অনুশাসনপর্ব: ১৪। দানের অপাত্র — বশিষ্ঠাদির লোভসংবরণ

যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে ভীষ্ম শ্রাদ্ধকর্ম্মের বিধি সবিস্তারে বর্ণনা ক’রে বল্লেন, দৈব ও পিতৃকার্য্যে দানের পূর্ব্বে ব্রাহ্মণদের কুল শীল বিদ্যা ইত্যাদি বিচার করা উচিত। যে ব্রাহ্মণ ধূর্ত্ত ভ্রূণহত্যাকারী যক্ষ্মারোগী পশুপালক বিদ্যাহীন কুসীদজীবী বা রাজভৃত্য, যে পিতার সহিত বিবাদ করে, যার গৃহে উপপতি আছে, যে চোর পারদার্য্যিক শূদ্রযাজক বা শস্ত্রজীবী, যে কুকুর নিয়ে মৃগয়া করে, যাকে কুকুর দংশন করেছে, যে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পূর্ব্বে বিবাহ করেছে, যে কুশীলব (নট) বা কৃষিজীবী, যে কররেখা ও নক্ষত্রাদি দেখে শুভাশুভ নির্ণয় করে, এমন ব্রাহ্মণ অপাঙ্ক্তেয়, এদের দান করা উচিত নয়। দানগ্রহণও দোষজনক; যে ব্রাহ্মণ গুণবানের দান গ্রহণ করেন তিনি অল্পদোষী হন, যিনি নির্গুণের দান নেন তিনি পাপে নিমগ্ন হন। আমি এক পুরাতন ইতিহাস বলছি শোন। —

কলাপ অত্রি বশিষ্ঠ ভরদ্বাজ গৌতম বিশ্বামিত্র জমদগ্নি এবং বশিষ্ঠপত্নী অরুন্ধতী ব্রহ্মলোক লাভের নিমিত্ত কঠোর তপস্যা ক’রে পৃথিবী পর্য্যটন করছিলেন। গণ্ডা নামে এক কিঙ্করী এবং তার স্বামী পশুসখ নামক শূদ্র ঋষিদের পরিচর্য্যা করত। এই সময়ে অনাবৃষ্টির ফলে খাদ্যাভাবে লোকে অত্যন্ত দুৰ্ব্বল হয়ে গিয়েছিল। শিবিপুত্র শৈব্য-বৃষাদর্ভি এক যজ্ঞ ক’রে ঋষিগণকে নিজ পুত্র দক্ষিণাস্বরূপ দিয়েছিলেন; সেই পুত্র অকালে প্রাণত্যাগ করলে মহর্ষিগণ নিজের জীবনরক্ষার জন্য তাঁর দেহ স্থালীতে পাক করতে লাগলেন। তা দেখতে পেয়ে শৈব্য বল্লেন, আপনারা এই অভক্ষ্য বস্তু ত্যাগ করুন, আপনাদের পুষ্টির জন্য যা চান তাই আমি দেব। ঋষিরা বল্লেন, রাজাদের দান গ্রহণ করলে আপাততঃ সুখ হয় বটে, কিন্তু পরিণামে তা বিষতুল্য, দানপ্রতিগ্রহের ফলে সমস্ত তপস্যা নষ্ট হয়। যারা যাচক তাদেরই তুমি দান কর। এই ব’লে ঋষিরা অন্যত্র চ’লে গেলেন, তাঁরা যা পাক করছিলেন তা প’ড়ে রইল।

রাজা শৈব্যের আদেশে তাঁর মন্ত্রীরা বন থেকে উডুম্বর (ডুমুর) ফল সংগ্রহ ক’রে ঋষিদের দিতে লাগলেন। কিছুদিন পরে রাজা ফলের মধ্যে সুবর্ণ পূরে পাঠিয়ে দিলেন। মহর্ষি অত্রি সেই ফল গুরুভার দেখে বললেন, আমরা নির্বোধ নই, এই সুবর্ণময় ফল নিতে পারি না। ঋষিরা সেই স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চ’লে গেলেন। দান প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় শৈব্য ক্রুদ্ধ হয়ে এক যজ্ঞ করলেন। যজ্ঞািগ্নি থেকে যাতুধানী নামে এক ভয়ংকরী কৃত্যা উত্থিত হ’ল। রাজা সেই কৃত্যাকে বললেন, তুমি অত্রি প্রভৃতি সাত জন ঋষি, অরুন্ধতী, তাঁদের দাস পশুসখ এবং দাসী গণ্ডার কাছে যাও; তাদের নাম জেনে নিয়ে সকলকে বিনষ্ট কর।

