভক্তের স্বভাব

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি অনুকম্পা-ধর্মের ও ভক্তজনের গুণ-বর্ণনা করুন। ভীষ্ম বললেন, আমি একটি উপাখ্যান বলছি শোন। — কাশীরাজের অরণ্যে এক ব্যাধ মৃগবধের জন্য বিষলিপ্ত বাণ নিক্ষেপ করেছিল, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সেই বাণ একটি বিশাল বৃক্ষে বিদ্ধ হ'ল। সেই বৃক্ষের কোটরে একটি শুকপক্ষী বহু কাল থেকে বাস করত। বিষের প্রভাবে বৃক্ষ ফলপত্রহীন ও শুষ্ক হয়ে গেল। কিন্তু আশ্রয়দাতার প্রতি ভক্তির জন্য শুক সেই বনস্পতিকে ত্যাগ করলে না, অনাহারে ক্ষীণদেহে সেখানেই রইল। দেবরাজ ইন্দ্র সেই উদারস্বভাব কৃতজ্ঞ সমব্যথী শুকের আচরণে আশ্চর্য হলেন এবং ব্রাহ্মণের বেশে উপস্থিত হয়ে বললেন, পক্ষিশ্রেষ্ঠ শুক, তুমি এই ফলপত্রহীন শুষ্ক বৃক্ষ ত্যাগ ক'রে অন্যত্র যাচ্ছ না কেন? এই মহারণ্যে আশ্রয়যোগ্য আরও তো অনেক বৃক্ষ আছে। শুক বললে, দেবরাজ, আমি এখানেই জন্মেছি এবং নিরাপদে প্রতিপালিত হয়েছি। আমি এই বৃক্ষের ভক্ত, এর দুঃখে দুঃখিত এবং অনন্যগতি। আপনি ধর্মজ্ঞ হয়ে কেন আমাকে অন্যত্র যেতে বলছেন? এই বৃক্ষ যখন সমৃদ্ধ ছিল তখন আমি এর আশ্রয়ে ছিলাম, আজ আমি কি ক'রে একে ছেড়ে যেতে পারি? শুকের কথা শুনে ইন্দ্র অতিশয় প্রীত হলেন এবং তাঁর প্রার্থনায় অমৃত সেচন ক'রে বৃক্ষকে পুনর্জীবিত করলেন।

ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, বৃক্ষ যেমন শুককে আশ্রয় দিয়ে উপকৃত হয়েছিল, লোকেও সেইরূপ ভক্তজনকে আশ্রয় দিয়ে সর্ব বিষয়ে সিদ্ধিলাভ করে।

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, দৈব ও পুরুষকার এই দুইএর মধ্যে কোন্টি শ্রেষ্ঠ? ভীষ্ম বললেন, এ সম্বন্ধে লোকপিতামহ ব্রহ্মা বশিষ্ঠকে যা বলেছিলেন শোন। — কৃষক তার ক্ষেত্রে যেরূপ বীজ বপন করে সেইরূপ ফল উৎপন্ন হয়; মানুষও তার সৎকর্ম ও অসৎকর্ম অনুসারে বিভিন্ন ফল লাভ করে। ক্ষেত্র ব্যতীত ফল উৎপন্ন হয় না, পুরুষকার ব্যতীত দৈবও সিদ্ধ হয় না। পণ্ডিতগণ পুরুষকারকে ক্ষেত্রের সহিত এবং দৈবকে বীজের সহিত তুলনা করেন। যেমন ক্ষেত্র ও বীজের সংযোগে, সেইরূপ পুরুষকার ও দৈবের সংযোগে ফল উৎপন্ন হয়। ক্লীব পতির সহিত স্ত্রীর সহবাস যেমন নিষ্ফল, কর্ম ত্যাগ ক'রে দৈবের উপর নির্ভরও সেইরূপ। পুরুষকার দ্বারাই লোকে স্বর্গ, ভোগ্য বিষয় ও পাণ্ডিত্য লাভ করে। কৃপণ ক্লীব নিষ্ক্রিয় অকর্মকারী দুর্বল ও বলহীন লোকের অর্থলাভ হয় না। পুরুষকার অবলম্বন ক'রে কর্ম করলে দৈব তার সহায়ক হয়, কিন্তু কেবল দৈবে কিছুই পাওয়া যায় না। পৌরুষই দেবগণের আশ্রয়, পুণ্যকর্ম দ্বারা সমস্তই পাওয়া যায়, পুণ্যশীল লোকে দৈবকেও অতিক্রম করেন। দৈবের প্রভুত্ব নেই, শিষ্য যেমন গুরুর অনুসরণ করে দৈব সেইরূপ পুরুষকারের অনুসরণ করে।

