অনুশাসনপর্ব: ১৬। সদাচার — ভ্রাতার কর্ত্তব্য
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, মানুষকে শতায়ু ও শতবীর্য বলা হয়, তবে অকালমৃত্যু হয় কেন? কি করলে মানুষ আয়ু, কীর্তি ও শ্রী লাভ করতে পারে? ভীষ্ম বললেন, যারা দুরাচার তারা দীর্ঘ আয়ু পায় না, যে নিজের হিত চায় তাকে সদাচার পালন করতে হবে। প্রত্যহ ব্রাহ্ম মুহূর্তে উঠে ধর্মার্থচিন্তা ও আচমন ক'রে কৃতাঞ্জলি ও পূর্বমুখ হয়ে পূর্বসন্ধ্যার উপাসনা করবে। উদীয়মান ও অস্তগামী সূর্য দেখবে না; রাহুগ্রস্ত, জলে প্রতিফলিত এবং আকাশমধ্যগত সূর্যের দিকেও দৃষ্টিপাত করবে না। মূত্র-পুরীষ দেখবে না, স্পর্শও করবে না। একাকী অথবা অজ্ঞাত বা নীচজাতীয় লোকের সঙ্গে চলবে না। ব্রাহ্মণ গো রাজা বৃদ্ধ ভারবাহী গর্ভিণী ও দুর্বলকে পথ ছেড়ে দেবে। অন্যের ব্যবহৃত পাদুকা ও বস্ত্র ধরবে না। বৃথা মাংস এবং পৃষ্ঠদেশের মাংস খাবে না। সশব্দে ভোজন করবে না। মর্মভেদী বাক্য বলবে না; মুখ থেকে যে বাক্যবাণ নির্গত হয় তা কেবল মর্মস্থলেই বিদ্ধ হয়, তার আঘাতে লোকে দিবারাত্র দুঃখ পায়। কুঠার প্রভৃতিতে ছিন্ন বন আবার অঙ্কুরিত হয়, কিন্তু দুর্বাক্যজনিত হৃদয়ের ক্ষত সারে না। বাণ নারাচ প্রভৃতি অস্ত্র দেহ থেকে উদ্ধার করা যায়, কিন্তু বাক্যশল্য হৃদয় থেকে তুলে ফেলা যায় না। হীনাঙ্গ অতিরিক্তাঙ্গ বিদ্যাহীন রূপহীন নির্ধন বা দুর্বল লোককে উপহাস করবে না। পিষ্টক মাংস পায়স প্রভৃতি উত্তম খাদ্য দেবতার উদ্দেশ্যেই প্রস্তুত করবে, কেবল নিজের জন্য নয়। গর্ভিণী স্ত্রীতে গমন করবে না। পূর্ব বা দক্ষিণ দিকে মস্তক রেখে শয়ন করবে। ক্ষেত্রে বা গ্রামের নিকটে মলত্যাগ করবে না। ভোজনের পর কিঞ্চিৎ খাদ্য অবশিষ্ট রাখবে। আর্দ্রচরণে ভোজন করবে, কিন্তু শয়ন করবে না। বৃদ্ধকে অভিবাদন করবে এবং স্বয়ং আসন দেবে। বিবস্ত্র হয়ে স্নান বা শয়ন করবে না। উচ্ছিষ্ট হয়ে (এঁটো মুখে) অধ্যয়ন বা অধ্যাপনা করবে না। গুরুর সঙ্গে বিতণ্ডা বা গুরু নিন্দা করবে না। সৎকুলজাতা সুলক্ষণা বয়ঃস্থা কন্যাকেই বিবাহ করা বিজ্ঞ লোকের উচিত। নিমন্ত্রিত না হয়ে কোথাও যাবে না। মাতা পিতা প্রভৃতি গুরুজনের আজ্ঞা পালন করবে, তাদের উপদেশ বিচার করবে না। বেদ অস্ত্রবিদ্যা অশ্ব-হস্তী-আরোহণ ও রথচালন শিক্ষা করবে। ঋতুর পঞ্চম দিনে গর্ভাধান হ'লে কন্যা এবং ষষ্ঠ দিনে পুত্র হয় এই বুঝে পত্নীর সহবাস করবে। যথাশক্তি যজ্ঞ দ্বারা দেবতাদের আরাধনা করবে। যুধিষ্ঠির, তুমি সদাচার সম্বন্ধে আর যা জানতে চাও তা বেদজ্ঞ বৃদ্ধদের জিজ্ঞাসা ক’রো। সদাচারই ঐশ্বর্য কীর্তি আয়ু ও ধর্মের মূল।
তার পর ভীষ্ম ভ্রাতার কর্তব্য সম্বন্ধে এই উপদেশ দিলেন। — গুরু যেমন শিষ্যের প্রতি সেইরূপ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কনিষ্ঠের প্রতি ব্যবহার করবেন। শত্রুরা যাতে ভ্রাতাদের মধ্যে ভেদ সৃষ্টি না করে সে বিষয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সতর্ক থাকবেন। তিনি পৈতৃক অংশ থেকে কনিষ্ঠগণকে বঞ্চিত করবেন না। কনিষ্ঠ যদি দুষ্কর্ম করে তবে তার যাতে মঙ্গল হয় এমন চেষ্টা করবেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সৎ বা অসৎ যাই হ'ন, কনিষ্ঠের তাঁকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। পিতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাই পিতৃস্থানীয় হন, অতএব তাঁর আশ্রয়েই বাস করা কর্তব্য। জ্যেষ্ঠা ভগিনী ও জ্যেষ্ঠা ভ্রাতৃজায়া স্তন্যদায়িনী মাতার সমান।