অনুশাসনপর্ব: ১০। বিবাহচ্ছেদ — দুহিতার অধিকার — বর্ণসংকর — পুত্রভেদ
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, কিরূপ পাত্রে কন্যাদান কর্তব্য? ভীষ্ম বললেন, স্বভাব চরিত্র বিদ্যা কুল ও কার্য দেখে গুণবান পাত্রে কন্যাদান করা উচিত। এইরূপ বিবাহের নাম ব্রাহ্মবিবাহ, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পক্ষে এই বিবাহই প্রশস্ত। বরকন্যার পরস্পরের ইচ্ছায় বিবাহকে গান্ধর্ব বলা হয়। ধন দিয়ে কন্যা ক্রয় করে যে বিবাহ হয় তার নাম আসুর। আত্মীয়বর্গকে হত্যা করে রোরুদ্যমানা কন্যার সহিত বিবাহের নাম রাক্ষস। শেষোক্ত দুই বিবাহ নিন্দনীয়। ব্রাহ্মণাদি প্রত্যেক বর্ণের পুরুষ তার সবর্ণের বা নিম্নবর্তী অন্যান্য বর্ণের স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারে। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সবর্ণা পত্নীই শ্রেষ্ঠ। ত্রিশ বৎসরের পাত্র দশ বৎসরের কন্যাকে এবং একুশ বৎসরের পাত্র সাত বৎসরের কন্যাকে বিবাহ করবে। (১) ঋতুমতী হলে কন্যা তিন বৎসর বিবাহের জন্য অপেক্ষা করবে, তার পর সে স্বয়ং পতি অন্বেষণ করে নেবে। মন্ত্রপাঠ ও হোম করে কন্যা সম্প্রদান করলে বিবাহ সিদ্ধ হয়, কেবল বাগ্দান করলে বা পণ নিলে হয় না। সপ্তপদীগমনের পর পাণিগ্রহণমন্ত্র সম্পূর্ণ হয়।
যুধিষ্ঠির বললেন, যদি কন্যা থাকে তবে অপুত্রক ব্যক্তির ধন আর কেউ পেতে পারে কি? ভীষ্ম বললেন, দুহিতা পুত্রের সমান, তার পৈতৃক ধন আর কেউ নিতে পারে না। পুত্র থাক বা না থাক, মাতার যৌতুকধনে কেবল দুহিতারই অধিকার। অপুত্রক ব্যক্তির দৌহিত্রও পুত্রের সমান অধিকারী।
যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি বর্ণসংকরের উৎপত্তি ও কর্মের বিবরণ বলুন। ভীষ্ম বললেন, পিতা যদি ব্রাহ্মণ হয়, তবে ব্রাহ্মণীর পুত্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ার পুত্র মূর্দ্ধাভিষিক্ত, বৈশ্যার পুত্র অন্বষ্ঠ, এবং শূদ্রার পুত্র পারশব নামে উক্ত হয়। পিতা যদি ক্ষত্রিয় হয় তবে ক্ষত্রিয়ার পুত্র ক্ষত্রিয়, বৈশ্যার পুত্র মাহিষ্য, এবং শূদ্রার পুত্র উগ্র নামে কথিত হয়। পিতা বৈশ্য হলে বৈশ্যার পুত্রকে বৈশ্য এবং শূদ্রার পুত্রকে করণ বলা হয়। শূদ্র-শূদ্রার পুত্রে শূদ্রই হয়। নিম্নবর্ণের পিতা ও উচ্চবর্ণের মাতার সন্তান নিন্দনীয় হয়। ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণীর পুত্রে সূত, তাদের কর্ম রাজাদের স্তুতিপাঠ। বৈশ্য-ব্রাহ্মণীর পুত্রে বৈদেহক বা সৌদগল্য, তাদের কর্ম অন্তঃপুর-রক্ষা, তাদের উপনয়নাদি সংস্কার নেই। শূদ্র-ব্রাহ্মণীর পুত্রে চন্ডাল, তারা কুলের কলঙ্ক, গ্রামের বহির্দেশে বাস করে এবং ঘাতক (জল্লাদ)এর কর্ম করে। বৈশ্য-ক্ষত্রিয়ার পুত্রে বাক্যজীবী বন্দী বা মাগধ। শূদ্র-ক্ষত্রিয়ার পুত্রে মৎস্যজীবী নিষাদ। শূদ্র-বৈশ্যের পুত্রে আয়োগব (সূত্রধর)। শাস্ত্রে কেবল চতুর্বর্ণের ধর্ম নির্দিষ্ট আছে, বর্ণসংকর জাতির ধর্মের বিধান নেই, তাদের সংখ্যারও ইয়ত্তা নেই।
তার পর ভীষ্ম বললেন, ঔরসজাত পুত্রে আত্মসমরূপ। পতির অনুমতিতে অন্য কর্তৃক উৎপাদিত সন্তানের নাম নিরুক্তজ, বিনা অনুমতিতে সন্তান হলে তার নাম প্রসূতিজ। বিনামূল্যে প্রাপ্ত অপরের পুত্রে দত্তকপুত্র, মূল্য দ্বারা প্রাপ্ত কৃতকপুত্র। গর্ভবতী স্ত্রীর বিবাহের পর যে পুত্র হয় তার নাম অধোঢ়। অবিবাহিত কুমারীর পুত্রে কানীন।