অনুশাসনপর্ব: ৯। স্ত্রীজাতির কুৎসা — বিপুলের গুরুপত্নীরক্ষা

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, শোনা যায় স্ত্রীজাতি লঘুচিত্ত এবং সকল দোষের মূল। আপনি তাদের স্বভাব সম্বন্ধে বলুন। ভীষ্ম বললেন, আমি তোমাকে নারদ ও পঞ্চচূড়ী (বেশ্যা) পঞ্চচূড়ার কথা বলছি শোন। — একদিন নারদ বিচরণ করতে করতে ব্রহ্মলোকবাসিনী অপ্সরা পঞ্চচূড়াকে দেখতে পেলেন। নারদ বললেন, সুন্দরী, স্ত্রীজাতির স্বভাব কিপ্রকার তা আমি তোমার কাছে শুনতে ইচ্ছা করি। পঞ্চচূড়া বললেন, আমি স্ত্রী হয়ে স্ত্রীজাতির নিন্দা করতে পারব না, এমন অনুরোধ করা আপনার উচিত নয়। নারদ বললেন, তোমার কথা যথার্থ, কিন্তু মিথ্যা বললেই দোষ হয়, সত্য কথায় দোষ নেই। তখন চারুহাসিনী পঞ্চচূড়া বললেন, দেবর্ষি, নারীদের এই দোষ যে তারা সদ্বংশীয়া রূপবতী ও সধবা হ’লেও সদাচার লঙ্ঘন করে। তাদের চেয়ে পাপিষ্ঠ কেউ নেই, তারা সকল দোষের মূল। ধনবান রূপবান ও বশীভূত পতির জন্যও তারা প্রতীক্ষা করতে পারে না, যে পুরুষ কাছে গিয়ে কিঞ্চিৎ চাটুবাক্য বলে তাকেই কামনা করে। উপবাচক পুরুষের অভাবে এবং পরিজনদের ভয়েই নারীরা পতির বশে থাকে। তাদের অগম্য কেউ নেই, পুরুষের বয়স বা রূপ তারা বিচার করে না। রূপযৌবনবতী সুবেশা স্বৈরিণীকে দেখলে কুলস্ত্রীরাও সেইরূপ হতে ইচ্ছা করে। পুরুষ না পেলে তারা পরস্পরের সাহায্যে কামনা পূরণ করে। সুরূপ পুরুষ দেখলেই তাদের ইন্দ্রিয়বিকার হয়। যম পবন মৃত্যু পাতাল বড়বানল ক্ষুরধারা বিষ সর্প ও অগ্নি — এই সমস্তই একাধারে নারীতে বর্তমান।

প্রসঙ্গক্রমে ভীষ্ম বললেন, পুরাকালে বিপুল যেপ্রকারে তাঁর গুরুপত্নীকে রক্ষা করেছিলেন তা বলছি শোন। — দেবশর্মা নামে এক ঋষি ছিলেন, তাঁর পত্নীর নাম রুচি। অতুলনীয়া সুন্দরী রুচির উপর ইন্দ্রের লোভ ছিল। দেবশর্মা স্ত্রীচরিত্র ও ইন্দ্রের পরস্ত্রীলালসা জানতেন সেজন্য রুচিকে সাবধানে রক্ষা করতেন। একদিন তিনি তাঁর প্রিয়শিষ্য বিপুলকে বললেন, আমি যজ্ঞ করতে যাচ্ছি, তুমি তোমার গুরুপত্নীকে সাবধানে রক্ষা করবে। সুরেশ্বর ইন্দ্র রুচিকে সর্বদা কাম- করেন; তিনি বহুপ্রকার মায়া জানেন, বজ্রধারী কিরীটী, চণ্ডাল, জটাধারী অথবা কুরূপ, রূপবান, যুবা, বৃদ্ধ, ব্রাহ্মণ বা অন্য বর্ণ, পশুপক্ষী বা মক্ষিকামশকের রূপ ধারণ করতে পারেন। তিনি বায়ুরূপেও এখানে আসতে পারেন। লুব্ধ কুকুর যেমন যজ্ঞের ঘৃত লেহন করে, সেইরূপ দেবরাজ যেন রুচিকে স্পর্শ না করেন।

