অনুশাসনপর্ব: ১৫। ছত্র ও পাদুকা — পুষ্প ধূপ ও দীপ

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, শ্রাদ্ধাদিতে যে ছত্র ও পাদুকা দেওয়া হয় তার প্রবর্তন কি প্রকারে হ’ল? ভীষ্ম বললেন, একদা জ্যৈষ্ঠ মাসে মধ্যাহ্নকালে মহর্ষি জমদগ্নি ধনু দ্বারা শর নিক্ষেপ ক'রে ক্রীড়া করছিলেন, তাঁর পত্নী রেণুকা সেই শর তুলে এনে দিচ্ছিলেন। প্রখর রৌদ্রে রেণুকার কষ্ট হ'তে লাগল। তাঁর বিলম্ব দেখে জমদগ্নি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, তোমার শর আনতে বিলম্ব হ’ল কেন? রেণুকা বললেন, সূর্যকিরণে আমার মস্তক ও চরণ সন্তপ্ত হয়েছিল, আমি বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। জমদগ্নি দিবা ধনু ও বহু শর নিয়ে সূর্যকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন। তখন দিবাকর ব্রাহ্মণের বেশে এসে বললেন, ব্রহ্মর্ষি, সূর্য আকাশে থেকে কিরণ দ্বারা রস আকর্ষণ করেন এবং বর্ষায় সেই রস বর্ষণ করেন, তা থেকে অন্ন উৎপন্ন হয়। সূর্যকে নিপাতিত ক’রে তোমার কি লাভ হবে? সূর্য আকাশে স্থির থাকেন না, তাঁকে তুমি কি ক'রে বিদ্ধ করবে? জমদগ্নি বললেন, আমি জ্ঞানের দ্বারা তোমাকে জানি, মধ্যাহ্নে তুমি অর্ধ নিমেষ কাল স্থির থাক, সেই সময়ে তোমাকে বিদ্ধ করব। সূর্য বললেন, আমি তোমার শরণ নিলাম। জমদগ্নি সহাস্যে বললেন, তবে তোমার ভয় নেই; কিন্তু এমন উপায় কর যাতে লোকে রৌদ্রতাপিত পথ দিয়ে বিনা কষ্টে যেতে পারে। তখন সূর্য জমদগ্নিকে ছত্র ও পাদুকা দিয়ে বললেন, মহর্ষি, এই দুইএর দ্বারা আমার তাপ থেকে মস্তক ও চরণ রক্ষিত হবে।

আখ্যান শেষ ক'রে ভীষ্ম বললেন, যুধিষ্ঠির, সূর্যই ছত্র ও পাদুকার প্রবর্তক, ব্রাহ্মণদের দান করলে মহান ধর্ম হয়। তার পর ভীষ্ম দেবর্চনায় পুষ্প ধূপ ও দীপের উপযোগিতা প্রসঙ্গে বললেন, পুষ্প মনকে আহ্লাদিত করে সেজন্য তার নাম সুমনঃ। কণ্টকহীন বৃক্ষের শ্বেতবর্ণ পুষ্পই দেবতাদের প্রীতিকর। পদ্মাদি জলজ পুষ্প গন্ধর্ব নাগ ও যক্ষগণকে প্রদেয়। কটু ও কণ্টকময় ওষধি এবং রক্তবর্ণ পুষ্প শত্রুদের অভিচারের জন্য অথর্ববেদে নির্দিষ্ট হয়েছে। ধূপ তিন প্রকার; গুগগুলু প্রভৃতিকে নির্যাস, কাষ্ঠাদি থেকে সারী, এবং মিশ্রিত উপাদান থেকে প্রস্তুত ধূপকে কৃত্রিম বলে। নির্যাসের মধ্যে গুগগুলু শ্রেষ্ঠ, সারী ধূপের মধ্যে অগুরু শ্রেষ্ঠ। শলকী (১) ও তজ্জাতীয় নির্যাসের ধূপ দৈত্যদের প্রিয়। সর্জরস (ধূনা) ও গন্ধকাষ্ঠ প্রভৃতি সংযোগে যে কৃত্রিম ধূপ হয় তা দেব দানব মানব সকলেরই প্রীতিকর। দীপ দান করলে মানুষের তেজ বৃদ্ধি পায়, উত্তরায়ণের রাত্রিতে দীপদান কর্তব্য।

(১) শলই, লবান বা শিলারস জাতীয়।