অনুশাসনপর্ব: ১২। চ্যবন ও কুশিক

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, পরশুরাম ব্রহ্মর্ষির বংশে জন্মে ক্ষত্রধর্মী হলেন কেন? আবার, ক্ষত্রিয় কুশিকের বংশে জন্মে বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণ কি ক’রে হলেন? ভীষ্ম বললেন, ভৃগুনন্দন চ্যবন জানতেন যে কুশিকবংশ থেকে তাঁর বংশে অত্যাচার সংক্রমিত হবে, সেজন্য তিনি কুশিকবংশ দগ্ধ করতে ইচ্ছা করলেন। চ্যবন কুশিকের কাছে গিয়ে বললেন, মহারাজ, আমি তোমার সঙ্গে বাস করতে চাই। কুশিক তাঁকে সসম্মানে গ্রহণ ক’রে বললেন, আমার রাজ্য ধন ধান্য সমস্তই আপনার। চ্যবন বললেন, আমি ওসব চাই না, আমি এক ব্রতের অনুষ্ঠান করব, তুমি ও তোমার মহিষী অকুণ্ঠিত হয়ে আমার পরিচর্য্যা কর। কুশিক সানন্দে সম্মত হয়ে তাঁকে একটি উত্তম শয়নগৃহে নিয়ে গেলেন। সূর্যাস্ত হলে চ্যবন আহারের পর শয্যায় শুয়ে বললেন, তোমরা আমাকে জাগিও না, নিরন্তর পদসেবা কর। কুশিক ও তাঁর মহিষী আহারনিদ্রা ত্যাগ ক’রে চ্যবনের পদসেবা করতে লাগলেন। একুশ দিন পরে চ্যবন শয্যা থেকে উঠে শরণগৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন, কুশিক ও তাঁর মহিষী অত্যন্ত শ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত হ’লেও পিছনে পিছনে গেলেন। ক্ষণকাল পরে চ্যবন অন্তর্হিত হলেন।

সপত্নীক কুশিক অন্বেষণ ক’রে কোথাও চ্যবনকে পেলেন না, তখন তাঁরা শরণগৃহে এসে দেখলেন, মহর্ষি শয্যায় শুয়ে আছেন। কুশিক ও তাঁর মহিষী বিস্মিত হয়ে পুনবর্বার পদসেবায় রত হলেন। আরও একুশ দিন পরে চ্যবন উঠে বললেন, আমি স্নান করব, আমার দেহে তৈলমর্দন কর। সপত্নীক কুশিক চ্যবনের দেহে বহুমূল্য শতপাক তৈল মর্দন করতে লাগলেন। তার পর চ্যবন স্নানশালায় গিয়ে স্নান ক'রে আবার অন্তর্হিত হলেন। পুনবর্বার আবির্ভূত হয়ে তিনি সিংহাসনে বসলেন এবং অন্ন আনবার আদেশ দিলেন। অন্ন মাংস শাক পিষ্টক ফল প্রভৃতি আনা হ’লে চ্যবন তাঁর শয্যা-আসনাদির সঙ্গে সমস্ত ভোজ্যদ্রব্যে অগ্নিদান ক’রে আবার অন্তর্হিত হলেন এবং পরদিন দেখা দিলেন।

এইরূপে অনেক দিন গেল, চ্যবন কুশিকের কোনও রন্ধ্র (ত্রুটি) দেখতে পেলেন না। একদিন তিনি বললেন, তুমি ও তোমার মহিষী আমাকে রথে বহন ক’রে নিয়ে চল; পথে যারা প্রার্থী হয়ে আসবে তাদের আমি প্রচুর ধনরত্ন দিতে ইচ্ছা করি, তুমি তার আয়োজন কর। রাজা ও মহিষী রথ টানতে লাগলেন, রাজভৃত্যগণ ধনরত্ন নিয়ে পশ্চাতে চলল। চ্যবনের কষাঘাতে সপত্নীক কুশিক ক্ষত-বিক্ষত হলেন, পুরবাসিগণ শোকাফুল হয়েও শাপভয়ে নীরব রইল। অজস্র ধন দান করার পর চ্যবন রথ থেকে নেমে বললেন, মহারাজ, তোমাদের উপর আমি প্রীত হয়েছি, বর চাও। এই ব’লে তিনি রাজা ও মহিষীর দেহ হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। কুশিক বললেন, মহর্ষি, আপনার প্রসাদে আমাদের শ্রান্তি ও বেদনা দূর হয়েছে। চ্যবন বললেন, এখন তোমরা গৃহে যাও, আমি কিছুকাল এই গঙ্গাতীরে বাস করব, তোমরা কাল আবার এসো। দুঃখিত হয়ো না, শীঘ্রই তোমাদের সকল কামনা পূর্ণ হবে।

