অনুশাসনপর্ব: ১৩। দানধর্ম্ম — অপালক রাজা — কপিলা — লক্ষ্মী ও গোময়
যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম তপস্যা ও বিবিধ ব্রতাচরণের ফল এবং ধেনু ভূমি জল সুবর্ণ অন্ন মৃগমাংস ঘৃত দুগ্ধ তিল বস্ত্র শয্যা পাদূকা প্রভৃতি দানের ফল সবিস্তারে বিবৃত ক'রে বললেন, যাচক অপেক্ষা অযাচক ব্রাহ্মণকে দান করা শ্রেয়, যাচকরা দস্যুর ন্যায় দাতাকে উদ্বিগ্ন করে। যুধিষ্ঠির, তোমার রাজ্যে যদি অযাচক দরিদ্র ব্রাহ্মণ থাকেন তবে তুমি তাঁদের ভস্মাবৃত অগ্নির ন্যায় জ্ঞান করবে; তাঁদের সেবা অবশ্য কর্তব্য।
তার পর ভীষ্ম বললেন, রাজাদের যজ্ঞানুষ্ঠান করা উচিত, কিন্তু প্রজাপীড়ন ক'রে নয়। যে রাজ্যে বালকেরা স্বাদু খাদ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু খেতে পায় না, ব্রাহ্মণাদি প্রজারা ক্ষুধায় অবসন্ন হয়, পতিপুত্রদের মধ্য থেকে রোরুদ্যমানা রমণী সবলে অপহৃত হয়, সে রাজার জীবনে ধিক। যিনি প্রজা রক্ষা করতে পারেন না, সবলে ধন হরণ করেন, সেই নির্দয় কলিতুল্য রাজাকে প্রজাগণ মিলিত হয়ে বধ করবে। যিনি প্রজারক্ষায় আশ্বাস দিয়ে রক্ষা করেন না সেই রাজাকে ক্ষিপ্ত কুক্কুরের ন্যায় বিনষ্ট করা উচিত। মনুস্মৃতি অনুসারে প্রজার পাপ ও পুণ্যের চতুর্থাংশ রাজাতে সংক্রমিত হয়।
তার পর ভীষ্ম গোদানের ফল সবিশেষ কীর্তন ক'রে বললেন, গোসমূহের মধ্যে কপিলাই শ্রেষ্ঠ। প্রজাসৃষ্টির পর প্রজাপতি দক্ষ অমৃত পান করেছিলেন, তাঁর উদ্গার থেকে কামধেনু সুরভি উৎপন্ন হন। সুরভীই সুবর্ণবর্ণা কপিলা গাভীদের জন্ম দিয়েছিলেন। একদা কপিলাদের দুগ্ধফেন মহাদেবের মস্তকে পতিত হওয়ায় তিনি ক্রুদ্ধ হন, তাঁর দৃষ্টিপাতের ফলে কপিলাদের গায় বিবিধবর্ণ হয়েছে। প্রজাপতি দক্ষ তাঁকে বলেছিলেন, আপনি অমৃতে অভিষিক্ত হয়েছেন। দক্ষ মহাদেবকে একটি বৃষভ ও কতকগুলি গাভী দিয়েছিলেন, সেই বৃষভ মহাদেবের বাহন ও লাঞ্ছন হ'ল।
যুধিষ্ঠির, আমি এক পুরাতন ইতিহাস বলছি শোন। — একদিন লক্ষ্মী মনোহরবেশে গাভীদের নিকটে এলে তারা জিজ্ঞাসা করলে, দেবী, তুমি কে? তোমার রূপের তুলনা নেই। লক্ষ্মী বললেন, আমি লোককান্তা শ্রী; আমি দৈত্যদের ত্যাগ করেছি সেজন্য তারা বিনষ্ট হয়েছে, আমার আশ্রয়ে দেবতারা চিরকাল সুখভোগ করছেন। গোগণ, আমি তোমাদের দেহে নিত্য বাস করতে ইচ্ছা করি, তোমরা শ্রীযুক্ত হও। গাভীরা বললে, তুমি অস্থিরা চপলা, বহুলোকের অনুরক্তা, আমরা তোমাকে চাই না। আমরা সকলেই কান্তিমতী, তোমাকে আমাদের প্রয়োজন নেই। লক্ষ্মী বললেন, অনাহুত হয়ে যে আসে তার অপমান লাভ হয় — এই প্রবাদ সত্য। মনুষ্যদেব দানব গন্ধর্বাদি উগ্র তপস্যা দ্বারা আমার সেবা করেন; অতএব তোমরাও আমাকে গ্রহণ কর, ত্রিলোকে কেউ আমার অপমান করে না। তোমরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে আমি সকলের নিকট অবজ্ঞাত হব, অতএব তোমরা প্রসন্ন হও, আমি তোমাদের শরণাগত। তোমাদের দেহের কোনও স্থান কুৎসিত নয়, আমি তোমাদের অধোদেশেও বাস করতে সম্মত আছি। তখন গাভীরা মন্ত্রণা ক’রে বল্লেন, কল্যাণী যশস্বিনী, তোমার সম্মানরক্ষা আমাদের অবশ্য কর্ত্তব্য; তুমি আমাদের পবিত্র পুরীষ ও মূত্রে অবস্থান কর। লক্ষ্মী তুষ্ট হয়ে বল্লেন, তোমাদের মঙ্গল হ’ক, আমি সম্মানিত হয়েছি।