অনুশাসনপর্ব: ১৭। মানসতীর্থ — বৃহস্পতির উপদেশ

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম উপবাসের গুণবর্ণনার পর তীর্থ সম্বন্ধে বললেন, পৃথিবীর সকল তীর্থই ফলপ্রদ, কিন্তু মানসতীর্থই পবিত্রতম। ধৈর্য তার হ্রদ, বিমল সত্য তার অগাধ জল; এই তীর্থে স্নান করলে অনৃশংস্য ঋজতা মৃদুতা অহিংসা অনিষ্ঠুরতা শৌচ ও ইন্দ্রিয়দমন শান্তি লাভ হয়। জল দিয়ে দেহ ধৌত করলেই স্নান হয় না, যিনি ইন্দ্রিয় দমন করেছেন তাঁকেই যথার্থ স্নাত বলা যায়, তাঁর বাহ্য ও অভ্যন্তর শুচি হয়। মানসতীর্থে ব্রহ্মজ্ঞান রূপ সলিল দ্বারা স্নানই তত্ত্বদর্শীদের মতে শ্রেষ্ঠ।

যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন, মানুষ কি জন্য বার বার জন্মগ্রহণ করে, কিরূপ... কার্য্যের ফলে স্বর্গে বা নরকে যায়? ভীষ্ম বললেন, ওই ভগবান্ বৃহস্পতি আস্ছেন, ইনিই তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন। বৃহস্পতি উপস্থিত হয়ে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্ন শুনে বললেন, মহারাজ, মানুষ একাকীই জন্মায়, মরে, দুর্গতি থেকে উদ্ধার পায়, এবং দুর্গতি ভোগ করে; পিতা মাতা আত্মীয় বন্ধু কেউ তার সহায় নয়। আত্মীয়স্বজন ক্ষণকাল রোদন ক'রে মৃতব্যক্তির দেহ কাষ্ঠ-লোষ্ট্রের ন্যায় ত্যাগ ক'রে চ'লে যায়, কেবল ধর্ম্মই অনুগমন করেন। মৃত্যুর পর জীব অন্য দেহ গ্রহণ করে, পঞ্চভূতস্থ দেবতারা তার শুভাশুভ কর্ম্মসকল দর্শন করেন। মানুষ যে অন্ন ভোজন করে তাতে পঞ্চভূত পরিতৃপ্ত হ'লে রেতঃ উৎপন্ন হয়, জীব তা আশ্রয় ক'রে স্ত্রীগর্ভে প্রবিষ্ট হয় এবং যথাকালে প্রসূত হয়ে সংসারচক্রে ক্লেশ ভোগ করে। যে ব্যক্তি জন্মাবধি যথশক্তি ধর্ম্মাচরণ করে সে নিত্য সুখী হয়; যে অধার্ম্মিক সে যমালয়ে যায় এবং তির্য্যগ্যোনি লাভ করে; যে ধর্ম্ম ও অধর্ম্ম দুইপ্রকার আচরণ করে সে সুখের পর দুঃখ ভোগ করে। যে ব্যক্তি মোহবশে অধর্ম্ম ক'রে পরে অনুতপ্ত হয় তাকে দুষ্কৃতের ফল ভোগ করতে হয় না। যার মনে যত অনুতাপ হয় তার তত পাপক্ষয় হয়। ধর্ম্মজ্ঞ ব্রাহ্মণের নিকট নিজের কর্ম্ম ব্যক্ত করলে অধর্ম্মজনিত অপবাদ শীঘ্রই দূর হয়। অহিংসাই ধর্ম্মসাধনের শ্রেষ্ঠ উপায়। যিনি সকল প্রাণীকে নিজের তুল্য জ্ঞান করেন, যিনি ক্রোধ ও আঘাতের প্রবৃত্তি জয় করেছেন, তিনি পরলোকে সুখলাভ করেন।