পরদিন প্রভাতে কুশিক ও তাঁর মহিষী গঙ্গাতীরে এসে দেখলেন, সেখানে গন্ধর্বনগর তুল্য কাঞ্চনময় প্রাসাদ, রমণীয় পর্বত, পদ্মশোভিত সরোবর, চিত্রশালা, তোরণ, বহুবৃক্ষসমন্বিত উদ্যান প্রভৃতি সৃষ্ট হয়েছে। কুশিক ভাবলেন, আমি কি স্বপ্ন দেখছি, না সশরীরে পরমলোক লাভ করেছি, না উত্তরকুরু বা অমরাবর্তীতে এসেছি? কিছুকাল পরে সেই কানন প্রাসাদ প্রভৃতি অদৃশ্য হয়ে গেল, গঙ্গাতীর পূর্বের ন্যায় নীরব হ'ল। কুশিক তাঁর মহিষীকে বললেন, তপোবলেই এই সফল হতে পারে, ত্রিলোকের রাজ্য অপেক্ষা তপস্যা শ্রেষ্ঠ। মহর্ষি চ্যবনের কি আশ্চর্য শক্তি! ব্রাহ্মণরা সর্ববিষয়ে পবিত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন; রাজ্য সহজেই পাওয়া যায়, কিন্তু ব্রাহ্মণত্ব অতি দুর্লভ।

কুশিক ও তাঁর মহিষীকে ডেকে চ্যবন বললেন, মহারাজ, তুমি ইন্দ্রিয় ও মন জয় করেছ, এখন কঠোর পরীক্ষা থেকে মুক্ত হলে। আমি প্রীত হয়েছি, বর চাও। কুশিক বললেন, ভৃগুশ্রেষ্ঠ, আপনার নিকটে থেকে অগ্নিমধ্যবর্তী ব্যক্তির ন্যায় আমরা যে দগ্ধ হই নি এই যথেষ্ট। যদি প্রীত হয়ে থাকেন তো বলুন, আপনি যেসকল অদ্ভুত কার্য করেছেন তার উদ্দেশ্য কি? চ্যবন বললেন, মহারাজ, আমি ব্রহ্মার নিকট শুনেছিলাম যে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের বিরোধের ফলে কুলসংকর হবে, তোমার এক তেজস্বী বলবান পুত্র জন্মাবে। তোমার বংশ দগ্ধ করবার জন্যই আমি এখানে এসেছিলাম, কিন্তু বহু উৎপীড়ন করেও তোমাকে ক্রুদ্ধ করতে পারি নি, অভিশাপ দেবার কোনও ছিদ্রও পাই নি। তোমাদের প্রীতির জন্যই এই কানন সৃষ্টি করেছিলাম, তাতে তোমরা ক্ষণকাল সশরীরে স্বর্গসুখ অনুভব করেছ। রাজা, তুমি ব্রাহ্মণত্ব ও তপশ্চর্যার আকাঙ্ক্ষা করেছ তাও আমি জানি। ব্রাহ্মণত্ব অতি দুর্লভ, ক্ষত্রিয় ও তপস্বিত্ব আরও দুর্লভ। তথাপি তোমার কামনা সিদ্ধ হবে, তোমার অধস্তন তৃতীয় পুরুষ (বিশ্বামিত্র) ব্রাহ্মণত্ব লাভ করবেন। ক্ষত্রিয়গণ ভৃগুবংশীয়দের যজমান, তথাপি তারা দৈববশে ভৃগুবংশীয়গণকে বধ করবে। তার পর আমাদের ভৃগুবংশে ঊর্ধ্ব (ঔর্ব) (১) নামে এক মহাতেজস্বী পুরুষ জন্মাবেন, তাঁর পুত্র ঋচীক সমস্ত ধনুর্বেদ আয়ত্ত করবেন এবং পুত্র জমদগ্নিকে তা দান করবেন। জমদগ্নির সহিত তোমার পুত্র গাধির কন্যার বিবাহ হবে; তাঁদের পুত্র মহাতেজা পরশুরাম (১) ক্ষত্রাচারী হবেন। গাধির পুত্র বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণত্ব লাভ করবেন। এই ভবিষ্যদ্বাণী করে চ্যবন তীর্থযাত্রায় গেলেন।

(১) আদিপর্ব ৩১ এবং বনপর্ব ২৬-পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।