দেবশর্মা চলে গেলে বিপুল ভাবলেন, মায়াবী ইন্দ্রকে নিবারণ করা অস্মৎ- পক্ষে দুঃসাধ্য, আমি পৌরুষ দ্বারা গুরুপত্নীকে রক্ষা করতে পারব না। অতএব আমি যোগবলে এঁর শরীরে প্রবেশ করে পদ্মপত্রে জলবিন্দুর ন্যায় নির্লিপ্ত হয়ে অবস্থান করব, তাতে আমার অপরাধ হবে না। এইরূপ চিন্তা করে মহাতপা বিপুল রুচির নিকটে বসলেন এবং নিজের নেত্ররশ্মি রুচির নেত্রে সংযোজিত করে বায়ু যেমন আকাশে যায় সেইরূপ গুরুপত্নীর দেহে প্রবেশ করলেন। রুচি স্তম্ভিত হয়ে রইলেন, তাঁর দেহমধ্যে বিপুল ছায়ার ন্যায় অবস্থান করতে লাগলেন।

এমন সময় ইন্দ্র লোভনীয় রূপ ধারণ করে সেখানে এসে দেখলেন, আলেখ্য চিত্রিত মূর্তির ন্যায় বিপুল স্তম্ভনেত্রে বসে আছেন, তাঁর নিকটে পূর্ণচন্দ্রনিভাননা পদ্মপলাশাক্ষী রুচিও রয়েছেন। ইন্দ্রের রূপ দেখে বিস্মিত হয়ে রুচি দাঁড়িয়ে উঠে বলবার চেষ্টা করলেন, ‘তুমি কে?’ কিন্তু পারলেন না। ইন্দ্র মধুরবাক্যে বললেন, সুন্দরী, আমি ইন্দ্র, কামার্ত হয়ে তোমার কাছে এসেছি, আমার অভিলাষ পূর্ণ কর। রুচিকে নিশ্চেষ্ট ও নির্বিকার দেখে ইন্দ্র আবার তাঁকে আহ্বান করলেন, রুচিও উত্তর দেবার চেষ্টা করলেন। তখন বিপুল গুরুপত্নীর মুখ দিয়ে বললেন, কিজন্য এসেছ? এই বাক্য নির্গত হওয়ায় রুচি লজ্জিত হলেন, ইন্দ্রও উদ্বিগ্ন হলেন। তার পর দেবরাজ দিব্যদৃষ্টি দ্বারা দেখলেন, মহাতপা বিপুল দর্পণলিপ্ত প্রতিবিম্বের ন্যায় রুচির দেহমধ্যে রয়েছেন। ইন্দ্র শাপের ভয়ে গ্রস্ত হয়ে কাঁপতে লাগলেন। বিপুল তখন নিজের দেহে প্রবেশ করে বললেন, অজিতেন্দ্রিয় দুর্বুদ্ধি পাপাত্মা পুরন্দর, তুমি দেবতা আর মানুষের পূজা অধিক দিন ভোগ করবে না; গৌতমের শাপে তোমার সর্বদেহে যোনিচিহ্ন হয়েছিল তা কি ভুলে গেছ? আমি গুরুপত্নীকে রক্ষা করছি, তুমি দূর হও, আমার গুরু তোমাকে দেখলে এখনই দগ্ধ করে ফেলবেন। তুমি নিজেকে অমর ভেবে আমাকে অবজ্ঞা ক’রো না, তপস্যায় অসাধ্য কিছু নেই।

ইন্দ্র কোনও উত্তর দিলেন না, লজ্জিত হয়ে তখনই অন্তর্হিত হলেন।

ক্ষণকাল পরে দেবশর্মা যজ্ঞ সমাপ্ত করে ফিরে এলেন এবং সকল বৃত্তান্ত শুনে প্রীত হয়ে বিপুলকে এই বর দিলেন যে তাঁর ধর্মে একান্ত নিষ্ঠা হবে। তার পর গুরুর অনুমতি নিয়ে বিপুল কঠোর তপস্যায় রত হলেন এবং কীর্তি ও সিদ্ধি লাভ ক'রে স্পর্ধিত হয়ে বিচরণ করতে লাগলেন।

