অনুশাসনপর্ব: ১১। বল ও নহুষ

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, যাদের সঙ্গে একত্র বাস করা যায় তাদের উপর কিরূপ স্নেহ হয়? ভীষ্ম বললেন, আমি এক ইতিহাস বলছি শোন। — পুরাকালে ভৃগুবংশজাত মহর্ষি চ্যবন ব্রতধারী হয়ে দ্বাদশ বৎসর গঙ্গাযমুনার জলমধ্যে বাস করেছিলেন। তিনি সর্বভূতের বিশ্বাসভাজন ছিলেন, মৎস্যাদি জলচর নির্ভরে তাঁর ওষ্ঠ আঘ্রাণ করত। একদিন ধীবরগণ জাল ফেলে বহু মৎস্য ধরলে, সেই সঙ্গে চ্যবনকেও তারা জালবদ্ধ করে তীরে তুলল। তাঁর পিঙ্গলবর্ণ শ্মশ্রু, মস্তকের জটা এবং শৈবাল-শঙ্খ-শম্বুক-মণ্ডিত দেহ দেখে ধীবরগণ কৃতাঞ্জলিপুটে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলে। মৎস্যদের মরণাপন্ন দেখে চ্যবন কৃপাবিষ্ট হয়ে বার বার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। ধীবরগণ বললে, মহামুনি, আমাদের অজ্ঞানকৃত পাপ ক্ষমা করুন, আদেশ করুন আমরা আপনার কি প্রিয়কার্য করব। চ্যবন বললেন, আমি এই মৎস্যদের সঙ্গে একত্র বাস করেছি, এদের ত্যাগ করতে পারি না; আমি মৎস্যদের সঙ্গেই প্রাণত্যাগ করব বা বিক্রীত হব।

ধীবরগণ অত্যন্ত ভীত হয়ে রাজা নহুষের কাছে গিয়ে সকল বৃত্তান্ত জানালে। অমাত্য ও পুরোহিতের সঙ্গে নহুষ সত্বর এসে চ্যবনকে বললেন, দ্বিজোত্তম, আপনার কি প্রিয়কার্য্য করব বলুন। চ্যবন বললেন, এই মৎস্যজীবীরা অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েছে, তুমি এদের মৎস্যের মূল্য এবং আমারও মূল্য দাও। নহুষ সহস্র মুদ্রা দিতে চাইলে চ্যবন বললেন, আমার মূল্য সহস্র মুদ্রা নয়, তুমি বিবেচনা ক’রে উপযুক্ত মূল্য দাও। নহুষ ক্রমে ক্রমে লক্ষ মুদ্রা, কোটি মুদ্রা, অর্দ্ধ রাজ্য ও সমগ্র রাজ্য দিতে চাইলেন, কিন্তু চ্যবন তাতেও সম্মত হলেন না। নহুষ দুঃখিত ও চিন্তাকুল হলেন। এমন সময়ে এক গব্যজাত ফলমূলাশী তপস্বী এসে নহুষকে বললেন, মহারাজ, ব্রাহ্মণ আর গো অমূল্য, আপনি এই ব্রাহ্মণের মূল্য-স্বরূপ একটি গাভী দিন। নহুষ তখন হৃষ্ট হয়ে চ্যবনকে বললেন, ব্রহ্মর্ষি, গাত্রোত্থান করুন, আপনাকে আমি গাভী দ্বারা ক্রয় করলাম। চ্যবন তুষ্ট হয়ে বললেন, এখন তুমি যথার্থই আমাকে ক্রয় করেছ। গোধন তুল্য কোনও ধন নেই; গোমাহাত্ম্য কীর্তন ও শ্রবণ, গোদান এবং গোদর্শন করলে সর্বপাপনাশ ও কল্যাণ হয়। গাভী লক্ষ্মীর মূল এবং স্বর্গের সোপান স্বরূপ। গাভী থেকেই যজ্ঞীয় হবি উৎপন্ন হয়। সমগ্র গোমাহাত্ম্য বলা আমার সাধ্য নয়।

ধীবরগণ চ্যবনকে বললে, ভগবান, আপনি প্রসন্ন হয়ে এই গাভী গ্রহণ করুন। চ্যবন বললেন, ধীবরগণ, আমি এই গাভী নিলাম, তোমরা পাপমুক্ত হয়ে এই মৎস্যদের সঙ্গে স্বর্গে যাও। তার পর চ্যবন নহুষকে আশীর্বাদ ক’রে নিজ আশ্রমে চলে গেলেন।