ঋষিরা এক বনে ফলমূল খেয়ে বিচরণ করছিলেন। একদিন তাঁরা দেখলেন, এক স্থূলকায় পরিব্রাজক কুকুর নিয়ে তাঁদের দিকে আসছেন। অরুন্ধতী ঋষিদের বললেন, আপনাদের দেহ এমন পটু নয়। ঋষিরা বললেন, আমরা খাদ্যাভাবে কৃশ হয়েছি, আমাদের নিত্যকর্ম ও করতে পারি না; এই পরিব্রাজকের অভাব নেই সেজন্য সে ও তাঁর কুকুর স্থূলদেহ। তার পর সেই পরিব্রাজক নিকটে এসে ঋষিদের করস্পর্শ ক’রে বললেন, আমি আপনাদের পরিচর্যা করব। একদিন সকলে এক মনোহর সরোবরের নিকট উপস্থিত হলেন, যাতুধানী তা রক্ষা করছিল। ঋষিরা মৃণাল নিতে গেলে যাতুধানী বললে, আগে তোমরা নিজেদের নাম ও তার অর্থ বল তার পর মৃণাল নিও। ঋষিগণ অরুন্ধতী গণ্ডা ও পশুসখ নিজ নিজ নাম ও তার অর্থ জানালে যাতুধানী প্রত্যেককে বললে, তোমার নামের অর্থ বুঝলাম না, যা হ’ক, তুমি সরোবরে নামতে পার। অবশেষে পরিব্রাজক বললেন, এঁরা সকলে যেপ্রকারে নিজ নিজ নাম জানালেন আমি তেমন পারব না; আমার নাম শুনঃসখসখ (যম বা ধর্মের সখা)। যাতুধানী বললে, তোমার বাক্য সন্দিগ্ধ, পুনর্বার নাম বল। পরিব্রাজক বললেন, আমি একবার নাম বলেছি তথাপি তুমি বুঝতে পারলে না, অতএব এই ত্রিদণ্ডের আঘাতে তোমাকে বধ করব। এই ব’লে তিনি যাতুধানীর মস্তকে আঘাত করলেন, সে ভূপতিত হয়ে ভস্মসাৎ হ’ল।

ঋষিরা তখন মৃণাল তুলে তীরে রাখলেন এবং পুনর্বার জলে নেমে তর্পণ করতে লাগলেন। জল থেকে উঠে তাঁরা মৃণাল দেখতে পেলেন না। তখন তাঁরা প্রত্যেকে শপথ ক’রে অপহরণকারীর উদ্দেশে অভিশাপ দিলেন। পরিশেষে শুনঃসখ এই শপথ করলেন—যে চুরি করেছে সে বেদজ্ঞ বা ব্রহ্মচর্যসম্পন্ন ব্রাহ্মণকে কন্যাদান করুক এবং অথর্ববেদ অধ্যয়ন ক'রে স্নান করুক। ঋষিরা বললেন, তুমি যে শপথ করলে তা সকল ব্রাহ্মণেরই অভীষ্ট, তুমিই আমাদের মৃণাল চুরি করেছ। শুনঃসখ বললেন, আপনাদের কথা সত্য, আপনাদের পরীক্ষার জন্যই এমন করেছি। এই যাতুধানী রাজা শৈব্য-বৃষাদর্ভির আজ্ঞায় আপনাদের বধ করতে এসেছিল; আমি ইন্দ্র, আপনাদের রক্ষা করেছি। আপনারা সর্ববিধ প্রলোভন প্রত্যাখ্যান ক'রে ক্ষুধা সহ্য করেছেন, সেজন্য সর্বকামপ্রদ অক্ষয় লোক লাভ করবেন। তখন সকলে আনন্দিত হয়ে ইন্দ্রের সঙ্গে স্বর্গে গেলেন।