কিছুকাল পরে অঙ্গরাজ চিত্ররথের পত্নী প্রভাবতী এক মহোৎসবে তাঁর ভগিনী রুচিকে নিমন্ত্রণ করলেন। এই সময়ে আকাশগামিনী এক দিব্যাঙ্গনার অঙ্গ থেকে কতকগুলি পুষ্প ভূপতিত হ’ল। রুচি সেই পুষ্পে তাঁর কেশকলাপ ভূষিত ক'রে ভগ্নী প্রভাবতীর নিমন্ত্রণ রক্ষা করলেন। প্রভাবতী রুচিকে বললেন, আমাকে এইরূপ পুষ্প আনিয়ে দাও। দেবশর্মার আদেশে বিপুল সেই ভূপতিত অম্লান পুষ্প সংগ্রহ ক'রে অঙ্গরাজধানী চম্পানগরীতে যাত্রা করলেন। যেতে যেতে তিনি পথিমধ্যে দেখলেন, এক নরমিথুন (নরনারী) পরস্পরের হাত ধ'রে ঘুরছে এবং একজন অন্যজনের চেয়ে শীঘ্র চলছে ব’লে কলহ করছে। অবশেষে তারা এই শপথ করলে — আমাদের মধ্যে যে মিথ্যা বলছে সে যেন পরলোকে বিপুলের ন্যায় গতি পায়। এই কথা শুনে বিপুল চিন্তিত হলেন এবং আরও কিছুদূর গিয়ে দেখলেন, ছয় জন লোক স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত পাশা নিয়ে খেলছে। তারাও শপথ করলে — আমাদের মধ্যে যে অন্যায় করবে সে যেন বিপুলের গতি পায়। তখন বিপুলের মনে পড়ল, তিনি যে গুরুপত্নীর দেহে প্রবেশ করেছিলেন তা গুরুকে জানান নি। বিপুল পুষ্প নিয়ে চম্পানগরীতে এলে দেবশর্মা বললেন, তুমি পথে যাঁদের দেখেছ তাঁরা তোমার কার্য জানেন, আমি আর কিছু জানি। সেই মিথুন যাঁরা চক্রবৎ আবর্তন করেন তাঁরা অহোরাত্র, এবং পাশে বসা ছয় পুরুষ ছয় ঋতু। এঁরা সকলেই তোমার দুষ্কৃত জানেন। মানুষ নির্জনে দুষ্কর্ম করলেও অহোরাত্র ও ছয় ঋতু তা দেখেন। তুমি রুচিকে রক্ষা ক'রে হৃষ্ট ও গর্বিত হয়েছিলে, কিন্তু ব্যভিচার আশঙ্কা করে আমাকে সব কথা জানাও নি, এই অপরাধ তোমাকে তাঁরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তুমি অন্য উপায়ে দেবকন্যা রুচিকে রক্ষা করতে পারবে না বুঝে তাঁর শরীরে প্রবেশ করেছিলে, কিন্তু তাতে তোমার কোনও পাপ হয় নি। বৎস, আমি প্রীত হয়েছি, তুমি স্বর্গলোক লাভ ক’রে সুখী হবে।

আখ্যান শেষ ক'রে ভীষ্ম বললেন, যুধিষ্ঠির, স্ত্রীলোককে সর্বদা রক্ষা করা উচিত। সাধ্বী ও অসাধ্বী দুইপ্রকার স্ত্রী আছে, লোকমাতা সাধ্বী স্ত্রীগণ এই পৃথিবী ধারণ করেন। দুশ্চরিত্রা কুলনাশিনী অসাধ্বী স্ত্রীদের গাত্রলক্ষণ দেখলেই চেনা যায়, তাদের সাবধানে রক্ষা করতে হয়, নতুবা তারা ব্যভিচারিণী হয় এবং প্রাণহানি করে।