যুধিষ্ঠির বলিলেন, পিতামহ, স্ত্রীপুরুষের মিলনকালে কার স্পর্শসুখ অধিক হয়? ভীষ্ম বলিলেন, আমি এক পুরাতন ইতিহাস বলছি শোন।— ভঙ্গাস্বন নামে এক ধার্মিক রাজর্ষি পুত্রকামনায় অগ্নিষ্টুত যজ্ঞ ক'রে শত পুত্র লাভ করেছিলেন। এই যজ্ঞে কেবল অগ্নিরই স্তুতি হয় এজন্য ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে রাজর্ষির ছিদ্র অন্বেষণ করতে লাগলেন। একদিন ভঙ্গাস্বন মৃগয়া করতে গেলে ইন্দ্র তাঁকে বিমোহিত করলেন। রাজা দিগ্ভ্রান্ত শ্রান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে ঘুরতে ঘুরতে একটি সরোবর দেখতে পেলেন। তিনি তাঁর অশ্বকে জল খাইয়ে নিজে সরোবরে অবগাহন করলেন এবং তৎক্ষণাৎ স্ত্রীরূপ পেলেন। নিজের রূপান্তর দেখে রাজা অতিশয় লজ্জিত ও চিন্তাকুল হলেন এবং কোনও প্রকারে অশ্বের পৃষ্ঠে উঠে রাজপুরীতে ফিরে গেলেন। তাঁর পত্নী পুত্রগণ ও অন্যান্য সকলে তাঁকে দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে এবং সকল ঘটনা বিবৃত ক'রে রাজা তাঁর পুত্রদের বললেন, আমি বনে যাব, তোমরা সদ্ভাবে থেকে একত্র রাজ্য ভোগ কর।

স্ত্রীরূপী ভঙ্গাস্বন বনে এসে এক তাপসের আশ্রয়ে বাস করতে লাগলেন। সেই তাপসের ঔরসে রাজার গর্ভে এক শ পুত্র হ'ল। তিনি এই পুত্রদের নিয়ে পূর্বজাত পুত্রদের কাছে গিয়ে বললেন, তোমরা আমার পুরুষ অবস্থার পুত্র, আমি স্ত্রী হবার পর এরা জন্মেছে। তোমরা এই ভ্রাতাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে রাজ্য ভোগ কর। ভঙ্গাস্বনের উপদেশ অনুসারে তাঁর দুই শত পুত্র একত্র রাজ্য ভোগ করতে লাগল। ইন্দ্র ভাবলেন, আমি এই রাজর্ষির অপকার করতে গিয়ে উপকারই করেছি। তিনি ব্রাহ্মণের বেশে রাজপুত্রদের কাছে গিয়ে বললেন, যারা এক পিতার পুত্র তাদের মধ্যেও সৌভ্রাত্র থাকে না; কশ্যপের পুত্র সুর ও অসুরগণের মধ্যে বিবাদ হয়েছিল। তোমরা রাজর্ষি ভঙ্গাস্বনের পুত্র, আর এরা একজন তাপসীর পুত্রে; এরা তোমাদের পৈতৃক রাজ্য ভোগ করছে কেন? ইন্দ্রের কথা শুনে রাজপুত্রদের মধ্যে ভেদবুদ্ধি হ'ল, তাঁরা যুদ্ধ ক'রে পরস্পরকে বিনষ্ট করলেন।

পুত্রদের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ভঙ্গাস্বন কাঁদতে লাগলেন। তখন ইন্দ্র তাঁর কাছে এসে বললেন, তুমি আমাকে আহ্বান না ক'রে আমার অপ্রিয় অগ্নিষ্টুত যজ্ঞ করেছিলে সেজন্য আমি তোমাকে নির্যাতিত করেছি। ভঙ্গাস্বন পদানত হয়ে ক্ষমা চেয়ে ইন্দ্রকে প্রসন্ন করলেন। ইন্দ্র বললেন, আমি তুষ্ট হয়েছি; বল, তোমার কোন্ পুত্রদের পুনর্জীবন চাও — তোমার ঔরস পুত্রদের, না গর্ভজাত পুত্রদের? তাপসী-বেশী ভঙ্গাস্বন কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, আমার স্ত্রীত্ব লাভের পর যারা জন্মেছিল তাদেরই জীবিত করুন। ইন্দ্র বিস্মিত হয়ে বললেন, এই পুত্রেরা তোমার পুরুষ... অবস্থার পুত্রদের চেয়ে প্রিয় হ’ল কেন? ভাঙ্গাস্বন বললেন, দেবরাজ, পুরুষ অপেক্ষা স্ত্রীর স্নেহই অধিক। ইন্দ্র প্রীত হয়ে বললেন, সত্যবাদিনী, আমার বরে তোমার সকল পুত্রই জীবিত হ’ক। এখন তুমি পুরুষ বা স্ত্রী কি চাও বল। রাজা বললেন, আমি স্ত্রীরূপেই থাকতে চাই। ইন্দ্র কারণ জিজ্ঞাসা করলে রাজা বললেন, দেবরাজ, স্ত্রীপুরুষের সংযোগকালে স্ত্রীরই অধিক সুখ হয়, আমি স্ত্রীভাবেই তুষ্ট আছি। ইন্দ্র ‘তাই হ’ক’ বলে চলে গেলেন।